বাঘারপাড়ায় বিএনপির পরাজয়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা চরমে

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পরাজয়ের পর যশোরের বাঘারপাড়ায় বিএনপির রাজনৈতিক উত্তেজনা চরম আকারে ধারণ করেছে। দোষারোপ, মিছিল পাল্টামিছিল, সমাবেশসহ নানা কর্মসূচিতে জনসাধারণ আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। এসব ঘটনায় মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) ১৪৪ ধারা জারি করেছে উপজেলা প্রশাসন। এদিকে প্রথম ধাপে বিএনপি মনোনীত ধানের শীষের প্রার্থী টিএস আইয়ুবের বাড়ির সামনে থেকে তিনটি চকলেট বোমা উদ্ধার করেছে পুলিশ। বোমা সন্দেহে খবর পেয়ে উদ্ধার করার পর সেগুলো ‘চকলেট বোমা’ বলে নিশ্চিত হয় পুলিশ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সোমবার বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল ও ঢাকা দক্ষিণ যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক এবং সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল নূরে আলম সিদ্দিকী সোহাগের বিরুদ্ধে বাঘারপাড়ায় বিক্ষোভ ও ঝাড়ু মিছিল করেন টিএস আইয়ুবের সমর্থকেরা। মিছিলের অগ্রভাগে ছিলেন উপজেলা মহিলা দলের সভাপতি মদিনা খাতুন, সাধারণ সম্পাদক সাইফুন্নেসা, সাংগঠনিক সম্পাদক হোসনেয়ারা ও চায়না বেগম এবং পৌর মহিলা দলের প্রস্তাবিত সভাপতি দিলরুবা বিথি। পেছনের সারিতে নেতৃত্ব দেন উপজেলা কৃষক দলের সভাপতি মশিউল আজম, সাধারণ সম্পাদক মানিক হোসেন, পৌর যুবদলের আহ্বায়ক হিরু আহাম্মেদ ও পৌর স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক লাভলুর রহমানসহ অন্যরা।
বিক্ষোভকারীদের দাবি, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যশোর-৪ আসনকে কেন্দ্র করে ওই দুই আইনজীবী ষড়যন্ত্র করেছেন। এ কারণে টিএস আইয়ুব নির্বাচন করতে পারেননি।
ঋণখেলাপি হওয়ায় টিএস আইয়ুব নির্বাচনে অযোগ্য বিবেচিত হলে পরবর্তীতে সেখানে ধানের শীষের মনোনয়ন পান মতিয়ার রহমান ফারাজী। তবে নির্বাচনে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থীর কাছে পরাজয়বরণ করেন।
এদিকে বিএনপিপন্থী দুই আইনজীবীর বিরুদ্ধে ঝাড়ু মিছিলের প্রতিবাদে মঙ্গলবার কর্মসূচির ডাক দেয় মতিয়ার রহমান ফারাজীর সমর্থেকরা। একই স্থানে ওই দুই আইনজীবীকে বহিষ্কারের দাবিতে কর্মসূচি ঘোষণা করে টিএস আইয়ুবের সমর্থকেরা। ফলে সংঘর্ষের আশঙ্ককায় ওই স্থানে ১৪৪ ধারা জারি করে উপজেলা প্রশাসন। মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) সকাল ৯টা থেকে বিকেল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত এ আদেশ দেওয়া হয়।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ভুপালী সরকার স্বাক্ষরিত আদেশে বলা হয়, বাঘারপাড়া পৌরসভার স্বর্ণপট্টি মোড় থেকে চৌরাস্তাসহ তৎসংলগ্ন এলাকা এবং উপজেলা মোড়সহ আশপাশের এলাকায় সব ধরনের সমাবেশ, বিক্ষোভ মিছিল, গণজমায়েত ও মাইক ব্যবহার নিষিদ্ধ থাকবে। এ বিষয়ে ভুপালী সরকার ঢাকা পোস্টকে বলেন, গোয়েন্দা সূত্রে আমারা জানতে পারি একই স্থানে দুটি পক্ষ সমাবেশ ঘোষণা করেছে। ফলে সেখানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও সহিংসতার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। জননিরাপত্তার স্বার্থে এবং অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পৌর সদরের নির্দিষ্ট এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে।
চকলেট বোমা উদ্ধারের বিষয়ে বাঘারপাড়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আমিরুল ইসলাম ঢাকা পোস্টকে বলেন, বিএনপি নেতা টিএস আইয়ুবের বাড়ির সামনে অবিষ্ফারিত অবস্থায় বোমা পড়ে রয়েছে- এমন সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশ সেখানে যায়। পরে তিনটি বোমাসদৃশ্য বস্তু উদ্ধার করে সেগুলো ‘চকলেট বোমা’ বলে নিশ্চিত হয় পুলিশ।
সম্প্রতি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে আসনটিতে দলীয় মনোনয়ন পান টিএস আইয়ুব। কিন্তু নির্বাচন কমিশন ঋণখেলাপির দায়ে টিএস আইয়ুবের মনোনয়ন বাতিল করলে; দল মনোনয়ন পরিবর্তন করে দেন অভয়নগর উপজেলা বিএনপির সভাপতি মতিয়ার রহমান ফারাজীকে। নির্বাচনে বিএনপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে মতিয়ার ফারাজী জামায়াতের প্রার্থীর কাছে পরাজিত হন। আইয়ুব পক্ষের ভাষ্য, টিএস আইয়ুবকে ঋণখেলাপিতে মনোনয়ন বাতিল করতে নেপথ্যের কারিগর ছিলেন ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল ও অ্যাডভোকেট নূরে আলম সিদ্দিকী সোহাগ। ফলে ক্ষুব্ধ হয়ে টিএস আইয়ুবের অনুসারীরা ঝাড়ু মিছিল করে দলীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা ও বহিষ্কারের দাবি জানিয়েছেন।
তৃণমূলের নেতাকর্মীরা বলছেন, শীর্ষনেতাদের দলীয় বিভেদ গ্রুপিংয়ে নির্বাচনে ভরাডুবির পরে প্রকাশ্যে কেন্দ্রীয় নেতাদের বিরুদ্ধে ঝাড়ু মিছিলে চাঙ্গা হলো উপজেলা বিএনপির গ্রুপিং।
এই বিষয়ে নূরে আলম সিদ্দিকী সোহাগ বলেন, আমাদের নিয়ে অবমাননাকর মিছিল করিয়েছে টি এস আইয়ুব। টিএস আইয়ুব ঢাকা ব্যাংকের কাছে ঋণ খেলাপির তালিকায় থাকায় তার মনোনয়ন বাতিল হয়। সেই মামলায় ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল ঢাকা ব্যাংকের হয়ে লড়েছেন। আর আমার অপরাধ আমি কাজলের সহকারী আইনজীবী ও আসনটির মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলাম।
নেতাকর্মীরা জানান, বাঘারপাড়া উপজেলা বিএনপি দুটি গ্রুপে বিভক্ত। একটির পক্ষের নেতৃত্ব দেন কৃষক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার টিএস আইয়ুব ও অন্যটি পৌর বিএনপির সভাপতি আব্দুল হাই মনা।
এই বিষয়ে টিএস আইয়ুবের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
রেজওয়ান বাপ্পী/এমএএস