ময়মনসিংহে বিএনপির ৩টি আসন হারানোর নেপথ্যে বিদ্রোহী

স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশে এবারই প্রথম ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ময়মনসিংহ জেলার ১১টি আসনের মধ্যে ৮টিতে জয় পেয়েছে বিএনপি। এর আগে এ জেলায় আর কখনও এতো আসন পায়নি দলটি। তবে দলীয় বিদ্রোহীর কারণে এ জেলার ৩টি আসনে ধরাশায়ী হয়েছেন বিএনপির প্রার্থীরা। এর নেপথ্যে ছিল দলছুট নেতাদের অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র। ভোটের সমীকরণ এ কথাই বলছে- এমন দাবি রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাধারণ ভোটারদের।
নির্বাচন পরবর্তী গত কয়েকদিনে প্রার্থীদের জয়-পরাজয়ের নানা সমীকরণে ময়মনসিংহ জেলার বিভিন্ন আসনের নেতাকর্মী ও সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে এসব তথ্য।
এসব ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে জেলা উত্তর বিএনপির সদস্য আব্দুস সাত্তারসহ দলীয় নেতাকর্মীরা বলেন, এবারের নির্বাচনে জেলা সবক’টি আসন বিএনপির অনুকূলে রাখার প্রবল সম্ভবনা ছিল। কিন্তু দলীয় প্রধানের নির্দেশ অমান্য করা একটি দলছুট মহলের অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্রের কারণে ৩টি আসন হাত ছাড়া হয়েছে। নির্বাচন পরবর্তী ভোট বিশ্লেষণ বলছে এ কথাই। এতে দেখা যায়, পরাজিত আসনগুলোতে বিএনপির নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধ থাকলে কমপক্ষে আরও ২টি আসন বিএনপির দখলে আসার ফলাফল এখন দৃশ্যমান।
এই অবস্থায় দলের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া দলছুট হওয়া নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক তদন্ত কমিটির মাধ্যমে প্রযোজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ অতিব জরুরি বলে দাবি জানান, মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সহসভাপতি আতিকুল বাশার রুমিত। অন্যথায় দলের সাংগঠনিক কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলেও তার দাবি।
সূত্রমতে, এ জেলার ১১টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ৮টিতেই জয়ী হয়েছে বিএনপি। তবে দলীয় বিদ্রোহীর কারণে বাকি ৩টি আসনে পরাজিয় হয়েছে বিএনপি। এর মধ্যে ময়মনসিংহ-৬ (ফুলবাড়ীয়া) আসনটি পেয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, ময়মনসিংহ-২ (ফুলপুর-তারাকান্দা) আসনটি পেয়েছে খেলাফত মজলিস এবং ময়মনসিংহ-১ (হালুয়াঘাট-ধোবাউড়া) আসনটি পেয়েছে খোদ নিজ দলের বিদ্রোহী।
ভোটের সমীকরণে দেখা যায়, ময়মনসিংহ-১ আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী সালমান ওমর রুবেল পেয়েছেন ১ লাখ ৮ হাজার ২৬৫ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স পেয়েছেন ১ লাখ ১ হাজার ৯২৬ ভোট। এছাড়াও ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য জোটোর প্রার্থী খেলাফত মজলিস পেয়েছে ৫৩ হাজার ২২২ ভোট। এ হিসেবে বিএনপির দুই প্রার্থী এক হলে বিএনপির মোট ভোট হতো ২ লাখ ১০ হাজার ১৯১ ভোট। এতে বিরোধী জোটের সঙ্গে ব্যবধান হতো ১ লাখ ৫৬ হাজার ৯৬৯ ভোট। যা সারাদেশে ব্যবধান ভোটে রেকর্ড হবার সম্ভাবনা ছিল।
একই অবস্থা ময়মনসিংহ-২ আসনে। এ আসনে ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য জোট মনোনীত খেলাফত মজলিসের রিকশা প্রতীকের প্রার্থী মুহাম্মদুল্লাহ ১ লাখ ৪৬ হাজার ২০২ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছে। তার সঙ্গে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি মনোনীত ধানের শীষের প্রার্থী মোতাহার হোসেন তালুকদার পেয়েছেন ১ লাখ ১৮ হাজার ৪৩৮ ভোট। এখানে বিএনপির বিদ্রোহী সাবেক এমপি শাহ শহীদ সারোয়ার পেয়েছেন ৪৮ হাজার ৮৭৪ ভোট। এ হিসাবে একত্রে দুই প্রার্থী ভোটের পরিমাণ হলো ১ লাখ ৬৭ হাজার ৩১২ ভোট। এতে বিদ্রোহী না থাকলে বিএনপির ভোটের ব্যবধান হতে পারতো ২১ হাজার ১১০ ভোট। এছাড়াও এ আসনটিতে মনোনয়নবঞ্চিত অপর প্রার্থীদের দলের পক্ষে প্রচারণা ছিল গাঁ ছাড়াভাব বা লোক দেখানো-এমন দাবি পরাজিত প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকদের।
একইভাবে ময়মনসিংহ-৬ আসনে বিএনপির অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্রে পরাজিত হয়েছেন বিএনপির প্রার্থী শেরে বাংলা একেএম ফজলুল হকের নাতি জামাতা আকতারুল আলম ফারুক। ৭৭ হাজার ৩২৫ ভোট পেয়ে এ আসনে জয় পেয়েছেন ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য জোট মনোনীত জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী কামরুল হাসান মিলন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী (বিএনপি দলীয় সাবেক সংসদ সদস্য ইঞ্জি. শামসুদ্দিন আহম্মেদের স্ত্রী) আখতার সুলতানা ফুটবল পেয়েছেন ৫৩ হাজার ৩৩১ ভোট। অপরদিকে বিএনপির প্রার্থী পেয়েছেন ৪৮ হাজার ৯৯৪ ভোট। এ হিসেবেও এ আসনে বিদ্রোহী না থাকলে বিএনপির মোট ভোট হতো ১ লাখ ২ হাজার ৩২৫ ভোট। তবে এ আসনটিতে জামায়াতের বিদ্রোহী প্রার্থী জসীম উদ্দিন পেয়েছেন ৫১ হাজার ২৩৪ ভোট। এরপরও বিএনপি ঐক্যবদ্ধ থাকলেও জয়ের সম্ভাবনা ছিল প্রবল, এমন দাবি নেতাকর্মীদের।
জানতে চাইলে ময়মনসিংহ উত্তর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক অধ্যাপক এনায়েত উল্লাহ বলেন, দলের বিদ্রোহী ধানের শীষের পরাজয়ের একমাত্র কারণ। আমরা কেন্দ্রের সঙ্গে এসব বিষয়ে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।
এ বিষয়ে ময়মনসিংহ দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্য সচিব মো. রোকনুজ্জামান সরকার রোকন বলেন, জনগণ যাকে মনে করেছে, তাকে ভোট দিয়েছে। তবে কী কারণে আমাদের দলীয় প্রার্থী পরাজিত হয়েছে- এর পেছনে বা কোথায় দুর্বলতাগুলো ছিল তা আমরা তদন্ত করে খতিয়ে দেখে সাংগঠনিক রির্পোটে উপস্থাপনের চেষ্টা করব।
আমান উল্লাহ আকন্দ/এসএইচএ