কাজ বেশি মজুরি কম, বৈষম্যের শিকার নারীরা

দুপুর ১২টা। সূর্য মাথার ওপরে। সূর্যের তাপে শরীরে ঘামও ঝরছে। ষড়ঋতুর বাংলায় ঋতুরাজ বসন্ত বইলেও রোদের প্রখরতায় খোলা আকাশের নিচে ক্ষেতে কাজ করা মানুষগুলো ক্লান্তির তোয়াক্কা না করে কর্মে মনোযোগী। শনিবার (৭ মার্চ) যশোরের ঝিকরগাছার পানিসারা মাঠে একদল শ্রমিককে ক্ষেতে কাজ করতে দেখা যায়। দলে দুই নারী ও একজন পুরুষ রয়েছেন। তারা রজনীগন্ধা ফুল ক্ষেতের আগাছা পরিষ্কার করছেন।
তাদের এ দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করতেই ছায়রা খাতুন (৪৫) নামে এক নারী শ্রমিক বলে উঠলেন, ‘ওগো ছবি তুলো না। আমাদের ছবি তুলে কী হবে? আমরা মাঠে কাজ করি। সরকার কী আমাদের কিছু দেবে। নাকি আমাদের জোনের (মজুরি) দাম বাড়বে।’ এর পর মাথার ওপরের শাড়িটা আরও একটু টেনে মুখ ঢেকে দেন।
৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। ‘আজকের পদক্ষেপ আগামীর ন্যায়বিচার, সুরক্ষিত হোক নারী ও কন্যার অধিকার’ এই স্লোগানে এবার নারী দিবস পালিত হচ্ছে। একবিংশ শতাব্দীর এ দিবসে নারী-পুরুষের বৈষম্য কতটা দূর হলো তা জানতে এই প্রতিবেদক গিয়েছিলেন পানিসারা মাঠে। কিন্তু সেই হতাশা ও আক্ষেপের কথা শোনা গেল নারী শ্রমিকদের মুখে।
নারী শ্রমিকরা জানান, একসঙ্গে কাজ করা নারীরা সবাই সীমাহীন দরিদ্র ও অসহায়। ছায়রা খাতুন (৪৫) প্রায় ৯-১০ বছর ধরে কৃষিতে নারী শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন। স্বামীও কৃষি শ্রমিক। এতিম দুই নাতনিকে লালন-পালনে সম্বলহীন তারা। স্বামী-স্ত্রী ক্ষেত-খামারে শ্রমিকের কাজ করেন।
এসব নারী শ্রমিকেরা কৃষিকাজে খুবই পারদর্শী। সকাল ৬টা থেকে টানা দুপুর ১টা পর্যন্ত ক্ষেত-খামারে কাজ করেন। মজুরি হিসেবে পান মাত্র ৩০০ টাকা করে। অথচ পুরুষ শ্রমিকেরা এক ঘণ্টা পরে কাজ শুরু করলেও তারা মজুরি পান ৪০০ টাকা।
পানিসারা গ্রামের ৫৭ বছর বয়সী আলিমন খাতুন বলেন, পুরুষদের চেয়ে আমরা বেশি কাজ করি, অথচ জোনের (মজুরি) টাকা আমাদের কম করে দেওয়া হয়।
বেশ কিছু নারী শ্রমিক ঝিকরগাছার পানিসারা গ্রামের (ছোট পানিসারা) বাসিন্দা। তারা সবাই যে কোনো কৃষি কাজের পাশাপাশি ফুল চাষের সকল কাজে পারদর্শী। নারী শ্রমিকদের মধ্যে নাছিমা খাতুন (৪৬), ছপুরা বিবি (৪৪) রয়েছেন।
রজনীগন্ধা ফুল ক্ষেতে তাদের সঙ্গে কাজ করা পুরুষ শ্রমিক আলাউদ্দিন বলেন, আমরা পুরুষ শ্রমিক ৪০০ টাকা করে পাই। আর নারীরা পান ৩০০ টাকা করে।
স্থানীয় নারী উদ্যোক্তা নাসরিন নাহার আশা বলেন, পুরুষ শ্রমিককে চারশ, আর নারী শ্রমিককে তিনশ টাকা দেওয়া হয়। অথচ, পুরুষের চেয়ে নারী শ্রমিক কাজ বেশি করেন। নারীরা কাজে বিশ্রাম নেন না। তাছাড়া ফুলের কাজে নারী শ্রমিকরা বেশি পারদর্শী।
বিশেষ করে ফুলের রাজধানীখ্যাত গদখালী ও পানিসারা এলাকায়ও পুরুষের মতো নারী শ্রমিকও রয়েছে। তবে সেখানেও নারী শ্রমিক মজুরি বৈষম্যের স্বীকার হচ্ছেন।
উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা অনিতা মল্লিক বলেন, কর্মক্ষেত্রে নারীরা এখনো বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। সব ক্ষেত্রে বৈষম্য দূর না করলে সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব না। সরকার নারী-পুরুষের বৈষম্য দূর করতে কাজ করছে।
রেজওয়ান বাপ্পী/আরএআর