মিথ্যা কথা ও কালো টাকা দিয়ে ভোটারদের বিভ্রান্ত করা হচ্ছে : গোলাম পরওয়ার

মিথ্যা কথা ও কালো টাকা দিয়ে ভোটারদের বিভ্রান্ত করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন জামায়াতে ইসলামীর জেনারেল সেক্রেটারি ও খুলনা-৫ আসনের প্রার্থী মিয়া গোলাম পরওয়ার। একইসঙ্গে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সহিংসতা, ভয়ভীতি, নারী ও সংখ্যালঘু ভোটারদের ওপর হুমকি, কালো টাকা বিতরণ এবং সাইবার হামলার গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারী ) দুপুরে খুলনা প্রেসক্লাবের লিয়াকত আলী মিলনায়তনে খুলনা-৫ আসনের নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা সংক্রান্ত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব অভিযোগ করেন।
সংবাদ সম্মেলনে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, নির্বাচন কমিশন ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধানের পক্ষ থেকে অবাধ, সুষ্ঠু ও উৎসবমুখর নির্বাচনের আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তব পরিস্থিতি সেই আশ্বাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তার ভাষায়, নির্বাচনের এখনো এক সপ্তাহ বাকি, অথচ এখনই প্রার্থী, কর্মী ও ভোটারদের ওপর হামলা হচ্ছে। এভাবে পরিস্থিতি চলতে থাকলে জনগণ নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে যেতে পারবে না।
সংবাদ সম্মেলনে নারী কর্মীদের ওপর নির্যাতনের একাধিক অভিযোগ তুলে ধরেন জামায়াত প্রার্থী। তিনি বলেন, দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের পক্ষে প্রচারণা চালাতে গেলে নারী কর্মীদের বোরকা ও মুখের কাপড় টেনে খুলে নেওয়া হচ্ছে। কোথাও প্রতিবাদ করলে তাদের শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হচ্ছে, এমনকি গর্ভবতী নারীদের ওপরও হামলার অভিযোগ রয়েছে।
মিয়া গোলাম পরওয়ার আরও বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও বক্তব্য ভাইরাল হয়েছে, যেখানে একজন রাজনৈতিক নেতা প্রকাশ্যে বলেছেন দাঁড়িপাল্লার পক্ষে ভোট চাইতে গেলে নারীদের পোশাক খুলে নিতে হবে। এটা শুধু রাজনৈতিক সহিংসতা নয়, এটি নারী মর্যাদার ওপর সরাসরি আঘাত। যারা ক্ষমতায় যাওয়ার আগেই এ ধরনের হুমকি দেয়, তারা ক্ষমতায় গেলে কী করবে সেটা ভেবেই আমরা আতঙ্কিত।
সংখ্যালঘু ভোটারদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে তিনি অভিযোগ করে বলেন, খুলনা-৫ আসনের বিভিন্ন এলাকায় হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোটারদের দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ভোট দিলে ‘ভয়াবহ পরিণতির’ হুমকি দেওয়া হচ্ছে। কোথাও কোথাও মিটিং করতে গেলে তাদের জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে, দাঁড়িপাল্লার সভায় গেলে খবর আছে। অন্যদিকে কিছু এলাকায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সাবেক জনপ্রতিনিধিদের জোরপূর্বক বাড়ি থেকে তুলে এনে নির্দিষ্ট প্রার্থীর পক্ষে কাজ করতে বাধ্য করা হচ্ছে। এটা ভোট নয়, জোর করে রাজনৈতিক অবস্থান চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা।
নিজের নির্বাচনী এলাকায় প্রচারণা বাধাগ্রস্ত হওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ফুলতলা ও ডুমুরিয়ার বিভিন্ন এলাকায় তার নির্ধারিত সভা-সমাবেশে পরিকল্পিতভাবে বাধা দেওয়া হয়েছে। একাধিক স্থানে চেয়ার-টেবিল ভেঙে সভা ভণ্ডুল করা হয়। একটি এলাকায় গণসংযোগ শেষে নির্ধারিত সভাস্থলে পৌঁছানোর আগেই প্রতিপক্ষের লোকজন গিয়ে চেয়ার সরিয়ে নেয় এবং সভা করতে বাধা দেয়। বিষয়টি থানায় জানানো হলে পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলেও কাউকে আটক বা আইনি ব্যবস্থা নেয়নি বলে।
কালো টাকা ও ভোট কেনার অভিযোগ তুলে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, খুলনা-৫ আসনে সংগঠিতভাবে বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থ ঢালছে একটি পক্ষ। উপজেলা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডভিত্তিক কোটা নির্ধারণ করে বাড়ি বাড়ি টাকা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। দিনমজুর, গরিব মানুষ, সংখ্যালঘু নারীদের ২০০–৩০০ টাকা করে দেওয়া হচ্ছে। কেউ কেউ বিরিয়ানি আর নগদ টাকার বিনিময়ে ভোট কেনার চেষ্টা করছে। এটা নির্বাচনি আচরণবিধির চরম লঙ্ঘন। কালো টাকার দাপটে রাজনীতি কলুষিত হচ্ছে এবং প্রশাসন কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে এই নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি প্রসঙ্গে জামায়াতের প্রার্থী বলেন, প্রত্যেক থানার কাছে সন্ত্রাসী ও অপরাধীদের তালিকা থাকা সত্ত্বেও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার কিংবা পরিচিত সহিংসদের গ্রেপ্তারে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে প্রয়োজনীয় সমন্বয় ও আন্তরিকতার অভাব রয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে সাইবার হামলার একটি বিস্তারিত অভিযোগও তুলে ধরে মিয়া গোলাম পরওয়ার দাবি করেন, জামায়াতে ইসলামীর আমিরের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টুইটার অ্যাকাউন্ট এবং পরবর্তীতে তার নিজের টুইটার অ্যাকাউন্ট হ্যাক করা হয়েছে। তদন্তে একটি সরকারি দপ্তরের একজন কর্মকর্তার ই-মেইল থেকে ভারতীয় উৎসের ভাইরাস ব্যবহার করে এই হ্যাকিং করা হয়েছে বলে তাদের সাইবার টিম শনাক্ত করেছে। এ ঘটনায় সাইবার আইনে মামলা করা হয়েছে এবং ডিবি পুলিশ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে ল্যাপটপসহ আটক করেছে। ওই কর্মকর্তাকে ছাড়িয়ে নিতে উচ্চপর্যায়ে চাপ প্রয়োগ করা হয়েছিল, তবে শেষ পর্যন্ত পুলিশ তাকে মুক্তি দিতে পারেনি।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, খুলনা-৫ আসনে মোট ১৫০টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে অন্তত ৫০টি কেন্দ্রকে খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। এসব কেন্দ্রে ভোটারদের ভয় দেখানো, কেন্দ্র দখল, ব্যালট ছিনতাই ও আগাম ব্যালট সরানোর আশঙ্কা রয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোর তালিকা প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন ও সংশ্লিষ্ট মনিটরিং সংস্থার কাছে লিখিতভাবে দেওয়া হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।
সংবাদ সম্মেলনের শেষাংশে জামায়াতের প্রার্থী নির্বাচন কমিশন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, অবিলম্বে কালো টাকা বিতরণ বন্ধ, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার এবং প্রার্থী ও ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি ভোটারদের উদ্দেশে আহ্বান জানিয়ে বলেন, কোনো প্রলোভন বা হুমকির কাছে নতি স্বীকার না করে সততা ও বিবেকের পক্ষে অবস্থান নিতে হবে।
নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণাকালে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, আল্লাহ আমাকে সুযোগ দিলে বন্ধ কলকারখানা শুধু চালু নয়, এটাকে আধুনিকীকরণ করে কীভাবে লাভজনক করা যায় সেটার ব্যাপারে সরকারের সহযোগিতা নিয়ে কাজ করবো। দক্ষিণ ডুমুরিয়ার জালিয়াখালী বাঁধ বার বার ভেঙে যায়। এখানে একটি টেকসই বাঁধ নির্মাণ করার ব্যবস্থা করা, বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের জন্য ফুলতলা-ডুমুরিয়ায় ফ্রিল্যান্সিং এবং উপজেলাতে টেকনিক্যাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউট, কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করার পরিকল্পনা রেখেছি। যুবকদের খেলাধুলার জন্য ফুলতলা ও ডুমুরিয়ায় ২টি মিনি স্টেডিয়াম করার পরিকল্পনা রয়েছে। ফুলতলার ভৈরব নদের উপরে সিকিরহাট ব্রিজ নির্মাণ, ডুমুরিয়ার উৎপাদিত সবজি সংরক্ষণাগার হিমাগারের মতো স্টোরেজ নির্মাণ করবো। এছাড়া দৌলতপুর-শাহাপুর-চুকনগর সড়ক দুই লেনে উন্নীত করণ, ডুমুরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্যকমপ্লেক্স ১০০ বেডে, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, বিমানবন্দরসহ বিভিন্ন উন্নয়ন করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন খুলনা জেলা জামায়াতের আমির এমরান হুসাইন, সেক্রেটারি মুন্সি মিজানুর রহমান, সহকারী সেক্রেটারি মুন্সি মইনুল ইসলাম, সহকারী সেক্রেটারি মিয়া গোলাম কুদ্দুস, প্রিন্সিপাল গওসুল আজম হাদী, খুলনা জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট আবুল খায়ের ও সাবেক যুগ্ন সম্পাদক অ্যাডভোকেট শেখ জাকিরুল ইসলাম।
মোহাম্মদ মিলন/আরএআর