ছাড়েও কক্সবাজারে স্থবির পর্যটন, কর্মহীন হাজারো হোটেল কর্মী

বসন্ত শুরুর পরপরই এবার এক অন্যরকম ফেব্রুয়ারি মাস পেয়েছে পর্যটন নগরী কক্সবাজার। শীতের শেষ দিকে ব্যাপক পর্যটক আসলেও বর্তমানে লোক সমাগম নেই বললে চলে। পবিত্র রমজান উপলক্ষ্যে হোটেল-মোটেলগুলোতে সর্বোচ্চ ৭০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দিতে দেখা গেছে, কিন্তু ছাড় থাকার পরও এসময়েও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই গ্রাহকের অভাবে ফাঁকা আছে।
১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের দুইদিন আগে থেকেই পর্যটকদের ভিড় কমতে শুরু করে, ১৯ ফেব্রুয়ারি রমজান শুরু হওয়ায় সে সংখ্যা প্রায় ১-৩ শতাংশে নেমে আসে। পর্যটন ব্যবসা সংশ্লিষ্টরা অলস সময় পার করছেন।
শহরের কলাতলী ঝিনুক মার্কেট, শুটকি মার্কেটসহ পর্যটকদের আকর্ষণ করে এমন অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দিনের বেলায় বন্ধ থাকছে। স্থবিরতার কারণে বিপাকে পড়েছেন কিটকট, কফি-চা বিক্রেতাসহ সমুদ্রপাড়ের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা।
ছুটির দিন হলেও শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় দেখা যায় সৈকতের সুগন্ধা পয়েন্টের বালিয়াড়িতে বসানো পর্যটকদের সমুদ্র উপভোগের চেয়ার তথা কিটকটগুলোর অধিকাংশই শূন্য। কিটকট দেখাশোনায় নিয়োজিত কর্মী আব্দুল্লাহ বলেন, কয়েকদিন ধরে মানুষ নেই। সিজনে কিটকটগুলো পরিপূর্ণ থাকে, দৈনিক ৭ থেকে ১০ হাজার ব্যবসা হতো অথচ এখন ৫০০ টাকাও হচ্ছে না।
কক্সবাজারের হোটেল ব্যবসায় সংকট, কর্মহীন হাজারো কর্মী
কলাতলী মোড়ের একটি চার তারকা হোটেলে রুমসার্ভিস কর্মী হিসেবে চাকরি করেন মোহাম্মদ রিয়াজ। এই মাসে তাকে নামমাত্র মাসিক বেতন দিয়ে ছুটি দেওয়া হয়েছে, কর্ম না থাকায় মিলছে না সার্ভিস চার্জ। ফলে চাহিদা মোতাবেক আয় না করায় পরিবারের ভরণপোষণ নিয়ে আছেন দুশ্চিন্তায়।
তিনি বলেন, রমজানে কাজ নেই, সার্ভিস চার্জও পাব না এ মাসে। বেতনে পোষায় না, আর বোনাস দেবে বলেছে, তবে সেটা অনিশ্চিত। জানি না চার সদস্যের পরিবার নিয়ে ঈদ কিভাবে কাটাবো, আমাদের ঈদ, আসলে ঈদের পরেই আসে।
ছুটির কারণে শহর থেকে ২৫ কিলোমিটার অদুরে উখিয়া উপজেলার কোটবাজারে নিজগ্রামে অবস্থান করছেন আরেক হোটেল কর্মচারী ইমরান হোসেন। তিনি বলেন, গ্রামে বাবার কৃষিজমি আছে, সেগুলো এই সময়ে দেখভাল করছি, সিজন শুরু হলে আবার পর্যটকদের সেবা দিতে চলে যেতে হবে।
মেরিনড্রাইভ সড়কের পার্শ্ববর্তী রিসোর্টের বাণিজ্যিক উন্নয়ন কর্মকর্তা শাহাব উদ্দিন আহমেদ বলেন, আমাদের রিসোর্টের জনবলসংখ্যা স্থায়ী-অস্থায়ী মিলিয়ে ৪২ জন। অস্থায়ী অনেকেই এখন রমজানের ছুটিতে আছেন, তাদেরকে কিছু টাকা অগ্রিম বেতন দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও ঈদে উৎসব ভাতাও দেওয়া হবে।
সুগন্ধা পয়েন্ট লাগোয়া একটি হোটেলের ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ বেলাল বলেন, আমাদের হোটেলে সি-ভিউ রয়েছে, যা পর্যটকদের টানে। সমুদ্রের কাছে হওয়ায় ভাড়া তুলনামুলকভাবে বেশি কিন্তু এখন অফ সিজনে আমরা অর্ধেকের চাইতেও কম দামে রুম দিচ্ছি। তারপরেও প্রতিদিন অসংখ্য রুম খালি থাকছে।
কক্সবাজার হোটেল মোটেল মালিক ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার বলেন, বর্তমানে পর্যটন মৌসুমের সময় নয়, ফলে শহরের ৫ শতাধিক হোটেলের অধিকাংশ কর্মীই ছুটিতে আছেন। সীমিত জনবল নিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো চালু আছে, ঈদের সময় বাকিরা কাজে ফিরবেন। এই সুযোগে আসলে হোটেলের রিপিয়ারিং, রঙ করানোসহ অন্যান্য রক্ষণাবেক্ষণের কাজ চলে।
সৈকতে নজর কাড়ছে মাছ ধরার ট্রলার, প্রাণ পেয়েছে প্রকৃতি, বেড়েছে সাগরলতা
বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরতে যাওয়া কিছু ট্রলার রয়েছে বালিয়াড়িতে, রঙ্গিন করে সাজানো এই ট্রলারগুলো নজর কাড়ছে। বালিয়াড়িতে বৃদ্ধি পেয়েছে সাগরলতা, যেগুলো সৈকতের ক্ষয়রোধ এবং শুকনো উড়ন্ত বালুরাশিকে আটকে রাখতে ভূমিকা রাখে।
মানুষের আনাগোনা না থাকায় বালিয়াড়ির নান্দনিকতা বাড়িয়েছে 'রেলরোড ভাইন’ নামে পরিচিত এই উদ্ভিদ। পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, সাগরলতা সৈকতের সুস্থতার পরিচায়ক। এগুলো বালুকে ধরে রেখে বালিয়াড়ি সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখে। তাই এই উদ্ভিদকে সৈকতের বাস্তুতন্ত্রের অগ্রপথিকও বলা হয়।
দূর-দুরান্তের আগুন্তকরা তেমন না এলেও স্থানীয় কিছু মানুষ নিয়ম করে প্রাতঃরাশে বালুকাবেলায় ভ্রমণে আসেন। তাদের মতোই একজন বেসরকারি সংস্থার (এনজিও) কর্মকর্তা মোহাম্মদ মহসিন বলেন, সাগরের গর্জন শুনেই আমার বেড়ে ওঠা, শহরের বাহারছড়ায় জন্ম। প্রায় প্রতিদিনই এখানে হাঁটি সাগরলতাগুলো আমাকে মুগ্ধ করে। শৈশবে দেখেছি, সাগরলতায় বিস্তীর্ণ ছিল পুরো সৈকতের উপরিভাগ, এখন তেমন একটা চোখে পড়ে না। তবে অফসিজনে এগুলো ঠিকই সৌন্দর্য বাড়ায়।
এদিকে, পর্যটন ব্যবসা সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ঈদের দ্বিতীয় দিন থেকেই ফের পর্যটক সংখ্যা বাড়বে এবং নতুন মৌসুম শুরু হবে। পাশাপাশি স্থানীয়রা বলছেন, পর্যটন শিল্পের স্বার্থে আধুনিকায়নসহ সৈকতের প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষায় যুগোপযোগী পদক্ষেপ নেওয়ার বিকল্প নেই যাতে করে বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘ এই সমুদ্র সৈকতের স্বকীয়তা বজায় থাকে।
ইফতিয়াজ নুর নিশান/এসএইচএ