সংরক্ষণাগার ও পরিবহন সংকটে হাতিয়ার সম্ভাবনাময় চেউয়া শুঁটকি শিল্প

নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার বিস্তীর্ণ উপকূলে ধরা পড়ে বিপুল পরিমাণ সামুদ্রিক চেউয়া মাছ। এই মাছ থেকেই বছরে কয়েকশ কোটি টাকার শুঁটকি উৎপাদন করেন স্থানীয় জেলেরা। তবে আধুনিক সংরক্ষণাগারের অভাব, উন্নত শুকানো ও প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধার সংকট এবং সরাসরি বাজারজাতের সুযোগ না থাকায় সম্ভাবনাময় এই খাত থেকে ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন না তারা। ফলে চেউয়া শুঁটকি শিল্পের বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বঞ্চিত থেকে যাচ্ছেন উপকূলের মৎস্যজীবীরা।
জানা গেছে, হাতিয়ার চরাঞ্চলে প্রায় ১০ হাজার একর জমিতে গড়ে উঠেছে শুঁটকি মহল। মূলত সামুদ্রিক চেউয়া মাছের শুঁটকি প্রক্রিয়াজাত করা হয় এসব চরে। এ কাজে প্রায় ২০ হাজার জেলে জড়িত। নদী থেকে মাছ তোলার পর রোদে শুকিয়ে শুঁটকি বানাতে সময় লাগে ৩ থেকে ৪ দিন। প্রতিদিন দেশের বিভিন্নস্থান থেকে আসা পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতারা জড়ো হন এসব শুঁটকি ক্রয় করতে। এসব শুঁটকি যায় ঢাকা, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়। তবে যাতায়াত ব্যবস্থা ভালো না থাকায় লোকসানের মুখে পড়তে হয় জেলেদের।
চেউয়া মাছের প্রাচুর্যে ব্যস্ত সময় পার করছেন জেলে মো. শরীফ হোসেন। মাছ বিক্রির টাকায় মাথা গোজার ঠাই নির্মাণের স্বপ্ন। সাথে রয়েছে জমি ক্রয়, স্কুল-মাদরাসা ও মসজিদ নির্মাণের স্বপ্ন। মো. শরীফ হোসেন ৩ নং ওয়ার্ডের ছায়াবীথি কিল্লা এলাকার মৃত জাফর উল্লাহ ছেলে।
চলতি মৌসুমে নোয়াখালী জেলা-র দ্বীপ উপজেলা হাতিয়া উপজেলা-র বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চল ও প্রত্যন্ত এলাকাজুড়ে চেউয়া শুঁটকির ধুম পড়েছে। নদীতে ঝাঁকে ঝাঁকে ধরা পড়ছে চেউয়া মাছ। এসব মাছ শুকিয়ে শুঁটকি তৈরি করে জেলেরা পাচ্ছেন নতুন আয়ের সুযোগ। ফলে দিন দিন বাড়ছে এর বাণিজ্যিক সম্ভাবনা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ বছর চেউয়া শুঁটকির সম্ভাব্য বাজারমূল্য শতকোটি টাকা ছাড়াতে পারে।

তবে সম্ভাবনার বিপরীতে রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা। সংরক্ষণাগারের অভাব, উন্নত পরিবহনব্যবস্থার ঘাটতি ও আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধা না থাকায় চরাঞ্চলে উৎপাদিত অধিকাংশ চেউয়া শুঁটকি শেষ পর্যন্ত মৎস্য ও পশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। ফলে জেলেরা কাঙ্ক্ষিত ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
ইলিশ ধরার সময় শেষ হলে বাংলা অগ্রহায়ণ মাস থেকে শুরু হয়ে চৈত্রের মাঝামাঝি পর্যন্ত চলে চেউয়া মাছের মৌসুম। স্থানীয়দের দাবি, দেশের মোট চাহিদার অর্ধেকেরও বেশি চেউয়া মাছ আসে এই দ্বীপ থেকে। প্রায় ১০ হাজার মানুষের শ্রমে উৎপাদিত চেউয়া শুঁটকি ঢাকা, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয়। এসব শুঁটকি দিয়ে তৈরি হয় মাছ ও মুরগির খাদ্য (ফিড)।
নিঝুমদ্বীপ ইউনিয়নের জেলে আব্দুল আলী মাঝি বলেন, গত বছর তেমন মাছ পাননি। তবে এ বছর মৌসুমের শুরুতেই ভালো মাছ ধরা পড়ছে। সারাদেশ থেকে পাইকাররা শুটকি কিনতে আসেন। মাছের দাম কম হওয়ায় আমরা শুটকি বিক্রি করে লাভবান হই।
পাইকারি ব্যবসায়ী মো. ইব্রাহিম পার্টি বলেন, নিঝুমদ্বীপ ইউনিয়নের প্রায় ৯০/৯৫ শতাংশ মানুষ জেলে পেশায় জড়িত। গত বছর ইলিশ কম ছিল এবং চেউয়া মাছ পাওয়া যায়নি। এখন চেউয়া শুঁটকির সিজন চলছে। শুরু থেকেই মাছের দেখা মিলছে। উৎপাদন বাড়লে জেলেরা আগের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারবেন। তবে পরিবহন, সংরক্ষণ ও কারখানা না থাকায় জেলেরা ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে না।
নিঝুমদ্বীপ ইউনিয়নের ইউপি সদস্য মো. কেফায়েত হোসেন বলেন, চেউয়া মাছ রান্না করে খেতে যেমন সুস্বাদু শুঁটকি খেতেও তেমন সুস্বাদু। গত বছর ইলিশ কম ছিল। এখন চেউয়া শুঁটকির সিজন চলছে। শুরু থেকেই মাছের দেখা মিলছে। উৎপাদন বাড়লে জেলেরা আগের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারবেন এবং জেলেদের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি ঘটবে।
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন সাইন্স বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, হাতিয়া এলাকার কয়েক লাখ মানুষের খাদ্য পুষ্টি নিরাপত্তায় চেউয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আমরা স্টাডি করে দেখেছি তারা সারাবছর যে পরিমাণ মাছ খায় তার ৩০/৪০ ভাগ চেউয়া। তাদের যে বাজেট অন্য মাছের থেকে দশ ভাগের এক ভাগ টাকা দিয়ে এই মাছ ক্রয় করতে পারে। এই অঞ্চলের মানুষের জীবন জীবিকার সাথে চেউয়া মাছ ওতোপ্রতোভাবে জড়িত। ব্যক্তিগত উন্নয়ন সামাজিক কার্যক্রমে সাথে চেউয়া মাছ জড়িত।
নোয়াখালী জেলা মৎস্য কর্মকর্তা হারুন অর রশিদ বলেন, চেউয়া মাছ নরম প্রকৃতির হওয়ায় এটি বেশিক্ষণ স্টোরেজ করা যায় না। হাতিয়া দুর্গম এলাকা হওয়ায় বেশ সমস্যা হয়। যদি পরিবহন সুবিধা নিশ্চিত করা যায় তাহলে জেলেদের ভাগ্যোন্নয়ন হবে এবং তাদের জীবনযাত্রার মানের পরিবর্তন হবে। আমাদের মৎস্য খাদ্য উৎপাদনে যে ইনিগ্রেরেন্ট বাইরের দেশ হতে আনতে হয় এতে খরচ বেশি পড়ে যায়। যদি দেশের চাহিদা দেশে মেটাতে পারি তাহলে আমরা লাভবান হব।
হাসিব আল আমিন/আরকে