নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন চান দেশের একমাত্র হিজড়া প্রার্থী রানী

গণভোট ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সারা দেশে একমাত্র হিজড়া জনগোষ্ঠী থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন আনোয়ারা ইসলাম রানী। তিনি রংপুর-৩ আসন থেকে হরিণ প্রতীকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন। বিভাগীয় নগরী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ এ আসনটিতে আটজন প্রার্থীর মধ্যে ভোটারদের কাছে রানী বেশ পরিচিত। কারণ, এর আগেও সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন তিনি।
ভোটযুদ্ধে ভিন্ন লিঙ্গ পরিচয়ে রানীর এই অংশগ্রহণ নিয়ে সাধারণ মানুষদের মধ্যে রয়েছে বাড়তি আগ্রহ। বিশেষ করে ৩৮ লাখ টাকার গাড়িতে তার চলাফেরা, পোশাকে-আশাকে আর স্মার্ট কথাবার্তায় রয়েছে ভোটারদের আকৃষ্ট করার প্রয়াস। শুধু তাই নয়, সবশেষ ২০২৪ সালের দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনেও ভোটের অংকে চমক দেখিয়েছেন রানী।
ওই নির্বাচনে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের ৮১ হাজার ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। আনোয়ারা ইসলাম রানী ঈগল প্রতীক নিয়ে ২৩ হাজার ভোট পেয়ে তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী হন। তবে দাবি করা হয়, ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আসন সমঝোতায় জাতীয় পার্টি জয়ী হয়েছিলেন।
প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মৌলিক অধিকার ও মর্যাদার জন্য এবারও সেই রানী আছেন ভোটের লড়াইয়ে। তার এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুধু আক্ষরিক নয়, চ্যালেঞ্জ ও সাহসের বলে মনে করছেন জেন্ডার বিষেশজ্ঞরা।

সম্প্রতি আনোয়ারা ইসলাম রানীর সঙ্গে ভোটের পরিবেশ ও প্রস্তুতিসহ নানা বিষয়ে কথা হয়। আলাপচারিতায় বঞ্চনা থেকে অধিকারের লড়াইয়ে টিকে থাকতে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কথা জানান তিনি।
আনোয়ারা ইসলাম বলেন, জন্মের পর থেকেই আমাকে লিঙ্গ পরিচয়ের কারণে বৈষম্যের শিকার হতে হয়েছে। ছোটবেলায় যখন মেয়েদের সঙ্গে খেলতে যেতাম, তারা খেলায় নিত না। বলত তুই ছেলেদের মতো। আবার ছেলেরাও আমাকে খেলায় না নিয়ে নানা কটু মন্তব্য করত। বলতে গেলে চরম প্রতিকূল পরিবেশে আমার শৈশব-কৈশোর কেটেছে।
তিনি আরও বলেন, সমাজের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনে ২০০৯ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘ন্যায় অধিকার তৃতীয় লিঙ্গ উন্নয়ন সংস্থা’। লক্ষ্যটা ছিল হিজড়া জনগোষ্ঠীর শিক্ষা ও অর্থনৈতিক মুক্তি। তার হাত ধরে ইতোমধ্যে এ জনগোষ্ঠীর ৪০০ মানুষের মধ্যে ৬০ জনের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছেন। ৩২ জনের পড়াশোনার ব্যবস্থাও করেছেন। তার অবহেলিত জনগোষ্ঠীকে সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে অধিকার আদায়ে সচেতন করার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন।

স্বতন্ত্র প্রার্থী রানী বলেন, আমরা যারা দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষ—বেদে, দলিত, সাঁওতাল, হিজড়া (তৃতীয় লিঙ্গ), সনাতন, উর্দুভাষী ভোট দিয়ে জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করি। কিন্তু সংসদে গিয়ে কোনো নেতাই আর আমাদের কথা বলেন না। আমি এ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মুখপাত্র হয়ে তাদের মৌলিক অধিকার আদায়ের জন্য কাজ করতে চাই।
নির্বাচিত হলে জনপ্রতিনিধি হিসেবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য, বাসস্থান, নিরাপত্তাসহ মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ এবং এলাকার উন্নয়নের পাশাপাশি জনবান্ধব রাষ্ট্রীয় কাঠামো গড়ে তুলতে সংসদে আইন প্রণয়নে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে চান এই প্রার্থী।
আনোয়ারা ইসলাম রানী বলেন, নির্বাচিত হলে এলাকায় কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখতে চাই। সবার জন্য সম্মানজনক ও নিরাপদ কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে চাই। এখানকার আরেকটি বড় সমস্যা হলো স্বাস্থ্যসেবার অপ্রতুলতা। বিশেষ করে দরিদ্র জনগোষ্ঠী প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা পায় না। আমি সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে চাই।

তিনি বলেন, রংপুর মহানগরীর শ্যামাসুন্দরী খাল দখলমুক্ত করে পরিকল্পিতভাবে পানি নিষ্কাশনসহ খালের সৌন্দর্য বাড়াতে চাই। সৌন্দর্যবর্ধনের পাশাপাশি রংপুরকে গড়ে তুলতে চাই একটি পরিকল্পিত নগরী হিসেবে। এলাকায় গ্যাসপ্রাপ্তি নিশ্চিত করা এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নেও ভূমিকা রাখতে চাই।
আনোয়ারা ইসলাম বলেন, বেদে, হরিজন, দলিত, সাঁওতালসহ অসংখ্য পিছিয়ে রাখা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষ আছে, যাদের মৌলিক অধিকারগুলো এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। এসব জনগোষ্ঠীর মানুষ যেমন পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছেন, তেমনি নিজেদের পৈতৃক সম্পত্তি থেকে এখনো বঞ্চিত হয়ে আসছেন। বাসস্থান, শিক্ষা ও কর্মসংস্থান থেকে বঞ্চিত করা হয়। এই মৌলিক অধিকারগুলো প্রতিষ্ঠা করার জন্য আমার যে লড়াই, নির্বাচিত হলে এসব বাস্তুবায়ন করা সহজ হবে ইনশাআল্লাহ।
৩৩ বছর বয়সী আনোয়ারা ইসলাম অষ্টম শ্রেণি পাস। রংপুরে নগরীতে তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা। বাবা মো. চাঁন মিয়া ছিলেন মোটরশ্রমিক, মা জুলেখা বেগম গৃহিণী। দ্বিতীয়বারের মতো ভোট যুদ্ধে অংশ নেওয়া রানী বলেন, আমার স্বামী নেই, সংসার নেই। আমার কোনো পিছুটানও নেই। আর আমি কোনো দলের কাছে দায়বদ্ধও নই। তাই কথা দিচ্ছি, আমি মানুষের উন্নয়নের জন্য কাজ করব। আমাকে মানুষ হিসেবে একবার সুযোগ দিয়ে পরখ করে দেখতে পারেন।
তিনি আরও বলেন, ভোটের পরিবেশ এখনো সবার জন্য সমান নয়। অনেক প্রার্থী মারমুখী আচরণ করছেন। এ কারণে আমরা স্বাচ্ছন্দ্যে কাজ করতে পারছি না। ভোটারদের মধ্যেও একটা আতঙ্ক কাজ করছে। বিশেষ করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে বলে মনে হচ্ছে।

এবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রংপুর-৩ আসনে আনোয়ারা ইসলাম রানী ছাড়াও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন জাতীয় পার্টির জি এম কাদের, জামায়াতে ইসলামীর মাহবুবুর রহমান বেলাল, বিএনপির সামসুজ্জামান সামু, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমিরুজ্জামান পিয়াল, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) আব্দুল কুদ্দুস, বাসদের (মার্কসবাদী) আনোয়ার হোসেন বাবলু, ও স্বতন্ত্র প্রার্থী রিটা রহমান।
তবে ভোটের ফলাফল যা–ই হোক, আনোয়ারা ইসলাম রানীর প্রার্থী হওয়াকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) রংপুর জেলা সাধারণ সম্পাদক নাসিমা আমিন বলেন, একটা অবহেলিত জনগোষ্ঠীকে নিয়ে সমাজের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের জন্য রানীর লড়াই সংগ্রাম সবসময় অন্যদের জন্য অনুপ্রেরণার। সামাজিক আন্দোলন ও জনসচেতনতা সৃষ্টির পাশাপাশি তার জনপ্রতিনিধি হয়ে সমাজ বদলানোর আকাঙ্ক্ষা নিঃসন্দেহে সাহসীকতার বহিঃপ্রকাশ। এটি খুবই আশাব্যঞ্জক ঘটনা। তাকে নিয়ে মানুষের মধ্যে আগ্রহ রয়েছে। বিভিন্নভাবে মানুষ তাকে উৎসাহ দিচ্ছেন।
রংপুর সদর ও রংপুর সিটি করপোরেশনের ১০ থেকে ৩৩ নম্বর ওয়ার্ড মিলে রংপুর–৩ আসন। জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্যমতে, এই আসনে ১৬৯টি ভোটকেন্দ্রে মোট ভোটার ৫ লাখ ৮ হাজার ২৪০। এর মধ্যে পুরুষ ২ লাখ ৫২ হাজার ৩৭০ জন, নারী ২ লাখ ৫৫ হাজার ৮৪৯ জন ও হিজড়া ৫ জন। ইতোমধ্যে রংপুর–৩ আসনে ৫ হাজার ২৩০ ভোটার পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে নিবন্ধন করেছেন।
ফরহাদুজ্জামান ফারুক/এএমকে