ঠাকুরগাঁওয়ের সেই পিআইওর বিরুদ্ধে দেওয়া অভিযোগ আমলে নেয়নি পুলিশ

ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলায় জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটকেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা ক্রয় ও স্থাপন প্রকল্প-সংক্রান্ত তথ্য এবং ডাকবাংলোর বকেয়া বিল চাওয়াকে কেন্দ্র করে চার সাংবাদিক ও ডাকবাংলোর কেয়ারটেকারসহ মোট ছয়জনের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মামলা করেছেন উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. নুরুন্নবী সরকার।
তবে মামলার তিন দিন পর এক ইউপি সদস্যকে প্রকাশ্যে ‘সাড়ে তিন হাত মাটির নিচে পুঁতে ফেলার’ হুমকি দেওয়ার অভিযোগে ওই পিআইওর বিরুদ্ধেই থানায় লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে। সাংবাদিকের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে গ্রহণ করলেও পিআইওর বিরুদ্ধে দেওয়া অভিযোগ দুই দিনেও মামলা হিসেবে নথিভুক্ত হয়নি এমন অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে।
গত মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) রাণীশংকৈল থানায় বাদী হয়ে সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলাটি করেন মো. নুরুন্নবী সরকার। তিনি কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার কৃষ্ণপুর এলাকার মৃত খবির উদ্দিন সরকারের ছেলে এবং বর্তমানে রাণীশংকৈল উপজেলার পিআইও হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। মামলার এজাহারে তিনি উল্লেখ করেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তার নির্দেশে তিনি আইনগত ব্যবস্থা নিয়েছেন।
মামলার আসামিরা হলেন, ভন্ডগ্রামের আব্দুল রহিমের ছেলে ও মোহনা টেলিভিশনের উপজেলা প্রতিনিধি মো. ফারুক আহমদ (৫১), ভাংবাড়ী গ্রামের বাসিন্দা ও অনলাইন এনটিভির উপজেলা প্রতিনিধি মো. রফিকুল ইসলাম সুজন (৩০), বাজেবকসা এলাকার নুরুল বকসের ছেলে মো. পেয়ার আলী (৪৫), নয়নপুর গ্রামের মৃত আব্দুল হামিদের ছেলে আব্দুল জব্বার (৩৫), একই এলাকার নজরুল ইসলামের ছেলে আনারুল ইসলাম (৫২) এবং ভান্ডারা গ্রামের খাদেম আলীর ছেলে ও ডাকবাংলোর কর্মচারী বেলাল উদ্দিন (৩০)। এছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও সাতজনকে আসামি করা হয়েছে।
এজাহারে পিআইও উল্লেখ্য করেন, আসামিদের সঙ্গে তার চাকরিসংক্রান্ত বিষয় নিয়ে পূর্ব থেকেই মনোমালিন্য ছিল। গত ৩ ফেব্রুয়ারি বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে উপজেলা পরিষদ কমপ্লেক্সের চতুর্থ তলায় তার কার্যালয়ে গিয়ে আসামিরা জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপন প্রকল্পের তালিকা চান এবং বরাদ্দ অনুযায়ী এক লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। টাকা না পেয়ে তাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করা হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
এছাড়া, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে বিতর্কিত করার পাঁয়তারায় ৫ ফেব্রুয়ারি সকালে আসামিরা ক্যামেরা নিয়ে একদল আদিবাসী নারীকে প্রলোভন দেখিয়ে তার বিরুদ্ধে মানববন্ধন করান বলে তিনি এজাহারে উল্লেখ করেন। এতে তার মান-সম্মান ক্ষুণ্ন হয়েছে বলে দাবি করেন।
এজাহারে আরও বলা হয়, আনারুল ইসলাম মানববন্ধনে উস্কানিমূলক বক্তব্য দিয়ে ‘মব-সন্ত্রাস’ সৃষ্টির চেষ্টা করেন এবং বেলাল উদ্দিন উসকানি দিয়ে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চেষ্টা করেন। বিষয়টি ইউএনও ও জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তাকে জানালে তারা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন বলে উল্লেখ করেন পিআইও।
অন্যদিকে, মামলার তিন দিন পর প্রকল্পের ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে বিরোধের জেরে দিনে-দুপুরে এক ইউপি সদস্যকে ‘সাড়ে তিন হাত মাটির নিচে পুঁতে ফেলার’ হুমকি দেন পিআইও এমন একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওটি ভাইরাল হলে জেলাজুড়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। এ ঘটনায় বাচোর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মো. আক্কাশ আলী শনিবার রাতে রাণীশংকৈল থানায় পিআইওর বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দেন। কিন্তু ঘটনার দুই দিন পেরিয়ে গেলেও থানা পুলিশ পিআইও'র বিরুদ্ধে মামলা গ্রহণ করেননি।
ভুক্তভোগী সাংবাদিক রফিকুল ইসলাম সুজন ও ফারুক আহমদ অভিযোগ করে বলেন, পিআইওর বিরুদ্ধে স্থানীয় বাসিন্দাদের মানববন্ধন ও বিক্ষোভের খবর সংগ্রহ ও প্রকাশ করার জেরেই তিনি তাদের টার্গেট করেন। সংবাদ প্রকাশের পর থেকেই তিনি ক্ষুব্ধ ছিলেন এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মিথ্যা চাঁদাবাজির মামলা করেন। তারা সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে মামলা প্রত্যাহার ও প্রকৃত ঘটনার বিচার দাবি করেন।
ডাকবাংলোর কর্মচারী বেলাল উদ্দিন বলেন, ডাকবাংলোর দীর্ঘদিনের বকেয়া বিল পরিশোধের বিষয়ে আমি কথা বলেছিলাম। সেটিকেই ভিন্নভাবে উপস্থাপন করে আমার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ আনা হয়েছে, যা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। আমি নিরপেক্ষ তদন্ত চাই।
এ বিষয়ে পিআইও মো. নুরুন্নবী সরকারের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগ ওঠার পর থেকে তিনি নিয়মিত অফিস করছেন না এবং ফোনও ধরছেন না।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. জিয়াউর রহমান বলেন, ঘটনাটি আমাদের নজরে এসেছে। লিখিতভাবে ব্যাখ্যা চাওয়া হবে। তদন্তে সত্যতা পাওয়া গেলে বিভাগীয় বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রাণীশংকৈল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খাদিজা বেগম বলেন, সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ গুরুতর। বিষয়টি যাচাই করা হচ্ছে। প্রমাণিত হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রাণীশংকৈল থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমানুল্লাহ আল বারি বলেন, ভুক্তভোগীর পক্ষ থেকে একটি লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগটি তদন্তাধীন রয়েছে। তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আর সাংবাদিকদের মামলার বিষয়ে কথা বললে তিনি এড়িয়ে যান।
রেদওয়ান মিলন/এমএএস