খোলা আকাশের নিচেই ‘সেলুন’, পিঁড়িতে বসে চলে টিকে থাকার লড়াই

উত্তরের সীমান্তঘেঁষা জেলা কুড়িগ্রামের গ্রামগঞ্জের হাট-বাজারে গেলেই চোখে পড়ে এক ভিন্ন দৃশ্য। নেই কোনো আধুনিক সেলুন, নেই ঝকঝকে চেয়ার কিংবা বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি। খোলা আকাশের নিচে, মাটির ওপর ছোট্ট একটি কাঠের পিঁড়ি, পাশে আয়না আর পুরনো ব্যাগে রাখা ক্ষুর-কাঁচি এই সামান্য আয়োজনেই দাঁড়ি-চুল কাটছেন জেলার নরসুন্দররা। প্রকৃতির রোদ-বৃষ্টি-শীত উপেক্ষা করে এভাবেই তারা চালিয়ে নিচ্ছেন জীবন ও জীবিকার সংগ্রাম। অথচ তাদের খোঁজ রাখার যেন কেউ নেই।
জানা গেছে, জেলার ৯টি উপজেলার চর ও গ্রামাঞ্চলের বিভিন্ন হাট-বাজারে প্রায় তিন শতাধিক নরসুন্দর ভ্রাম্যমানভাবে খোলা আকাশের নিচে সেলুন বসিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন। সপ্তাহের নির্দিষ্ট হাটের দিনে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বাজারের কোলাহলের মাঝেই চলে তাদের কর্মযজ্ঞ।
উলিপুর উপজেলার ধরনী বাড়ী এলাকার নর সুন্দর মজিবর রহমান (৬০) বলেন, কয়েক বছর থাকি খোলা আকাশের নিচে পিঁড়িতে দাঁড়ি-চুল কাটার কাজ করছি। বেশি কামাই হয় না। দিনে ৪ থেকে ৫ শত টাকা কামাই হয়। কোনো কোনো দিন ২০০ টাকা। এখন যে যুগ হইছে সবাই বড় বড় দোকানে সেলুনে যায়। তাদের ঠান্ডার সময় ঠান্ডা আর বৃষ্টি ও রোদের সময় কামাই হয় না। আমার পরিবারে স্ত্রী ও বিধবা মেয়ে নাতি-নাতনিসহ ৬ জন। কি করি কোনো রকম সংসার চলছে। যদি অসুখ ধরে তাহলে তো আরও বিপদ। ভোট আইসলে এটা দেব ওটা দেব, ভোট ফুরাইলে কেউ আর খোঁজ-খবর নেয় না। এই যে ঈদ আইসপের লাগছে নতুন কাপড় কিনবের পামো কি না জানি না। ছাওয়া পাওয়ায় তো চায়া আছে নতুন কাপড়ের জন্য। খুব চিন্তায় আছি।
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার যাত্রাপুর হাটে গেলে দেখা যায়, প্রায় ১৫ থেকে ২০ জন নরসুন্দর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসে আছেন। কারও হাতে কাঁচি, কারও হাতে ক্ষুর। পাশে একটি আয়না, ছোট ব্যাগে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, এই সামান্য আয়োজনেই চলছে তাদের সংসারের চাকা।

যাত্রাপুর ইউনিয়নের পোড়ার চর থেকে চুল কাটাতে আসা মো.আমিনুল ইসলাম (৫৫) বলেন, আমরা গরিব মানুষ। সেলুনে গেইলে ৫০-৭০ টাকা লাগে। এখানে ২৫ থেকে ৩০ টাকায় হয়ে যায়। কাজও খারাপ না।
একই ইউনিয়নের গোড়ালের চর থেকে আসা আনিছ মিয়া (৫৪) বলেন, আমাদের চরে তো কোনো সেলুন নাই। আমরা এই হাটে এসে চুল-দাঁড়ি কাটি। টাকাও কম লাগে, কাজও ভালো।
নরসুন্দর কাশেম আলী বলেন, এটি আমার বাপ-দাদার পেশা। অন্য কোনো কাজ শেখার সুযোগ হয় নাই। প্রতিদিন গড়ে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা আয় হয়। এই সামান্য আয় দিয়েই চলে সংসার, সন্তানের পড়াশোনা ও ওষুধের খরচ চালানো মুশকিল হযে যায়। যে দিন কামাই হয় না সেই দিন অনেক কষ্টে দিন যাপন করি।
কুড়িগ্রাম নরসুন্দর সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক নির্মল চন্দ্র বলেন, ঘরভাড়া, বিদ্যুৎ বিলের খরচ না থাকায় তারা কম টাকায় কাজ করতে পারেন। কিন্তু আয় খুব সীমিত। হাটের দিনের ওপর নির্ভর করে আয়-রোজগার। বৃষ্টি বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলে আয় আরও কমে যায়।
আধুনিকতার ছোঁয়ায় যখন শহরের সেলুনগুলো বদলে গেছে, তখনও কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলের এই নরসুন্দররা পড়ে আছেন সময়ের পেছনে। খোলা আকাশের নিচে বসেই তারা ধরে রেখেছেন বংশ পরম্পরার পেশা। কিন্তু তাদের এই সংগ্রামী জীবন যেন অদেখাই থেকে যাচ্ছে—সমাজ ও রাষ্ট্রের চোখের আড়ালে।
মমিনুল ইসলাম বাবু/আরকে