শ্রেণিকক্ষই শিক্ষকের বসতি, ৮ম শ্রেণির পর ঝড়ে পড়ে শিশুরা

রাজশাহীর পবা উপজেলার চরমাজারদিয়াড়ে একটি নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়। কিন্তু এই বিদ্যালয়টি ভাঙা-ঝাপসা টিনের চালা, ভগ্নপ্রায় কক্ষ ও শিক্ষকের নগন্য বেতনেই সীমাবদ্ধ। স্কুলের সহকারী শিক্ষক নুরুল ইসলাম ২০০২ সাল থেকে মাসে মাত্র ৫ হাজার টাকায় কাজ করছেন, যা ছাত্রছাত্রীদের পাঁচ টাকার ফি এবং স্থানীয় হাটের চাঁদা থেকে ওঠে। অভাবে পড়ে শিক্ষককে থাকতে হয় ক্লাসরুমে, ছাত্রছাত্রীরা ঝড়ে পড়ে অষ্টম শ্রেণিতেই। স্বপ্নের শিক্ষা এখানে শুধুই সংগ্রাম।
বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নুরুল ইসলাম (৫৩)। বিদ্যালয়টি ১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও ২৪ বছরেও মূলহীন শ্রম দিচ্ছেন তিনি। শুধু তিনি একা নন- তার সঙ্গে আছেন আরও দুই শিক্ষক। তবে বাকি দুই শিক্ষক, বিদ্যালয়ের শিক্ষক নুরুল ইসলামের করুন গল্পের স্বাক্ষী।
বিদ্যালয়টি এমপিও হবে, নিজের স্থায়ী চাকরি হবে, এমন আশায় ২০০২ সালের শুরুর দিকে নওগাঁ জেলার বদলগাছী উপজেলার গ্রামের বাড়িতে সংসার, সন্তানাদী রেখে পাড়ি জমান রাজশাহীর প্রত্যন্ত চরে। যেখানে এখনও পৌঁছায়নি বিদ্যুৎ, ছোয়া লাগেনি আধুনিক জীবনযাত্রার। শিক্ষকতা পেশাকে ভালোবেসে ও স্থায়ী কর্মের সন্ধানে এসে পড়েছেন অথয় পদ্মায়।
ভারতীয় সীমান্তবর্তী এলাকার পদ্মা নদীর চরমাজাড়দিয়াড়। এটি রাজশাহী জেলার পবা উপজেলার একটি ইউনিয়ন। এই চরে সাড়ে আট লোকের বসবাস। ভোটর রয়েছেন ৩ হাজার ৪৪৪ জন। এখানে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও একটি নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে। চরের ছেলে-মেয়েরা প্রাথমিকের গন্ডি পেড়লে ঠাঁই হয় নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে। বিদ্যালয় পাড়ি দিলে বসতে হয় বিয়ের পিড়িতে। তাই এসএসসি পর্যন্ত একটা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দাবি চরবাসীর দীর্ঘদিনের। কিন্তু সেই দাবি পূরণ হয়নি এত বছরেও। তাই এসএসসি পরীক্ষায় বসতে হলে চরের ছেলে-মেয়েদের পদ্মা পাড়ি দিয়ে থাকতে হয় রাজশাহী শহরে। ৯০ শতাংশ নিম্নবিত্ত পরিবারের পক্ষে তা সম্ভব হয়ে ওঠে না। তাই প্রতিবছর ঝরে পড়ে শিক্ষার্থীরা। সঙ্গতকারণে এই চরে খুবই গুরুত্বপূর্ণ মাজাড়দিয়াড় নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি। কিন্তু এই বিদ্যালয়টিও নাজুক অবস্থা রয়েছে।
সম্প্রতি চরমাজারদিয়াড়ে গিয়ে দেখা গেছে, চার কক্ষের বিদ্যালয়টি চালা টিনের। তার মধ্যে এক কক্ষ নবনির্মিত। জরাজীর্ণ তিন কক্ষে চলে ক্লাস। দক্ষিণ দুয়াড়ির পূর্ব থেকে সপ্তম শ্রেণি। তার পাশে ষষ্ঠ শ্রেণি। এই শ্রেণির শিক্ষার্থী ৫০ জন। তার কিছু কম সপ্তম শ্রেণিতে। অষ্টম শ্রেণিতে শিক্ষার্থী ২০ জন।
অষ্টম শ্রেণিতে ভেতরে ঢুকতে চোখে পড়ে টেবিল ও কয়েকটি ব্রেঞ্চ দিয়ে করা ঘুমানোর জায়গা। তার অপরে গুছানো অবস্থায় রয়েছে বিছানা। পাশেই ঝুলছে শিক্ষকের পোশাক। দক্ষিণ কোনে চেয়ার-টেবিল পাতা। সেখানে রয়েছে বেশ কিছু বই-পস্তুক।
বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা অকপটে স্বীকার করলেন, ক্লাসরুমেই থাকেন শিক্ষক নুরুল ইসলাম। বেতন নেই। থাকার জায়গা নেই। চরে তার থাকার মতো জায়গাও নেই। আর রাজশাহী শহরে যেতে নদী পাড়ি দিতে হবে। একেতো বেতন নেই, দুই শহরে ভাড়া থাকা সম্ভব না। তাই তিনি ক্লাসরুমেই থাকেন। এছাড়া সকাল, দুপুর ও রাতের খাবার খান স্থানীয় বাসিন্দা সালাউদ্দিন টুকুর বাসায়।
সহকারী শিক্ষক নুরুল ইসলাম ঢাকা পোস্টকে বলেন, ২০০২ সাল থেকে এখানে আছি। স্কুল কমিটি মাসে ৫ হাজার টাকা বেতন দেয়। এই টাকা স্থানীয় হাট থেকে তোলা হয়। আশায় পড়ে আছি, এমপিও ভুক্ত হবে স্থানীয়ভাবে বেতন পাব। কিন্তু বছরের পড় বছর কেটে গেছে। তবুও হয়নি।
ক্লাসরুমে থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, এটা লজ্জা জনক বিষয়। উপায় নেই, কি করার। পাশে একটা ক্লাসরুম হচ্ছে। কিছুদিন পড়ে সেখানে চলে যাব।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক গাউসুল আলম। তিনি অসুস্থ। তাই দুই মাস থেকে স্কুলে আসেন না বলে জানান শিক্ষকরা। বিষয়টি নিয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী রিদিকা তাবাসসুম বলল, আমরা পড়তে চাই, কিন্তু এখানে স্কুল নাই। কয়দিন আগে এক আপুর বিয়ে হয়ে গেল। সে পড়তে চায়ছিল, পারেনি।
চরের গৃহবধূ ময়না বেগম দুই ছেলে। চরের স্কুলে এসএসসির সুযোগ নেই। তাই লেখাপড়া করাচ্ছেন শহরে। তিনি বলেন, পড়াতে অনেক কষ্টে হচ্ছে। প্রতিদিন তাদের পড়াশোনার খরচ যোগাতে হাঁস-মুরগি বিক্রি করতে হয়। এখানে এইট পাস করলেই শেষ। মেয়েদের বাল্যবিয়ে হইতেছে। এটি ঠেকানো যায় না। ভোটের সময় দেখা যায়, ভোটের পর কাউরে দেখি না। আমাদের কিচ্ছু করার নেই।
পশু চিকিৎসক সেলিম রেজা বলেন, চরে তিনটা বড় সমস্যা—শিক্ষা, স্বাস্থ্য আর যোগাযোগ। অসুস্থ মানুষ হাসপাতালে নিতে গিয়েই ঝুঁকিতে পড়তে হয়। শিক্ষা আর স্বাস্থ্যের অবস্থা খুবই খাপার। এখানে প্রাথমিক এবং অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। এসএসসি পরীক্ষা অংশ নিতে হলে শহরে যেতে হবে। এটি অনেক পরিবারের পক্ষে সম্ভব না। এরপরে অনেক শিশুরা ঝরে যায় অষ্টম শ্রেণিতেই। এর পরে তাদের বসতে হয় বিয়ের পিঁড়িতে। ফলে দেখা যায়- শিশু বয়সে শিশুর মা হয় অনেকেই।
চরমাজারদিয়াড় ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার হুমায়ুন করির ঢাকা পোস্টে বলেন, চরে সাড়ে আট হাজার মানুষের বসবাস। চরে এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার মতো স্কুল নেই। অনেকেই বলে চরে শিক্ষার্থী নেই। তাহলে একটা প্রাথমিক, একটা নিম্ন মাধ্যমিক ও তিনটা ব্রাক স্কুলগুলো কিভাবে চলে। আমরা জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইউএনওসহ অনেকেই বলেছি। কিন্তু কোন কাজ হয়নি।
তিনি বলেন, চরে ঝড়ে পড়ার হার বেশি। পঞ্চম শ্রেণিতে বিয়ে দেওয়া শুরু হয়। কি করবে অভিভাবকরা। বাড়িতে তো আর বসিয়ে রাখা যায় না। তাই অনেক পরিবার তাদের সন্তানের অল্প বয়সে বিয়ে দিয়ে দেয়। পুরোচরে একটি নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে। সেখানের শিক্ষকদের আবার বেতন নেই। স্কুলটি এমপিও হয়নি। শিক্ষার্থীদের থেকে মাসে ৩০০ টাকা করে তুলে শিক্ষকদের দেওয়া হয়।
পবা উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মোতাহার হোসেন বলেন, চরমাজারদিয়াড়ে একটি নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে, যদিও সেটির এমপিও নেই। কিছু শিক্ষার্থী রয়েছে, কয়েকজন শিক্ষক তাদের ক্লাস করান। মূলত এমপিও এবং শিক্ষকদের বিষয়ের চার থেকে উঠে আসা দরকার ছিল। কিন্তু সেভাবে রেসপন্স পাওয়া যায় না। সবমিলে আমরাও চাই- সেখানে একটা ভালো মানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হোক এবং বাচ্চারা সেখানে শিক্ষা নিক।
বিষয়টি নিয়ে পবা উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আরাফাত আমান আজিজের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
শাহিনুল আশিক/আরকে