বাসে পরিচয় থেকে প্রেম-বিয়ে, শেষে হত্যা

ফরিদপুরের মধুখালীতে স্ত্রী মীরা আক্তার হত্যা মামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত প্রধান আসামি মোস্তফা কামালকে (৪২) গ্রেপ্তার করেছে র্যাব। ২০১৩ সালের ১ জানুয়ারি স্ত্রীকে হত্যা করে পলাতক ছিলেন তিনি। ঘটনার প্রায় ১৩ বছর পর এবং সাজা ঘোষণার দেড় বছর পর তাকে গ্রেপ্তার করা হলো।
গতকাল বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যা ৬টার দিকে গাজীপুর জেলার শ্রীপুর উপজেলা সদরের আনসার রোড এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। র্যাবের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার ও সহকারী পরিচালক (মিডিয়া) তাপস কর্মকার স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
আদালত সূত্রে জানা যায়, ২০১২ সালের ২৮ ডিসেম্বর মীরা আক্তার হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় ২০২৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর ফরিদপুরের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ প্রথম আদালতের বিচারক অশোক কুমার দত্ত রায় ঘোষণা করেন। রায়ে স্বামী মোস্তফা কামাল ও তার সহযোগী মজিদ মোল্লাকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড এবং প্রত্যেককে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। জরিমানা অনাদায়ে আরও তিন মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়।
রায় ঘোষণার সময় মজিদ মোল্লা আদালতে উপস্থিত থাকলেও মোস্তফা কামাল পলাতক ছিলেন। আদালত তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন এবং গ্রেপ্তারের দিন থেকে সাজা কার্যকরের নির্দেশ দেন।
মামলার বিবরণে জানা যায়, ২০১২ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর মীরা বাসে করে ফরিদপুর শহর থেকে মধুখালী উপজেলার কামারখালী যাচ্ছিলেন। ওই বাসে পাশের সিটে তার সঙ্গে পরিচয় হয় মোস্তফা কামালের। এ পরিচয় থেকে প্রেম। পরে তারা গোপনে এফিডেভিট করে বিয়ে করেন।
বিয়ে করলেও মোস্তফা তার স্ত্রীকে বাড়িতে তুলে নিতে সময় চান। স্বামীর বাড়িতে ওঠার ব্যাপার নিয়ে মাঝে মাঝেই স্বামী-স্ত্রীর মাঝে ঝগড়া হতো। তবে নিজ শ্বশুরবাড়ি বেড়াতে যেতেন মোস্তফা। সেখানে যখন শ্বশুরবাড়ির লোকজন জানতে চাইত, স্ত্রীকে কবে বাড়িতে নেবে, তখন তিনি বলতেন আর একটু সময় লাগবে। এর মধ্যে একদিন মীরা মোস্তফাকে জানান, স্ত্রীর মর্যাদা পেতে সে নিজেই স্বামীর বাড়িতে গিয়ে হাজির হবে। বিয়ের কয়েক মাস পরে মোস্তফার বাড়ির ঠিকানা জেনে ২০১২ সালের ২৮ ডিসেম্বর রওনা দেন মীরা আক্তার। এ খবর মোবাইলে মোস্তফাকে জানালে সে তার বাড়িতে গেলে সমস্যা হবে বলে মীরাকে ফিরে যেতে অনুরোধ করেন। মীরা এ কথা অগ্রাহ্য করে ওই দিন বাসে করে মধুখালি থেকে ফরিদপুর সদরের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। বাসে ওঠার পর মীরা মোস্তফাকে জানান, তিনি মধুখালী থেকে রওনা হয়েছেন। এই অবস্থায় ফরিদপুর সদরের উজান মল্লিকপুর আসার পথে মধুখালী উপজেলার মাঝকান্দি এলাকায় মোস্তফা মীরাকে বাস থেকে নামিয়ে নেন। পরে বন্ধু মজিদ মোল্লার সহায়তায় মাঝকান্দি পারিশা ফিলিং স্টেশনের পেছনে একটি আখক্ষেতে নিয়ে মীরাকে গলা টিপে হত্যা করা হয়।
অজ্ঞাতনামা লাশ হিসেবে মধুখালী থানার পুলিশ ২০১৩ সালের ১ জানুয়ারি ওই জায়গা থেকে মরদেহ উদ্ধার করে। এ ঘটনায় মধুখালী থানার এসআই রাকিবুল হক বাদী হয়ে ওই দিনই অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
এ হত্যা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মধুখালী থানার এসআই মাহিদুল হক ২০১৮ সালের ৩১ মে নিহত নারীর স্বামী মোস্তফা কামাল ও তার বন্ধু মজিদ মোল্লাকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দেন।
র্যাবের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ও তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় র্যাব-১০, ফরিদপুর ক্যাম্প এবং র্যাব-১ এর যৌথ আভিযানিক দল গতকাল বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) তাকে গ্রেপ্তার করে।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে মধুখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. তাইজুর রহমান বলেন, আজ বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) সকালে র্যাব ওই আসামিকে আমাদের কাছে হস্তান্তর করেছে। আজ দুপুরে তাকে আদালতের মাধ্যমে জেল হাজতে পাঠানো হবে।
জহির হোসেন/আরকে