‘আল্লায় যেন ভালো মানুষরে ক্ষমতায় আনে, যে আমাগো কষ্ট বুঝবো’

ভিক্ষাবৃত্তি করে সংসার চালান ষাটোর্ধ্ব আলম মোল্লা ও আনোয়ারা দম্পতি। প্রতিদিন সকালে ভিক্ষাবৃত্তির জন্য বের হন তারা। আজও সকালে বের হয়েছেন। তবে ভিক্ষাবৃত্তি নয়, আজ বের হয়েছেন ভোট দেওয়ার জন্য। পটুয়াখালী-৩ (গলাচিপা-দশমিনা) গলাচিপা উপজেলার বড়বাঁধ মহিলা দাখিল মাদ্রাসা কেন্দ্রে ভোট দিয়েছেন তারা।
স্ট্রোকে প্যারালাইসিসে আক্রান্ত আনোয়ারা বেগমের স্বামী আলম মোল্লা। হুইলচেয়ারে করে স্বামীকে নিয়ে ভোট দিয়েছেন তারা। ভোট দিতে যাওয়া এই দরিদ্র দম্পতির চোখেমুখে ক্লান্তির ছাপ থাকলেও মনে ছিল অদ্ভুত এক প্রত্যাশার আলো।
কাঁপা কণ্ঠে আনোয়ারা বেগম বললেন, সকালে স্বামীরে হুইলচেয়ারে লইয়া বাইর হই। হারাদিন ভিক্ষা কইরা ২০০-৩০০ টাহা পাই। আমাগো কোনো পোলামাইয়া নাই। দুই স্বামী-স্ত্রী থাহি। হ্যারে ভোট দিতে লইয়াইছি। দেশে এমন সরকার চাই, যারা আমাগো দেখবে, আমাগো মত গরীবের কষ্ট বোঝবে।
স্বামীর দিকে তাকিয়ে কথা বলতে বলতে আনোয়ারার চোখ ভিজে ওঠে। নিজের জীবনের করুণ গল্প বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন ৭০ বছর বয়সী আলম মোল্লা।
চোখের পানি মুছতে মুছতে তিনি বলেন, ৮ বছর ধইররা স্ট্রোক কইরা পইড়া আছি। একটা পালিত মেয়ে ছিল, তাও বিয়া দিয়া দিছি। এহন আমাগো কেউ দ্যাহে না। ভোট দেওয়া তো আমাগো অধিকার, তাই আইছি। আল্লায় যেন ভালো মানুষেরে ক্ষমতায় আনে, যে আমাগো কষ্ট বুঝবো, আমাগো মত মানষের পাশে দাঁড়াইবো।
রতনদী তালতলী ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের উলানিয়া কাছারিকান্দা গ্রামের এই দম্পতির জীবন একসময় ছিল স্বাভাবিক, হয়তো সুখেরও। কিন্তু প্রায় আট বছর আগে গাছ থেকে পড়ে স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে প্যারালাইজড হন আলম। সেই এক দুর্ঘটনা থামিয়ে দেয় তাদের জীবন চাকা।
এখন তাদের সংসার চলে ভিক্ষার টাকায়। ভাঙাচোরা, রিকশার টায়ার দিয়ে তৈরি অস্থায়ী হুইলচেয়ারই আলমের একমাত্র চলার সঙ্গী। জীবনের ভার টেনে নিয়ে চলেন আনোয়ারা। প্রতিদিন মানুষের দুয়ারে দুয়ারে হাত পেতে যে ২০০,৩০০ টাকা পান, তা দিয়েই কোনোরকমে দু’বেলা ভাত জোটে তাদের।
জীবনের সব কষ্টের মাঝেও ভুলে যাননি নিজের নাগরিক অধিকার। ভোট দিতে এসে যেন তাদের চোখে ছিল এক নীরব উৎসবের ঝিলিক। তারা ভাবছেন এবার ব্যালটের সিলের মাধ্যমে হয়তো বদলে যাবে তাদের ভাগ্য, বদলে যাবে দুঃখের দিন।
ভোটের লাইনে দাঁড়ানো প্রতিবেশী মিষ্টি বেগম বলেন, উনি এক সময় কাজ করতেন। গাছ থেকে পড়ে এই অবস্থা। খুব কষ্টে থাকে। দশ দুয়ারে ভিক্ষা করে খায়। আমরা এমন এমপি চাই, যে এই রকম অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াবে।
আরেক প্রতিবেশী মমতাজ বেগমের কণ্ঠেও একই আক্ষেপ। তিনি বলেন, তাগো জীবনের কষ্ট দেখলে আমাগোও কষ্ট হয়। কিন্তু আমরা কী করমু? এমন মানুষ চাই, যে সবাইর পাশে থাকবে।
কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার কামরুল হোসেন বলেন, আমাদের আনসার সদস্যদের সহযোগিতায় প্রতিবন্ধী আলমসহ তার স্ত্রীর ভোটদানের ব্যবস্থ্যা করেছি। এখানে সবাই নির্বিঘ্নে ভোট দিয়েছেন।
আনোয়ারা-আলম দম্পতি পটুয়াখালী-৩ (গলাচিপা-দশমিনা) আসনের ভোটার। এই আসনে গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি ও বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী নুরুল হক নুর এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী বিএনপির সাবেক নির্বাহী কমিটির সদস্য হাসান মামুন লড়ছেন।
রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের বাইরে, এই বৃদ্ধ দম্পতির কাছে ভোট মানে শুধু একটি প্রতীক নয় বরং একটি আশার নাম। একটি সম্ভাবনার নাম।
জেলা নির্বাচন অফিসের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, পটুয়াখালীর চারটি আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ১৫ লাখ ৯ হাজার ৫৮৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৭ লাখ ৬১ হাজার ৯৮৬ জন, নারী ভোটার ৭ লাখ ৪৭ হাজার ৫৮৫ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ১৮ জন।
সোহাইব মাকসুদ নুরনবী/এনটি