বঞ্চনা আর অবহেলার অবসান চায় ঠাকুরগাঁওবাসী

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দীর্ঘ প্রায় ২৩ বছর পর ঠাকুরগাঁওয়ে আসছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তার এই বহুল প্রত্যাশিত আগমনকে কেন্দ্র করে গোটা জেলাজুড়ে বইছে উৎসবের আমেজ। নির্বাচনী জনসভাকে ঘিরে বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে উৎসাহ-উদ্দীপনা ও প্রাণচাঞ্চল্য দেখা গেছে।
আগামীকাল শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) বেলা সাড়ে ১১টায় জেলা বিএনপির উদ্যোগে আয়োজিত নির্বাচনী জনসভায় অংশ নিতে ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় (বড় মাঠ) মাঠে আসবেন তারেক রহমান। জনসভাকে কেন্দ্র করে মঞ্চ নির্মাণ, আলোকসজ্জা, শব্দ ব্যবস্থা ও সার্বিক নিরাপত্তা প্রস্তুতির কাজ চলছে পুরোদমে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রশাসনের পক্ষ থেকেও নেওয়া হয়েছে বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
জেলা বিএনপি সূত্রে জানা যায়, আগামীকাল শনিবার সকাল ১০টায় ঢাকা থেকে বিমানযোগে সৈয়দপুর বিমানবন্দরে অবতরণ করবেন। এরপরে তিনি হেলিকপ্টার যোগে ঠাকুরগাঁও শহিদ মোহাম্মদ আলী স্টেডিয়াম মাঠে অবতরণ করে গাড়ি যোগে ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় (বড় মাঠ) মাঠে নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেবেন। এরপর ঠাকুরগাঁওয়ের জনসভা শেষে দুপুর ১টার দিকে হেলিকপ্টার যোগে পার্শ্ববর্তী জেলা নীলফামারী পৌরসভার বড় মাঠে জনসভায় যোগ দিয়ে দুপুর ২টার দিকে দিনাজপুর জেলার বিরামপুর সরকারি কলেজ মাঠে জনসভায় যোগ দেবেন।
এর আগে ২০০৩ সালের ডিসেম্বরে একটি শীতবস্ত্র বিতরণ অনুষ্ঠানে সর্বশেষ ঠাকুরগাঁও সফর করেছিলেন তারেক রহমান। দীর্ঘ ২৩ বছর পর তার এই আগমনকে শুধু একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি হিসেবে দেখছেন না জেলার মানুষ। অনেকের কাছে এটি দীর্ঘদিনের অবহেলা ও বঞ্চনার অবসান ঘটানোর প্রত্যাশার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
দলীয় নেতাকর্মীদের মতে, বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে ঠাকুরগাঁও-১ আসন। কেননা এটি বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নির্বাচনী এলাকা। সে কারণে এই আসনকে ঘিরে বিএনপির কৌশল, প্রস্তুতি ও প্রত্যাশা অন্য যে কোনো জেলার তুলনায় অনেক বেশি ব্যতিক্রমী ও গুরুত্ববহ।
স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিব কামরুজ্জামান কামু ঢাকা পোস্টকে বলেন, দীর্ঘ ২৩ বছর পর আমাদের প্রিয় নেতা তারেক রহমান ঠাকুরগাঁওয়ে আসছেন এটা শুধু একটি জনসভা নয়, এটি আমাদের জন্য একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। জেলার প্রতিটি ইউনিট, প্রতিটি কর্মী এই জনসভাকে সফল করতে দিনরাত কাজ করছে। নেতাকর্মীদের মধ্যে যে উদ্দীপনা ও আবেগ দেখা যাচ্ছে, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।
তিনি আরও বলেন, তারেক রহমানের আগমন মানেই গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের নতুন প্রত্যাশা। ঠাকুরগাঁও দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত ও বঞ্চিত। এই জনসভা থেকে আমরা একটি শক্ত বার্তা দিতে চাই এই জনপদ আর পিছিয়ে থাকতে চায় না। মানুষ পরিবর্তন চায়, মানুষ ভোটের অধিকার ফিরে পেতে চায়।
জেলা মহিলা দলের সভাপতি ফোরাতুন নাহার প্যারিস ঢাকা পোস্টকে বলেন, দীর্ঘ ২৩ বছর পর তারেক রহমানের ঠাকুরগাঁও আগমন নারী সমাজের মাঝেও নতুন করে আশার সঞ্চার করেছে। আমরা দেখছি ঘরে ঘরে নারীরা এই জনসভা নিয়ে কথা বলছেন, প্রস্তুতি নিচ্ছেন, স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণের আগ্রহ প্রকাশ করছেন।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় নারীরা সবচেয়ে বেশি বৈষম্য ও বঞ্চনার শিকার। তারেক রহমানের রাজনীতি নারীর অধিকার, মর্যাদা ও নিরাপত্তার কথা বলে। সে কারণেই এই জনসভাকে কেন্দ্র করে মহিলা দলের নেতাকর্মীরা সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে রয়েছেন।
জেলা ছাত্রদলের সভাপতি মো. কায়েস ঢাকা পোস্টকে বলেন, তারেক রহমানের ঠাকুরগাঁও আগমন ছাত্র সমাজের জন্য একটি অনুপ্রেরণার বার্তা। দীর্ঘদিন ধরে গণতন্ত্র, মতপ্রকাশ ও শিক্ষাঙ্গনে অধিকারহীনতার যে পরিবেশ তৈরি হয়েছে, তার বিরুদ্ধে এই জনসভা নতুন করে প্রতিবাদের শক্তি জোগাবে।
তিনি আরও বলেন, ঠাকুরগাঁওয়ের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা এই জনসভাকে ঘিরে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করছে। শান্তিপূর্ণ ও শৃঙ্খলাপূর্ণভাবে কর্মসূচি সফল করতে আমরা সার্বিক প্রস্তুতি নিয়েছি। আমরা বিশ্বাস করি, তারেক রহমানের নেতৃত্বে আগামীর বাংলাদেশ হবে শিক্ষার্থী-বান্ধব, কর্মসংস্থানমুখী ও গণতান্ত্রিক। এই জনসভা ছাত্রসমাজের প্রত্যাশা ও দাবি তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হয়ে উঠবে।
অন্যদিকে, স্থানীয়দের অভিযোগ স্বাধীনতার পর থেকে একের পর এক সরকার এলেও ঠাকুরগাঁও উন্নয়নের দৌড়ে পিছিয়েই রয়ে গেছে। নেই কোনো সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, আধুনিক মেডিকেল কলেজ বা বড় শিল্পকারখানা। কৃষিনির্ভর এই জেলায় কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত। যোগাযোগ ব্যবস্থাও নাজুক। একমাত্র চিনিকলটি লোকসানে ধুঁকছে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, বিএনপি ক্ষমতায় এলে ঠাকুরগাঁওয়ে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, আধুনিক মেডিকেল কলেজ, বিমানবন্দর চালু, সড়ক ও রেল যোগাযোগ উন্নয়ন, অর্থনৈতিক অঞ্চল ও ইপিজেড স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. পয়গাম আলী ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমাদের দলের চেয়ারম্যানের আগমনকে ঘিরে জেলা বিএনপি একাধিক প্রস্তুতি সভা করেছে। কর্মসূচি সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আমরা প্রশাসনকে আগেভাগেই নিরাপত্তাসহ সার্বিক বিষয় সম্পর্কে অবগত করেছি। দীর্ঘদিন পর তারেক রহমান ঠাকুরগাঁওয়ে আসছেন। এর আগে ২০০৩ সালে শীত মৌসুমে ঠাকুরগাঁও সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে একটি কম্বল বিতরণ কর্মসূচিতে তিনি এখানে এসেছিলেন। সেই সফরের পর এত বছর ধরে মানুষ তার আগমনের অপেক্ষায় ছিল।
তিনি আরও বলেন, আমরা আশা করছি, তারেক রহমানের এই আগমনে ঠাকুরগাঁওবাসী অত্যন্ত আনন্দিত হবে। নেতাকর্মীদের মধ্যে ইতোমধ্যেই ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা যাচ্ছে। এই জনসভা ঠাকুরগাঁওয়ের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে।
জেলা বিএনপির সভাপতি মো. মির্জা ফয়সল আমীন বলেন, দীর্ঘ ২৩ বছর পর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ঠাকুরগাঁও আগমন শুধু একটি জনসভা নয়, এটি গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই জনসভা প্রমাণ করবে যে ঠাকুরগাঁওয়ের মানুষ পরিবর্তনের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ। জেলার প্রতিটি উপজেলা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতাকর্মীরা এই জনসভাকে সফল করতে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়েছেন। আমরা আশা করছি, জনসভায় জনসমাগম হবে নজিরবিহীন।
তিনি আরও বলেন, বিএনপি ক্ষমতার রাজনীতি নয়, মানুষের অধিকার ও ভোটের রাজনীতি করে। তারেক রহমানের এই সফর থেকে জনগণ একটি স্পষ্ট দিকনির্দেশনা পাবে কীভাবে দেশকে আবার গণতন্ত্রের পথে ফেরানো যায়।
ঠাকুরগাঁওয়ের পুলিশ সুপার (এসপি) মো. বেলাল হোসেন বলেন, বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ঠাকুরগাঁও আগমনকে কেন্দ্র করে জেলার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। জনসভাকে ঘিরে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা যেন না ঘটে, সেজন্য জেলা পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট মাঠে থাকবে। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় আমরা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছি।
তিনি আরও বলেন, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশের পাশাপাশি অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গেও সমন্বয় রেখে দায়িত্ব পালন করা হবে।
রেদওয়ান মিলন/আরএআর