খুলনার ছয়টি আসনে ভোটগ্রহণ শুরু, ভোটারদের দীর্ঘ লাইন

উৎসবমুখর পরিবেশে শুরু হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ। আজ বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে ৭টায় ভোটগ্রহণ শুরু হয়। যা বিরতিহীনভাবে চলবে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত। এদিন ভোর থেকেই ভোটারদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। এবারের নির্বাচনে খুলনার ছয়টি আসনে ৩৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, এবারের নির্বাচনে খুলনায় নিরাপত্তার চাদরে মুড়ে দেওয়া হয়েছে। এবার ভোটকেন্দ্রগুলোতে স্থাপন করা হয়েছে সিসি ক্যামেরা। এছাড়া রয়েছে বডি-ওর্ন ক্যামেরার ব্যবস্থা। কেন্দ্রগুলোর নিরাপত্তায় পুলিশ ও আনসার সদস্যরা দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছে। শুধু ভোট কেন্দ্রেই নয়, ভোটকেন্দ্রের বাইরের নিরাপত্তায় রয়েছে র্যাব, পুলিশ, সেনাবাহিনী, আনসার, নৌবাহিনী, বিজিবি, বিমান বাহিনী ও কোস্টগার্ডের সদস্যরা।
ভোটকেন্দ্র, সিসি ক্যামেরা ও বডি ওর্ন ক্যামেরা প্রশাসন ও নির্বাচন কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে, খুলনার ছয়টি আসনে এবার কেন্দ্র রয়েছে ৮৪০টি। এর মধ্যে ভোটকক্ষ রয়েছে ৪ হাজার ২৫৭টি। ছয়টি আসনের ৮৪০টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ৭০৯টি কেন্দ্রে স্থাপন করা হয়েছে সিসি ক্যামেরা। সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে পুলিশ ও নির্বাচন কমিশন মনিটরিং করবে। এছাড়া ২১৪টি কেন্দ্রে বডি-ওর্ন ক্যামেরা থাকছে। এরমধ্যে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের ৭৯টি এবং জেলা পুলিশের ১৩৫টি বডি ওর্ন ক্যামেরা থাকছে।
ঝুঁকিপূর্ণ ভোট কেন্দ্র
এদিকে এবারের নির্বাচনে ৫৬৬টি কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ভোটকেন্দ্রগুলোতে গুরুত্ব বিবেচনায় অধিকগুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে ৫ জন পুলিশ, গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে ৪ জন এবং সাধারণ কেন্দ্রে ৩ জন পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করছে। এসব কেন্দ্রে ১৩ জন আনসার সদস্য রয়েছে। এরমধ্যে পুলিশ সদস্যরা অস্ত্রধারী এবং আনসারের ৩ জন অস্ত্রধারী ও ১০ জনের হাতে লাঠি নিয়ে দায়িত্ব পালন করছেন।
নিরাপত্তার চাদরে মোড়া খুলনা
খুলনা জেলা প্রশাসন ও নির্বাচন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, নির্বাচনে কেন্দ্রগুলোর নিরাপত্তায় সেনাবাহিনীর ১ হাজার ২৫০ জন, নৌবাহিনীর ৯৫৪ জন, বিজিবির ৩০০ জন, কোস্টগার্ডের ৩৫০ জন, র্যাবের ৯৮ জন, মেট্রোপলিটন পুলিশের ২ হাজার ৪৩১ জন, জেলা পুলিশের ২ হাজার ১২৪ জন এবং আনসার ও ভিডিপির ১১ হাজার ১১২ জনসহ মোট ১৮ হাজার ৬২৪ জন সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন।
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান বলেন, নির্বাচনকে ঘিরে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছে। খুলনা মহানগরীর ভোটকেন্দ্র, স্ট্রাইকিং ফোর্সসহ ৩ হাজার পুলিশ সদস্য মাঠে দায়িত্ব পালন করছেন। পুলিশের পাশাপাশি সেনাবাহিনী, নৌ-বাহিনী, বিজিবিসহ বিপুল সংখ্যক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা নিয়োজিত। প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা ও বডি-ওর্ন ক্যামেরার মাধ্যমে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা হচ্ছে। মহানগরীর ৭৯টি কেন্দ্রে বডি-ওর্ন ক্যামেরা রয়েছে। যেসব কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা, সেখানে পুলিশ সদস্যদের বডি-ওর্ন ক্যামেরা দেওয়ার প্রয়োজন হয়নি। যাদের কাছে বডি-ওর্ন ক্যামেরা রয়েছে, তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
কেএমপি কমিশনার বলেন, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হবে। আমরা কোনো ধরনের গোলোযোগের আশঙ্কা করছি না। খুব ভালোভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ইনশাআল্লাহ।
খুলনার আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা মো. ফয়সল কাদের বলেন, কাঙ্ক্ষিত জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট চলছে। নির্বাচনের আইনশৃঙ্খলার জন্য সেনাবাহিনী, বিজিবি, র্যাব, পুলিশসহ সকল বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এবং জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মাঠে কাজ করছেন। নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ করার জন্য নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে যা যা করার দরকার সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। নির্বাচনকে ঘিরে খুলনায় উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে।
খুলনার ভোটের মাঠে নির্বাচনী লড়াইয়ে ৩৮ প্রার্থী
এবারের নির্বাচনে খুলনার ছয়টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ৩৮ জন প্রার্থী। এরমধ্যে খুলনা-১ (বটিয়াঘাটা, দাকোপ) আসনের ১২ জন প্রার্থীর মধ্যে সম্মিলিত জাতীয় জোটের অন্তর্গত বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের সুনীল শুভ রায় (মোমবাতি), জাতীয় পার্টির মো. জাহাঙ্গীর হোসেন (লাঙ্গল), জামায়াতে ইসলামীর কৃষ্ণ নন্দী (দাঁড়িপাল্লা), বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কিশোর কুমার রায় (কাস্তে), ইসলামী আন্দোলনের মো. আবু সাঈদ (হাতপাখা), জেএসডির প্রসেনজিৎ দত্ত (তারা), বিএনপির আমির এজাজ খান (ধানের শীষ), বাংলাদেশ মাইনরিটি জাতীয় পার্টির প্রবীর গোপাল রায় (রকেট), গণঅধিকার পরিষদের জিএম রোকনুজ্জামান (ট্রাক), বাংলাদেশ সম অধিকার পরিষদের সুব্রত মণ্ডল (দোয়াত কলম), দুই স্বতন্ত্র প্রার্থী অচিন্ত্য কুমার মণ্ডল (ঘোড়া) ও গোবিন্দ হালদার (কলস) প্রতীক নিয়ে নির্বাচনী লড়াইয়ে রয়েছেন।
খুলনা-২ (কেসিসির ১৬-৩১ নম্বর ওর্য়াড) আসনে ৩ প্রার্থীর মধ্যে বিএনপির নজরুল ইসলাম মঞ্জু (ধানের শীষ), জামায়াতের শেখ জাহাঙ্গীর হুসাইন হেলাল (দাঁড়িপাল্লা) ও ইসলামী আন্দোলনের মুফতি আমানুল্ল্যাহ (হাতপাখা)।
খুলনা-৩ (খুলনা সিটি করপোরশেন ১-১৫ নম্বর ওর্য়াড ও দিঘলিয়া উপজলোর আড়ংঘাটা ও যোগীপোল ইউনিয়ন) আসনে ১০ প্রার্থীর মধ্যে বিএনপির রকিবুল ইসলাম (ধানের শীষ), জামায়াতে ইসলামীর মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান (দাঁড়িপাল্লা), ইসলামী আন্দোলনের মো. আব্দুল আউয়াল (হাতপাখা), বাসদের জনার্দন দত্ত (মই), এনডিএমের শেখ আরমান হোসেন (সিংহ), জাতীয় পার্টির মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন (লাঙ্গল) এবং স্বতন্ত্র মো. মুরাদ খান লিটন (ঘুড়ি), মঈন মোহাম্মদ মায়াজ (ফুটবল), এসএম আরিফুর রহমান মিঠু (হরিণ) ও মো. আবুল হাসনাত সিদ্দিক (জাহাজ)।
খুলনা-৪ (দিঘলিয়ার ২টি ইউনয়িন ব্যতীত, রূপসা, তেরখাদা) আসনে চার প্রার্থীর মধ্যে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ইউনুস আহম্মেদ সেখ (হাতপাখা), বিএনপির এস কে আজিজুল বারী (ধানের শীষ), খেলাফত মজলিসের এসএম সাখাওয়াত হোসাইন (দেয়াল ঘড়ি) ও স্বতন্ত্র প্রার্থী এস এম আজমল হোসেন (ফুটবল)।
খুলনা-৫ (ফুলতলা, ডুমুরিয়া, গিলাতলা ক্যান্টনমেন্ট) আসনে চার প্রার্থীর মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর গোলাম পরওয়ার (দাঁড়িপাল্লা), বিএনপির মোহাম্মদ আলি আসগার (ধানের শীষ), বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির চিত্ত রঞ্জন গোলাদার (কাস্তে) ও জাতীয় পার্টির শামিম আরা পারভীন ইয়াসমীন (লাঙ্গল)।
খুলনা-৬ (কয়রা, পাইকগাছা) আসনের পাঁচ প্রার্থীর মধ্যে বিএনপির এসএম মনিরুল হাসান বাপ্পী (ধানের শীষ, জামায়াতে ইসলামীর মো. আবুল কালাম আজাদ (দাঁড়িপাল্লা), ইসলামী আন্দোলনের মো. আছাদুল্লাহ ফকির (হাতপাখা), বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির প্রশান্ত কুমার মণ্ডল (কাস্তে) ও জাতীয় পার্টির মো. মোস্তফা কামাল জাহাঙ্গীর (লাঙ্গল)।
আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, এবারের নির্বাচনে খুলনার ছয়টি আসনে ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা ৮৪০টি এবং ভোটকক্ষের সংখ্যা ৪ হাজার ২৫৭টি। আর মোট ২১ লাখ ১ হাজার ৩৩৫ জন ভোটারের মধ্যে ১০ লাখ ৪৬ হাজার ৪৩২ জন পুরুষ এবং ১০ লাখ ৫৪ হাজার ৮৭৪ জন নারী ভোটার রয়েছে।
ফলাফল ঘোষণা
খুলনা জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা আ স ম জামশেদ খোন্দকার বলেন, সিসিটিভি ক্যামেরা থাকবে। খুলনা-১, ২, ৪, ৫ ও ৬ আসনের নির্বাচনী ফলাফল জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষ থেকে এবং খুলনা-৩ আসনের ফলাফল বিভাগীয় কমিশার কার্যালয় থেকে ঘোষণা করা হবে।
মোহাম্মদ মিলন/এসএইচএ