স্বস্তির রেলপথে ঝুঁকির যাত্রা, ৫৯টি ফিস প্লেটের ৪৭ নাটবল্টু উধাও

রাজশাহীতে আসা-যাওয়ার পথে ট্রেন যখন গর্জে ওঠে, তখন নিচে রেললাইনের প্রতিটি জয়েন্টে কাঁপন ধরে। জয়েন্টের বিকট শব্দের নিচে লুকিয়ে আছে এক ভয়াবহ বাস্তবতা—একটি নাটল্টু কম মানেই চলন্ত ট্রেনে থাকা যাত্রীদের জীবনের ঝুঁকি। প্রতিদিন এই পথে লোকাল ও আন্তঃনগরসহ ১৭টি ট্রেন চলাচল করে।
রেললাইনের জয়েন্টের দুটি অংশকে একত্রে ধরে রাখে ‘ফিস প্লেট’ নামে লোহার পাত। নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি জয়েন্টে চারটি করে নাটবল্টু থাকার কথা। কিন্তু পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের এক কিলোমিটার পথে (২৫৮/১ থেকে ২৫৯/০) ৫৯টি জয়েন্টে দেখা গেছে-ভিন্ন চিত্র। যেখানে থাকার কথা ২৩৬টি নাটবল্টু, সেখানে বাস্তবে আছে মাত্র ১৮৯টি। অর্থাৎ ৪৭টি নাটবল্টু উধাও। এই এক কিলোমিটারই যেন পুরো রেল ব্যবস্থার প্রতিচ্ছবি।
রেলওয়ের কয়েকজন কর্মীর দাবি- বসতি ফাঁকা এলাকায় চুরি হয় বেশি। একই সঙ্গে বস্তি এলাকায় এসব নাটবল্টু বেশি হারায়। তাই সরেজমিনে বস্তি ও ফাঁকা এলাকা (২৫৮/১ থেকে ২৫৯/০) ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।
নাটবল্টু নেই- এমন সংখ্যা কম হলেও ঝুঁকির বিবেচনায় বড়। কারণ একটি রেললাইন আরেকটি রেললাইনের সঙ্গে যুক্ত করতে দুই-দুই চারটি নাটবল্টুর ব্যবহার হয়। যেখানে তিনটি নাটবল্টু রয়েছে, সেখানে জয়েন্টের একপাশে একটি ও অপর পাশে দুটি নাটবল্টুতে চলাচল করছে ট্রেন। যে লাইনে একটি নাটবল্টু রয়েছে- দুর্ঘটনাবসত যদি একটি নাটবল্টু না থাকে বা হারিয়ে যায়, সেক্ষেত্রে ঘটতে পারে বড় ধরনের দুর্ঘটনা।
উল্লিখিত এক কিলোমিটার পথে রেললাইনের উত্তরপাশে ৩১টি জয়েন্ট রয়েছে। এই জয়েন্টগুলোতে নাটবল্টু রয়েছে ১০২টি। বাস্তবে থাকার কথা ১২৪টি। এই পাশে ঘাটতি রয়েছে ২২টি। রেললাইনের দক্ষিণপাশে ২৮টি জয়েন্ট রয়েছে। এই জয়েন্টগুলোতে নাটবল্টু রয়েছে ৮৭টি। বাস্তবে থাকার কথা ১১২টি। এই পাশের ঘাটতি রয়েছে ২৫টি।

দক্ষিণে রেললাইন ভেঙে যাওয়ার কারণে নতুন করে জয়েন্ট হয়েছে চারটি। এর মধ্যে একটি ছাড়া বাকি তিনটিতে রয়েছে তিনটি করে নাটবল্টু। এছাড়াও উত্তরে রেললাইন ভেঙে যাওয়ার কারণে নতুন করে জয়েন্ট হয়েছে সাতটি। এর মধ্যে দুটি ছাড়া বাকি পাঁচটিতে রয়েছে তিনটি করে নাটবল্টু। সম্প্রতি রেল ব্রিজের অদূরে রেললাইন বাঁকা রোধে কাঠ ও রেললাইন মাটিতে পুঁতে সাপোর্ট দেওয়া হয়। সেই রাতে রেলওয়ের কর্মীদের মাটিতে পুঁতে রাখা রেললাইনের অংশ চুরি হয়ে যায়।
সরেজমিনে দেখা গেছে, জয়েন্টগুলোতে বেড়া বাঁধা লোহার তার, পলিথিনের দড়ি দিয়ে নাটের সঙ্গে বল্টুগুলো আটকানো হয়েছে। রেলওয়ের চাবিম্যানদের দাবি- এসব নাটবল্টুর থ্রেটে সমস্যা রয়েছে। এছাড়া যে জয়েন্টগুলোতে নাটবল্টু নেই সেগুলোর আবার ফিস প্লেটের ঘাট বড় হয়ে গেছে। ফলে ঠিকমতো জয়েন্ট ধরে রাখতে পাড়ে না। ট্রেন চলাচলের সময় জয়েন্টে চাকা আসলে বিকট শব্দ হয়।
নাম প্রকাশ না করার অনুরোধে কয়েকজন চাবিম্যান বলেন, অনেক জয়েন্টে নাটবল্টু নেই। আমরা অফিসে জানিয়েছি। কিন্তু পাওয়া যায়নি। অফিসে কোনো নষ্ট নাটবল্টু জমা দিলেই ভালো নাটবল্টু পাওয়া যায়। তবে সেই নাটবল্টুগুলো গুনে-মানে ভালো না। কয়েকবার টাইট দিলে প্যাঁচ কেটে যায়। ফলে এনিয়ে সমস্যায় রয়েছেন তারা। দুর্বল নাটবল্টু হওয়ার কারণে তাদের (চাবিম্যান) প্রতিদিন চেক দিতে হয়।
উল্লিখিত ১ কিলোমিটারের মধ্যে একটি রেলওয়ে ব্রিজ রয়েছে। ব্রিজের মধ্যে দুই পাশের লাইনে দুইটি জয়েন্ট রয়েছে। সেটিতে চারটি করে নাটবল্টু থাকলেও ব্রিজের পশ্চিমপাশের দুই জয়েন্টে নেই তিনটি করে নাটবল্টু। দুই লাইনের দুই জয়েন্টে আটটির জায়গায় ছয়টি নাটবল্টু রয়েছে। ফলে পশ্চিম দিক থেকে ব্রিজে অনেকটাই ঝুঁকি নিয়ে উঠছে ট্রেন।
সেই ব্রিজের কাঠগুলো বাতা দিয়ে আটকানো রয়েছে। ব্রিজে ট্রেন উঠলে বিকট শব্দ হয়।
এ বিষয়ে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের ডিভিশনাল এক্সিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার বীরবল মন্ডল বলেন, ফিস প্লেটের নাটবল্টুর সংকট চলছে। ডিমান্ড দেওয়া আছে, পর্যায়ক্রমে আমরা পাচ্ছি। পাওয়া মাত্র আমরা লাগিয়ে দিচ্ছি।
শাহিনুল আশিক/আরএআর