কিশোরগঞ্জ-১ : বিভাজন ছাপিয়ে ঐক্য, শক্ত অবস্থানে ধানের শীষের প্রার্থী

দীর্ঘদিনের উপজেলাভিত্তিক বিভাজন আর গ্রুপিংয়ের রাজনীতি ছাপিয়ে প্রচারণার শেষ দিনে কিশোরগঞ্জ-১ (সদর ও হোসেনপুর) আসনের নির্বাচনি সমীকরণে এক নাটকীয় পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। মাঠপর্যায়ের চিত্র ও সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ বিশ্লেষণ করে স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, নির্বাচনি লড়াইয়ে ধানের শীষের প্রার্থী ইতোমধ্যে বেশ শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন। তবে আলোচনায় পিছিয়ে নেই মোরগ প্রতীকের স্বতন্ত্র ও বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী মো. রেজাউল করিম খান চুন্নুও।
বড় দলগুলোর তুলনায় অন্যান্য প্রার্থীরা ছোট পরিসরে প্রচারণা চালালেও মূল আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে ধানের শীষের সাংগঠনিক ঐক্য ও বিদ্রোহী প্রার্থীর অবস্থান।
প্রচারণার শেষ দিন সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) হোসেনপুর উপজেলার ঢেকিয়া খেলার মাঠে ধানের শীষের নির্বাচনি জনসভা ও পরবর্তী বিশাল মিছিল ছিল পুরো জেলার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। কিশোরগঞ্জ সদর ও হোসেনপুর— উভয় উপজেলা থেকে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের উপস্থিতি নির্বাচনি মাঠে যেন একটি নতুন ও শক্তিশালী বার্তা দিয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কিশোরগঞ্জ-১ (সদর–হোসেনপুর) আসনে বিএনপির ধানের শীষের প্রার্থী মো. মাজহারুল ইসলামের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে রয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী সাবেক বিভাগীয় স্পেশাল জজ মো. রেজাউল করিম খান চুন্নু (মোরগ)। এ ছাড়া অন্যান্য প্রার্থীরা হলেন— মো. হেদায়েতুল ইসলাম হাদী (বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস–রিকশা), মো. আলাল মিয়া (বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল–কাঁচি), আহম্মদ আলী (খেলাফত মজলিস–দেয়ালঘড়ি), তারেক মো. শহিদুল ইসলাম (এনপিপি–আম), এনামুল হক (সিপিবি–কাস্তে) এবং মাসুদ মিয়া (বাসদ–মই)।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অতীতে এই আসনে ভোটের ফল অনেকাংশে নির্ভর করত উপজেলা পরিচয় ও স্থানীয় গ্রুপিংয়ের ওপর। তবে এবারের নির্বাচনে সেই চিত্র অনেকটাই বদলেছে। জেলা বিএনপির তিনবারের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে মাজহারুল ইসলামের সাংগঠনিক প্রভাব এবং দুই উপজেলার নেতাকর্মীদের এক প্ল্যাটফর্মে আনতে পারা তাকে ভোটের রাজনীতিতে সুবিধাজনক অবস্থানে নিয়ে গেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দলীয় সূত্রে জানা যায়, বিএনপির চেয়ারপারসন তারেক রহমানের নির্দেশনা এবং জেলা বিএনপির সভাপতি মো. শরিফুল আলমের উদ্যোগে দীর্ঘ দুই যুগের কোন্দল নিরসন করে কিশোরগঞ্জ সদর ও হোসেনপুর উপজেলা বিএনপির নেতাকর্মীরা ধানের শীষের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন। এর ফলে দলীয় সিনিয়র নেতাকর্মীদের সমর্থন হারিয়ে মনোনয়নবঞ্চিত বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী রেজাউল করিম খান চুন্নু কার্যত সঙ্গীহীন হয়ে পড়েছেন।
ঐক্য প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে গত বুধবার (২৮ জানুয়ারি) রাতে কিশোরগঞ্জ জেলা শহরের আলম টাওয়ারে সদর ও হোসেনপুর উপজেলা বিএনপিকে সুসংগঠিত করতে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও সংসদ সদস্য প্রার্থী মো. মাজহারুল ইসলামের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে দুই উপজেলার শীর্ষ নেতারা অংশ নেন।

পরে হোসেনপুরে শেষ নির্বাচনী জনসভায় ধানের শীষের প্রার্থী মো. মাজহারুল ইসলাম বলেন, এই নির্বাচন সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার ও মর্যাদা পুনরুদ্ধারের নির্বাচন। নির্বাচিত হলে কিশোরগঞ্জ সদর ও হোসেনপুর— উভয় উপজেলাকে সমান গুরুত্ব দিয়ে উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মাদক ও চাঁদাবাজি নির্মূল এবং নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই হবে প্রধান লক্ষ্য।
তিনি আরও বলেন, আপনারা ভোটের মাধ্যমে ধানের শীষকে বিজয়ী করবেন—এই বিশ্বাস আমার আছে। মহান আল্লাহর কাছে আমার জন্য দোয়া করবেন। ফজরের নামাজের পর ভোটকেন্দ্রে অবস্থান নেবেন এবং ভোটগণনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত ধৈর্য ধরে থাকবেন। আমরা সবাই দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশনা মেনে চলবো। সারাদেশে ধানের শীষের জোয়ার উঠেছে। বিজয়ের পর আবার আপনাদের সঙ্গে দেখা হবে, ইনশাআল্লাহ।
প্রচারণার শেষ দিনে মাঠজুড়ে ধানের শীষের স্লোগান, নেতাকর্মীদের সক্রিয় উপস্থিতি এবং সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। জনসভা শেষে বিক্ষোভ মিছিলটি হোসেনপুর উপজেলার প্রধান সড়কগুলো প্রদক্ষিণ করে। এ সময় প্রার্থীকে ঘিরে জনতার আগ্রহ ও সমর্থন ছিল চোখে পড়ার মতো।
স্থানীয় ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় উন্নয়ন ও সুশাসনের অভাব অনুভব করছেন। তাদের মতে, এবারের নির্বাচনে ব্যক্তি প্রার্থীর চেয়েও নেতৃত্বের ধরন ও ঐক্যের বার্তাই ভোটের সিদ্ধান্তে বড় ভূমিকা রাখছে।
হোসেনপুর পৌর ছাত্রদলের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সদস্য সচিব আরমান মিয়া বলেন, বিএনপি একটি বৃহৎ দল। এখানে মতের ভিন্নতা থাকতেই পারে, তবে ধানের শীষের পক্ষে আমরা সবাই একমত। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের অনেক সিনিয়র নেতা যারা আগে নীরব ছিলেন, তারাও জনসভায় অংশ নিয়েছেন—এতেই নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে।
জেলা বিএনপির সভাপতি মো. শরিফুল আলম বলেন, হোসেনপুর উপজেলা বিএনপির দীর্ঘদিনের কোন্দল নিরসনের ফলে কিশোরগঞ্জ-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী মো. মাজহারুল ইসলামের বিজয়ের পথে বড় কোনো বাধা নেই। ঐক্যবদ্ধ নেতাকর্মীদের মাধ্যমে তিনি বিপুল ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হবেন বলে আশা রাখি।
এনামুল হক হৃদয়/আরএআর