বগুড়ায় ৫ বছরে মরিচের আবাদ কমল ১ হাজার হেক্টর

গত পাঁচ বছরে বগুড়ায় প্রায় এক হাজার হেক্টর জমিতে কমেছে মরিচের চাষ। একই সঙ্গে কমেছে দেশি জাতের আবাদ এবং শুকনো মরিচ তৈরির প্রবণতাও। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং বাজারে কাঁচা মরিচের ভালো দামের কারণে কৃষকেরা ঝুঁকি এড়িয়ে বিকল্প পথে হাঁটছেন। কৃষক ও কৃষি বিভাগের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, বগুড়া জেলা কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে জেলায় ৬৫০০ হেক্টর জমিতে মরিচ চাষ হয়েছিল। ২০২১-২২ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ৬৪৫০ হেক্টরে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৬১৫০ হেক্টর, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৬০৯০ হেক্টর এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৫৯৩৮ হেক্টরে নেমে আসে আবাদ। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ পর্যন্ত আবাদ হয়েছে ৫৪০০ হেক্টর জমিতে। গত পাঁচ বছরে বগুড়ায় প্রায় এক হাজার হেক্টর জমিতে কমেছে মরিচের চাষ।
দেশি জাতের আবাদও একইভাবে কমেছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে যেখানে দেশি জাতের আবাদ ছিল ২১০০ হেক্টর, চলতি অর্থবছরে তা নেমে এসেছে ১৭৩০ হেক্টরে। জেলায় সবচেয়ে বেশি মরিচ চাষ হয় সারিয়াকান্দি উপজেলায়। চলতি বছরে মোট আবাদ হওয়া জমির মধ্যে প্রায় ২৬০০ হেক্টরই এ উপজেলায়। এরপর রয়েছে সোনাতলা ও ধুনট উপজেলা।
সম্প্রতি বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার কালিতলা গ্রোয়েন বাঁধ, প্রেম যমুনার ঘাটসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, লাল মরিচ শুকানোর কাজে ব্যস্ত রয়েছেন কয়েকজন স্থানীয় নারী ও পুরুষ। কথা হয় স্বপ্না খাতুনের সঙ্গে। তিনি বলেন, মরিচ কেবল শুকাতে দেওয়ার কাজ শুরু হয়েছে। তবে এই সময়েও এর পরিমাণ আরও বেশি থাকত। মানুষ এখন আর আগের মতো মরিচ শুকাতে চায় না। দাম ভালো থাকায় কাঁচা অবস্থাতেই বাজারে বিক্রি করে দেয়।
সারিয়াকান্দির বাটির চরের কৃষক মোখলেছুর রহমান বলেন, আগে আট বিঘা জমিতে মরিচ চাষ করতাম। এখন নদীভাঙনে জমি কমেছে। আবার গরম ও বৃষ্টির কারণে ফলন ঠিকমতো হয় না। ঝুঁকি বেশি, খরচও বেশি। তিনি জানান, এক বিঘা জমিতে মরিচ চাষ করতে বীজ বোনা থেকে ফসল তোলা পর্যন্ত প্রায় ৩৫ হাজার টাকা খরচ হয়। কিন্তু আবহাওয়ার কারণে ফলন কমে গেলে সেই খরচ ওঠানোই কঠিন হয়ে পড়ে।
চর বাটিয়া গ্রামের কৃষক শাহিনুল ইসলাম বলেন, গত কয়েক বছরে কখনও অতিরিক্ত তাপ, কখনও অসময়ের বৃষ্টি হয়েছে। এতে ক্ষেত নষ্ট হয়েছে। এদিকে উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে। যেমন সার, কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরি বেড়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকবে কিনা এই অনিশ্চয়তার কারণে অনেকে মরিচের চাষ করছেন না। তিনি বলেন, এখন কাঁচা মরিচ ৪ থেকে ৬ হাজার টাকা মণ বিক্রি হচ্ছে। শুকনো করে ১১-১২ হাজার টাকা মিললেও খরচ, শুকানো এবং ঝুঁকি হিসাব করলে লাভ তেমন থাকে না।
ধুনট উপজেলার বেড়ের বাড়ি এলাকার কৃষক আবু সাঈদ বলেন, নিচু জমিতে পানি জমে থাকায় এবার মরিচের বদলে ভুট্টা চাষ করেছেন। ভুট্টায় খরচ কম, ঝুঁকিও কম। জমিতে সময়ও কম দিতে হয়।
বগুড়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপসহকারী পরিচালক ফরিদুল ইসলাম বলেন, চলতি মৌসুমে শুকনো মরিচের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৭ হাজার ৯৩৬ মেট্রিক টন। বর্তমানে মরিচ জমি থেকে তোলা হচ্ছে শুকানোর জন্য। তাই এই মুহূর্তে উৎপাদনের চূড়ান্ত হিসাব বলা যাচ্ছে না। তবে মৌসুম শেষে কাঁচা মরিচও শুকনো মরিচে রূপান্তর করা হবে। এতে লক্ষ্যমাত্রার কাছাকাছি যাওয়া সম্ভব হবে। তিনি বলেন, গত মৌসুমে শুকনো মরিচের উৎপাদন ছিল ১৭ হাজার ২৬৮ মেট্রিক টন।
বগুড়া জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সোহেল মো. শামসুদ্দিন ফিরোজ বলেন, কৃষক স্বাভাবিকভাবেই যে ফসলে লাভ বেশি দেখবেন, সেদিকেই ঝুঁকবেন। আবহাওয়া ও উৎপাদন ব্যয়ের কারণে মরিচের আবাদ কিছুটা কমেছে। তবে ফলন বৃদ্ধিতে কৃষকদের বিভিন্ন পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
আব্দুল মোমিন/এসএইচএ