বিজ্ঞাপন

মেঘনার ভাঙন প্রতিরোধে ৮শ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হচ্ছে বাঁধ

মেঘনার ভাঙন প্রতিরোধে ৮শ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হচ্ছে বাঁধ

মেঘনা নদীর ভাঙন থেকে চাঁদপুর শহর রক্ষায় আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নেওয়া হয়েছিল সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকার একটি মেগা প্রকল্প। তবে অর্থ সংকটে সেই উদ্যোগ থমকে যায়। পরে ২০২৪ সালের শুরুতে শহর সংরক্ষণ প্রকল্পের জন্য ৮১৫ কোটি ৬৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। বর্তমানে ৩ দশমিক ২২৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের বাঁধ নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে।

ভাঙনকবলিত এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দাবি, দুর্নীতির আশ্রয় না নিয়ে সরকারের নিয়োগকৃত সংস্থা যেন নির্মাণকাজ সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করে। এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী জানিয়েছেন, ২০২৭ সালের মধ্যে প্রকল্পের শতভাগ কাজ সম্পন্ন করার লক্ষ্য রয়েছে।

জানা গেছে, চাঁদপুর শহর রক্ষা বাঁধের অতিঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হচ্ছে পদ্মা-মেঘনা ও ডাকাতিয়া নদীর মোহনা বড় স্টেশন মোলহেড এবং পুরাণ বাজার বাণিজ্যিক এলাকা থেকে হরিসভা পর্যন্ত। এসব এলাকায় প্রায় প্রতিবছর বর্ষা মৌসুম এবং পানি কমে গেলে বাঁধে ভাঙন ও ফাঁটল দেখা দেয়। এমন পরিস্থিতি থেকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য হলেও একটি শক্তিশালী বাঁধ নির্মাণের দাবী ভুক্তভোগদের।

হরিসভা এলাকার বাসিন্দা সবিতা রানী (৬৫) বলেন, আমি নিজেই এই এলাকায় ৩ বার মেঘনার ভাঙন দেখেছি। সবকিছু হারিয়ে এখন রাস্তার পাশে ছিন্নমূল হিসেবে বসবাস করছেন। বাঁধ যেন সঠিকভাবে দেয়া হয় এবং কাজে যেন দুর্নীতি না করা হয় সরকারের কাছে তিনি দাবী জানান।

পাশের আরেক বাসিন্দা মর্জিনা বেগম বলেন, বর্ষা আসলেই ভাঙন শুরু হয়। তখন কিছুটা সংস্কার হলেও ভাঙনের ভয়ে আমরা রাতে ঘুমাতে পারি না। এখন বাঁধের কাজ সম্পন্ন হলে এলাকার মানুষের মাথাগোজার ঠাঁই হবে।

পুরান বাজার এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান বলেন, প্রায় ৩০ বছর পূর্ব থেকে এই এলাকায় মেঘনার ভাঙন শুরু হয়। কয়েক কিলোমিটার পশ্চিমে আমাদের বসতি ছিল। এখন ব্লকের কাজ সঠিকভাবে সম্পন্ন হলে হয়তো বসবাসের সম্ভাবনা তৈরি হবে।

ভাঙনের শিকার হয়ে বেশ কয়েকটি পরিবার ছিন্নমূল। এর মধ্যে প্রায় ৭০ বছর বয়সী ভুলু ঋষির সাথে কথা হয়। তিনি বলেন, ভাঙনে আমি সব হারিয়েছি। সামর্থ্য নেই কোথাও জমি কিনে বাড়ি করব। যে কারণে সড়কের পাশে বসবাস করছি। ভাঙন প্রতিরোধে কাজ শুরু হয়েছে। সরকারের প্রয়োজনে এখান থেকে সরে অন্য জায়গায় চলে যেতে হবে। তবে ছিন্নমূলদের জন্য আবাসনের ব্যবস্থা করা দরকার বলে আমি মনে করি।

শহর সংরক্ষণ প্রকল্পে ১৯টি প্যাকেজে কাজ চলমান। জিও টেক্সটাইল ব্যাগ ডাম্পিং করার পর এখন চলছে ব্লক ডাম্পিং এর কাজ। আর এই ব্লক তৈরিতে সনাতন পদ্ধতির পাশাপাশি এবার আধুনিক পদ্ধতি তৈরি হচ্ছে ব্লক। প্রকল্পের পুরান বাজার জাফরাবাদ নদীর পাড়ে অটোমেটিক মেশিনে তৈরী হচ্ছে ব্লক।

ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান মেসার্স এসকে এমদাদুল হক আল মামুন এর সহকারী প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী সুদীপ্ত গুন বলেন, শহর সংরক্ষণ প্রকল্পের অনেকগুলো প্যাকেজে কাজ হচ্ছে। এর মধ্যে অনেকেই সনাতনী পদ্ধতিতে ব্লক তৈরি করছেন। কিন্তু আমরা এই প্রথম বিদেশ থেকে আমদানিকৃত অটোমেটিক মেশিনে ব্লক তৈরি করছি। এতে খুবই নিখুঁতভাবে ব্লক তৈরি হচ্ছে এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের চাহিদাও পূরণ হচ্ছে। আমাদের পাশাপাশি এই কাজের তত্ত্বাবধান করছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলীরা।

পানি উন্নয়ন বোর্ড চাঁদপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জহুরুল হক বলেন, শহর সংরক্ষণ প্রকল্পটি চাঁদপুরের মানুষের জন্য অনেক প্রত্যাশিত। ২০২৪ সালের জুন মাসে আমরা এই কাজ শুরু করেছি। ইতোমধ্যে জিও ব্যাগ ডাম্পিং শেষে ব্লক ডাম্পিং চলছে। কাজের প্রায় ২৫ ভাগ শেষ হয়েছে। আশা করি ব্লক প্লেসিংয়ের মাধ্যমে ২০২৭ সালের মধ্যে শতভাগ কাজ সম্পন্ন হবে। প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে এলাকার ৫ হাজার কোটি টাকার সম্পদ রক্ষা হবে। কাজের বিষয়ে জেলা প্রশাসনসহ অংশীজনদের নিয়ে নিয়মিত সমন্বয় করা হয়।

বাঁধের পাশের ছিন্নমূল পরিবার সম্পর্কে তিনি বলেন, আমরা কাজ করতে গিয়ে পুরান বাজার কিছু পরিবারকে বাঁধের ওপর বসবাস করতে দেখেছি। তারা না থাকলে কাজটি সুন্দরভাবে করা সম্ভব হবে। আমরা উচ্ছেদ করলেও এটি জেলা প্রশাসকের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেব।

আনোয়ারুল হক/আরকে

বিজ্ঞাপন