ভোটযুদ্ধে জামানত হারালেন ৯ নারী প্রার্থী

সদ্য অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রংপুর বিভাগের আট জেলার ৩৩টি আসনে ভোটযুদ্ধে লড়েছেন ৯ নারী। এর মধ্যে ৪ জন ছিল স্বতন্ত্র প্রার্থী। এ ছাড়া, হিজড়া (তৃতীয় লিঙ্গ) জনগোষ্ঠী থেকে একমাত্র স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা চালালেও ভোটের চার দিন আগে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন আনোয়ারা ইসলাম রানী।
এবারের নির্বাচনে এসব প্রার্থী তাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারেননি। প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তোলার পরিবর্তে তারা প্রত্যেকেই জামানত হারিয়েছেন। ভোটের ফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, নারী প্রার্থীদের প্রাপ্ত সর্বোচ্চ ভোটের সংখ্যা ২ হাজার ৮৭৬ এবং সর্বনিম্ন ১৫৩।
রংপুর-৩ আসনে (সদর ও রসিক) স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য রিটা রহমান সূর্যমুখী প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পেয়েছেন ৪৬১ ভোট। রংপুর-৪ (পীরগাছা ও কাউনিয়া) আসনে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ মাকর্সবাদী’র প্রগতি বর্মণ তমা কাঁচি প্রতীকে পান ২৪৩ ভোট। রংপুর-৬ (পীরগঞ্জ) আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী তাকিয়া জাহান চৌধুরী সূর্যমুখী প্রতীকে পেয়েছেন মাত্র ১৫৩ ভোট।
ঠাকুরগাঁও-২ (বালিয়াডাঙ্গী, হরিপুর ও রাণীশংকৈল) আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী নূরুন নাহার বেগম লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পেয়েছেন ২ হাজার ৮৭৬ ভোট। ঠাকুরগাঁও-৩ (রাণীশংকৈল, পীরগঞ্জ) আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ফুটবল প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে আশা মনি পান ২৭৯ ভোট।
গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ) আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী ছালমা আক্তার কলস প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তার প্রাপ্ত ভোট ৩৭৮। গাইবান্ধা-৫ (ফুলছড়ি ও সাঘাটা) আসনে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ মার্কসবাদীর রাহেলা খাতুন কাঁচি প্রতীকে পান ২৪৯ ভোট।
দিনাজপুর-৩ (সদর) আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা দুই নারী প্রার্থীর মধ্যে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদের কিবরিয়া হোসেন মই প্রতীকে পেয়েছেন ২৮৩ ভোট এবং বাংলাদেশ মুসলিম লীগের লায়লা তুল রীমা হারিকেন প্রতীকে পেয়েছেন ২১৪ ভোট।
এ ছাড়া, নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিলেও রংপুর-৩ (সদর ও রসিক) আসনের ব্যালট পেপারে নাম ও ঈগল প্রতীক থাকা স্বতন্ত্র প্রার্থী আনোয়ারা ইসলাম রানী ২৩০ ভোট পেয়েছেন।
এবারের নির্বাচনে রংপুর বিভাগের পঞ্চগড়, নীলফামারী, লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রাম জেলার আসনগুলোতে পুরুষের স্বতস্ফূর্ত অংশগ্রহণ থাকলেও ভোটের মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতার লড়াইয়ে ছিলেন না কোনো নারী। তবে তফসিল ঘোষণার আগে ও পরে এসব জেলায় অনেকই প্রার্থী হতে আগ্রহ প্রকাশসহ প্রচার-প্রচারণায় অংশ নিয়েছিলেন।
একাধিক নারী প্রার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দলীয় মনোনয়ন পেতে গিয়ে তাদের সবচেয়ে বড় বাধা অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও সাংগঠনিক প্রভাব। একইসঙ্গে মাঠে কাজ, জনপ্রিয়তা সব থাকলেও শেষ পর্যন্ত মনোনয়ন বোর্ডে সিদ্ধান্ত হয় অন্যভাবে। সেখানে নারীদের নাম খুবই কম উঠে আসে।
এদিকে, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) ১৯৭২-এর তৃতীয় সংশোধনী অনুসারে, রাজনৈতিক দলগুলোকে কেন্দ্রীয় কমিটিসহ সব পদে অন্তত ৩৩ শতাংশ নারী রাখার কথা বলা হয়েছিল। তবে, বাস্তবতা ভিন্ন। কোনো বড় রাজনৈতিক দল এই বাধ্যবাধকতা পালন করতে পারেনি বা করছে না। দলগুলোকে কেন্দ্রীয় কমিটিসহ সব কমিটির পদে অন্তত ৩৩ শতাংশ নারী রাখার ব্যাপারে ২০২১ সালে নির্বাচন কমিশন থেকে সময়সীমা ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাধ্যবাধকতা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছিল।
চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সংসদে প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে আলোচনায় ৫ শতাংশ নারীকে মনোনয়ন দেওয়ার প্রস্তাবে অধিকাংশ দল একমত হয়। এবারের নির্বাচনে ৫ শতাংশ মনোনয়ন দেওয়ার ব্যবস্থা রেখে জুলাই সনদ চূড়ান্ত করা হয়। কিন্তু দলগুলো কথা রাখেনি।
বিএনপি ৫ শতাংশ নারী মনোনয়নের কথা বললেও এবার নির্বাচনে দলটি তা মানেনি। তাদের মোট প্রার্থীর ৩ দশমিক ৫ শতাংশ নারী। আর জামায়াতে ইসলামী কোনো আসনেই নারী প্রার্থীকে মনোনয়ন দেয়নি।
দেখা গেছে, রংপুর অঞ্চলে যেসব নারী প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নেন, তাদের একটি বড় অংশ স্বতন্ত্র বা ছোট রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিত্ব করেন। বড় রাজনৈতিক দলগুলোতে নারীদের মনোনয়ন দেওয়া হয় মূলত ‘প্রতীকী আসনে’ বা এমন এলাকায়, যেখানে দলের জয়ের সম্ভাবনা তুলনামূলক কম। ফলে নারী প্রার্থীর সংখ্যা বাড়লেও নির্বাচিত হওয়ার হার এক শতাংশেরও কম।
এ ব্যাপারে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাঠে থাকা ঠাকুরগাঁও-৩ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী আশা মনি বলেন, কোনো দলই নারীদের সেভাবে মূল্যায়ন করে না। সে কারণে কারো কারো পেছনে না ঘুরে নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছিলাম।
রংপুর-৪ আসনে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ মাকর্সবাদীর প্রার্থী প্রগতি বর্মণ তমা বলেন, দল আমাকে মনোনয়ন দিয়েছে। দলীয় ‘কাঁচি প্রতীক’ নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়েছি।
ভোটের মাঠে নারীদের এগিয়ে আনতে চাইলে শুধু উৎসাহ নয়, রাজনৈতিক দলের ভেতর কাঠামোগত সংস্কার জরুরি বলে মনে করেন সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন রংপুর জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক নাসিমা আমিন।
তিনি বলেন, তৃণমূলের নারীদের ক্ষমতায়ন এবং রাজনৈতিক বিকাশে সব দলকে এগিয়ে আসতে হবে। মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানসহ দেশের প্রতিটি আন্দোলনের সম্মুখভাগে থাকা নারীদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। এখন আর নারীকে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে নয় বরং অধিকারের দৃষ্টিভঙ্গিতে এগিয়ে যেতে সবার পাশে থাকা উচিত।
ফরহাদুজ্জামান ফারুক/এএমকে