ঈদে ঘুরতে যেতে পারেন ইতিহাস-ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ ফেনী

ব্যস্ত জীবনের ফাঁকে ঈদের ছুটি যেন একটুখানি স্বস্তির নিঃশ্বাস। সেই স্বস্তি খুঁজে নিতে কাছেই আছে ইতিহাস, ঐতিহ্য আর সবুজের এক অনন্য মেলবন্ধন ফেনী জেলা। যেখানে একইসঙ্গে পাওয়া যাবে সবুজ, নদী আর শত বছরের গল্প। শহরের কোলাহল ছেড়ে একটু প্রশান্তির খোঁজে এ জনপদ হতে পারে স্বল্প খরচে বৈচিত্র্যময় অনন্য ভ্রমণ গন্তব্য।
বিজ্ঞাপন
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কোল ঘেষে সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা নিয়ে গড়ে ওঠা দেশের 'নাভি' খ্যাত ফেনী জেলার আয়তন ৯২৮ দশমিক ৩৪ বর্গ কিলোমিটার। কবি নবীন চন্দ্র সেন, নাট্যকার সেলিম আল দীন, চলচিত্রকার জহির রায়হান, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন, ভাষা শহীদ আব্দুস সালাম, শহীদ শহিদুল্লা কায়সারসহ দেশের বহু খ্যাতিমান ব্যক্তিত্বের স্মৃতিচিহ্নের এ জনপদ দাঁড়িয়ে আছে পর্যটকদের অপেক্ষায়।।
রাজনন্দিনীর দিঘি
রাজনন্দিনীর দিঘি বা রাজাঝির দিঘি। ফেনী শহরের প্রাণকেন্দ্র ট্রাংক রোডের পাশে ১০ দশমিক ৩২ একর আয়তনের এ দিঘির অবস্থান। এ যেন শহরের বুকে এক টুকরো প্রশান্তি। ১৮৭৫ সালে ফেনী মহকুমা প্রতিষ্ঠিত হলে সদর দপ্তর গড়ে তোলা হয় রাজাঝির দিঘির পাড়ে । জনশ্রুতি রয়েছে ত্রিপুরার কোনো এক প্রভাবশালী রাজা স্বপ্নযোগে আভাস পেয়েছিলেন দিঘিটি খনন করলে তার কন্যার চোখে আলো ফিরবে।
বিজ্ঞাপন

ধারণা করা হয়ে থাকে এটি ৬০০ থেকে ৭০০ বছর পুরনো। স্থানীয়ভাষায় কন্যা-কে 'ঝি' বলা হয়, সেই থেকে নামকরণ করা হয় রাজাঝির দিঘি নামে। কবি নবীনচন্দ্র সেনের বিভিন্ন রচনায় এই দিঘিকে রাজনন্দিনী দিঘি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সৌন্দর্যে ঘেরা দিঘিটি জড়িয়ে আছে ফেনীর ইতিহাস-ঐতিহ্যের সঙ্গে একাত্ম হয়ে। এর চারপাশে রয়েছে ওয়াকওয়ে। স্বাস্থ্য সচেতন নাগরিকরা এখানে প্রাতঃভ্রমণে আসেন। এ ছাড়া, দিঘিতে প্রতি বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে শুক্রবার সারাদিন মাছ ধরার উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। দিঘির উত্তরপাশে রয়েছে জেলা পরিষদ শিশু পার্ক। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ফেনীর মহিপালে নেমে ১০ টাকা সিএনজি ভাড়া দিয়ে ট্রাংক রোড জিরো পয়েন্ট আসলেই এ দিঘির সৌন্দর্য উপভোগ করা যাবে।
বিজয়সিংহ দিঘি
বাংলার বিখ্যাত সেন বংশের প্রতিষ্ঠাতা বিজয় সেনের অমর কীর্তি এ বিজয় সিংহ দিঘি। শহরের ট্রাংক রোড থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার পশ্চিমে বিজয় সিংহ গ্রামে ফেনী সার্কিট হাউজের সামনে বিজয় সিংহ দিঘি অবস্থিত। এ দিঘির আয়তন ৩৭ দশমিক ২৩ একর। অত্যন্ত মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশের এ দিঘির চৌপাড় সুউচ্চ ও বৃক্ষশোভিত। বিজয় সিংহ দিঘি ফেনীর ঐতিহ্যবাহী দিঘিগুলোর একটি। এ দিঘির পশ্চিম পাশে রয়েছে গোল্ডেন শিশু পার্ক। মহিপাল থেকে রিকশাযোগে ২০ টাকা ভাড়ায় সার্কিট হাউজের সামনে গেলেই এ দিঘির সৌন্দর্য উপভোগ করা যাবে।
বিজ্ঞাপন

প্রতাপপুর জমিদার বাড়ি
ফেনীর দাগনভূঞা উপজেলার পূর্বচন্দ্রপুর ইউনিয়নের প্রতাপপুর গ্রামে প্রতাপপুর জমিদার বাড়ির অবস্থান। প্রায় ১৮৫০ থেকে ১৮৬০ সালে দাগনভূঞার প্রতাপপুরে এই জমিদার বাড়িটি নির্মিত হয়। এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন রাজকৃষ্ণ সাহা কিংবা রামনাথ কৃষ্ণ সাহা। স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে এটি প্রতাপপুর বড়বাড়ি বা রাজবাড়ি হিসেবেও পরিচিত। এই জমিদার বংশধররা জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হওয়ার পরও ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত এই জমিদার বাড়িতে ছিলেন। জমিদার বাড়ির বংশধরদের কেউ ঢাকা-চট্টগ্রাম এবং কেউ ভারতের কলকাতা ও ত্রিপুরা রাজ্যে আছেন। এই বাড়িতে ছিল মোট ১৩টি পুকুর, যেখানে মাছ চাষ হতো জমিদারের তত্ত্বাবধানে। এতো পুকুর বাংলাদেশের আর কোন জমিদার বাড়িতে নেই।
তৎকালীন অন্যান্য স্থানের জমিদাররা এই বাড়িতে যাত্রাবিরতি করতেন। জমিদার প্রথার বিলুপ্তির সঙ্গে বাড়ির প্রভাব-প্রতিপত্তিও কমতে শুরু করে। এখনো প্রতি বছর বৈশাখে সনাতন ধর্মালম্বীরা বাড়িটি ঘিরে তিন দিনব্যাপী উৎসব পালন করেন। দেখতে পারেন প্রতাপপুরে জমিদারদের প্রতিষ্ঠা করা প্রতাপপুর হাই স্কুল। ফেনীর মহিপাল থেকে নোয়াখালীগামী বাসে উঠে সেবারহাট এলাকায় নেমে সিএনজি অটোরিকশাযোগে প্রতাপপুর বাজার গেলেই পাশ্ববর্তী স্থানে জমিদারবাড়ি দেখতে পাবেন।
মুহুরী প্রজেক্ট
মুহুরী প্রজেক্ট বা মুহুরী সেচ প্রকল্প হলো বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সেচ প্রকল্প, যা ফেনী জেলার সোনাগাজী উপজেলায় অবস্থিত। ২০০৪ সালে সোনাগাজী সদর ইউনিয়নের মুহুরী সেচ প্রকল্প এলাকায় থাক খোয়াজ লামছি মৌজায় দেশের প্রথম বায়ুশক্তি চালিত বিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মিত হয়। দেশের সবচেয়ে বড় মৎস্য জোন হিসেবেও মুহুরী প্রকল্প পরিচিতি পেয়েছে। ফলে এটি বর্তমানে জেলার অন্যতম একটি দর্শনীয় স্থান ও পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছে। প্রকল্প এলাকার পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ফেনী নদী বঙ্গোপসাগরে মিশেছে। দক্ষিণে বিস্তীর্ণ মাঠ এবং বন বিভাগের সবুজ বেষ্টনী। ফেনী নদী, মুহুরী নদী এবং কালিদাস পাহালিয়া নদীর সম্মিলিত প্রবাহকে আড়ি বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে ৪০ ফোক্ট বিশিষ্ট একটি বৃহদাকার পানি নিয়ন্ত্রণ কাঠামো তৈরি করে।
ফেনী সদর থেকে মুহুরী প্রকল্পের দূরত্ব অন্তত ৪০ কিলোমিটার। এর কিছু অংশ চট্টগ্রাম জেলার মিরসরাই উপজেলার মধ্যেও পড়েছে। ফেনীর লালপোল, মহিপাল বা শহরের মডেল স্কুলের সামনে থেকে সিএনজিযোগে সোনাগাজী পৌরসভা হয়ে মুহুরী প্রজেক্টের সৌন্দর্য উপভোগ করতে যাওয়া যাবে।
রাবার বাগান
ফেনীর পরশুরাম উপজেলার মির্জানগর ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী বীরচন্দ্র নগর গ্রামে ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে উঠেছে রাবার বাগান। ২০১০ সালে ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান নুরুজ্জামান ভুট্টো তার বাবা হাজী মো. মোস্তফার নামে প্রায় ২৫ একর জায়গায় ১০ হাজার রাবার চারা রোপণ করেন। পরিকল্পিতভাবে লাগানো সারি সারি রাবার গাছের এ বাগান প্রায় ৯ বছর পরিচর্যার পর রাবার সংগ্রহ শুরু করা হয়। সারি সারি রাবার বাগানে ঢুকলে সবুজের সমারোহ, যতই বাগানের ভেতরে ঢুকবেন ততই যেন বিশালতায় গ্রাস করে নেবে আপনাকে। ফেনীর একমাত্র রাবার বাগানটি দর্শনীয় স্থান হিসেবে পর্যটকদের আকৃষ্ট করছে।
এ বাগানের ভেতরে কোনো দিয়াশলাই বা আগুন জ্বালানোর উপাদান নিয়ে প্রবেশে রয়েছে নিষেধাজ্ঞা। বাগানের পশ্চিম পাশেই ভারতের সীমান্তের কাটা তারের বেড়া। আর তার পাশ্ববর্তী লিচু বাগান, সেগুন বাগানসহ উঁচু টিলায় রয়েছে বনবিভাগের বনভূমি। ফেনী থেকে সিএনজি কিংবা বাসযোগে পরশুরাম বাজার হয়ে মির্জানগর ইউনিয়নের সুবার বাজার ব্রিজ এলাকা গেলেই টমটমযোগে গিয়ে এ বাগানের সৌন্দর্য্য উপভোগ করা যাবে।
শমসের গাজীর সুড়ঙ্গ
কালের বিবর্তনে নানা ঘটনার আখ্যান হয়ে এখনও অক্ষত আছে ফেনীর ভাটির বাঘ খ্যাত বাংলার বীর শমসের গাজীর সুড়ঙ্গ। অবিভক্ত বাংলায় তৈরি হওয়া এ সুড়ঙ্গের বর্তমানে একমুখ বাংলাদেশে, অন্যমুখ ভারতে। সুড়ঙ্গ ও শমসের গাজীর ভিটা দেখতে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুঁটে আসে পর্যটক।
জেলার ছাগলনাইয়া উপজেলার শুভপুর ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী চম্পকনগর ও সোনাপুর এলাকাটি মূলত শমসের গাজীর স্মৃতি বিজড়িত স্থান। সেখানে রয়েছে শমসের গাজীর সুড়ঙ্গ, শমসের গাজী বাঁশের কেল্লা রিসোর্ট, দিঘিসহ নানা স্থাপনা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের তথ্য মতে, ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী এবং ত্রিপুরার রোশনাবাদ পরগনার কৃষক বিদ্রোহের নায়ক শমসের গাজীর প্রাসাদসহ অন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ ভারতের ত্রিপুরার মধ্যে ভাগ হয়ে গেছে। এখানকার গাজীর সুড়ঙ্গ পথটি নিয়ে রয়েছে অনেক গল্প ও উপাখ্যান। ইতিহাসের এই আশ্রমটি দেখতে সবসময় এখানে ভিড় করেন পর্যটকরা।
সুড়ঙ্গের অদূরেই রয়েছে শমসের গাজীর একটি দিঘি। যাকে এক খুইল্লা দিঘিও বলা হয়। এটিকে নিয়েও রয়েছে নানা গল্প। কথিত আছে, এ দিঘিটির ওপর ঢিল ছুঁড়ে কেউ কখনও দিঘি পার করতে পারেনি। স্থানীয় প্রবীণরা বলেন, এতে অলৌকিক শক্তি আছে। যে কারণে ঢিল ছুঁড়ে দিঘি পার করা যায় না।
শমসের গাজীর স্থাপনাগুলোর মধ্যে অন্যতম আরেকটি হলো বাঁশের কেল্লা রিসোর্ট। বাঁশের নান্দনিক নির্মাণশৈলীতে গড়ে তোলা হয়েছে এই রিসোর্টটি। এর পুরো আঙিনায় রয়েছে নানা শৈল্পিক আয়োজন, বিভিন্ন ধরনের ফল আর ফুলের বাগান। সেই বাগানের পাশের খোলা আঙিনার ধারে বাঁশের মাচা। আর খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার ঐতিহ্যবাহী পাহাড়ি ঘরের নমুনায় নির্মিত হয়েছে আসবাব।
ঢাকা থেকে স্টারলাইন পরিবহনে সরাসরি ছাগলনাইয়া যাওয়া যায়। এ ছাড়া, শ্যামলী, ইউনিক, সোহাগ, গ্রিন লাইন ও সৌদিয়া পরিবহনের বাসে ফেনী যেতে হবে। ঢাকার কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে মহানগর গোধূলি ও তূর্ণা এক্সপ্রেস ট্রেনে ফেনী যাওয়া যায়। এরপর ফেনী সদর হাসপাতাল মোড় থেকে সিনএনজিযোগে ছাগলনাইয়া উপজেলা হয়ে স্থানীয় পরিবহনে শুভপুর এলাকায় শমসের গাজীর দিঘি ও সুড়ঙ্গ পথে যেতে হবে।
সাত মঠ
ফেনীর আরেকটি প্রাচীন নিদর্শন সাত মঠ কিংবা সাত মন্দির। একটি বাংলাদেশ প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা। উপজেলা শহরের পশ্চিমে বাসপাড়ায় অবস্থিত মঠগুলো আট একর জায়গার উপর প্রতিষ্ঠিত। ছাগলনাইয়ার হিন্দু জমিদার বিনোদ বিহারি এগুলো গড়ে তোলেন। বর্তমান উপজেলা শহরের বাসপাড়ায় এর অবস্থান। জমিদার বাড়ির পাশে রয়েছে সাতটি মন্দির। এজন্য এটি সাত মন্দির বাড়ি বা রাজবাড়ি বা সাতমঠ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এখানে এক সারিতে তিনটি ও অন্য সারিতে চারটি মন্দির রয়েছে। একটি মন্দিরের চূড়া ভেঙে যাওয়ায় বর্তমানে দূর থেকে ৬টি মন্দিরের চূড়া দেখা যায়। ১৯৪৮ সালের দিকে জমিদার বিনোদ বিহারি বাড়িটি রেখে কলকাতায় চলে যান। বর্তমানে স্থানীয় বাসিন্দারা এখানে বসবাস করেন। ফেনী থেকে ছাগলনাইয়া পৌরসভায় গেলেই এ প্রাচীন মন্দিরের সৌন্দর্য্য উপভোগ করা যাবে।
শিলুয়ার শিল
ফেনীর ছাগলনাইয়ার পাঠাননগর ইউনিয়নে অবস্থিত এই পাথরটি ঘিরে নানা জনশ্রুতি রয়েছে। ফেনী-ছাগলনাইয়া আঞ্চলিক সড়কের কন্ট্রাক্টর মসজিদ বাজার হতে প্রায় তিন কিলোমিটার দক্ষিণে মধ্যম শিলুয়া চৌধুরী বাজারের ৫০ গজ পশ্চিমে ও শিলুয়া চৌধুরী বাড়ির পূর্ব পাশে এই শিল পাথরটি কালের সাক্ষী। শিল পাথরটির গায়ে খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় অব্দে প্রচলিত ব্রাক্ষ্মী লিপির চিহ্ন থেকে ধারণা করা যায় প্রাচীনকালে এই স্থানে বৌদ্ধ ধর্ম ও কৃষ্টির বিকাশ ঘটেছিল। ইংরেজ আমল থেকে প্রাচীন ঐতিহাসিক এই স্মৃতি চিহ্নটি প্রত্নতাত্বিক সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী সংরক্ষিত হয়েছে। ফেনী সদর থেকে এ স্থানের দূরত্ব প্রায় ২৭ কিলোমিটার। ফেনী সদর হাসপাতাল মোড় থেকে ছাগলনাইয়া হয়ে সিএনজিযোগে এ গ্রামে যাওয়া যাবে।
চাঁদগাজী মসজিদ
মোগল আমলের একটি ঐতিহাসিক স্থাপত্য ফেনীর ছাগলনাইয়া উপজেলার মাটিয়া গোধা গ্রামের ‘চাঁদগাজী ভূঁঞা জামে মসজিদ’। মসজিদের দেয়ালে লেখা নির্মাণ সাল অনুযায়ী এ স্থাপত্যের সময়কাল ৪০০ বছরেরও বেশি।
জানা গেছে, মোগল আমলের প্রখ্যাত ব্যক্তি চাঁদগাজী ভূঁঞা ছিলেন বাংলার বারো ভূঁঞাদের একজন। তার নাম অনুসারে এ মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রাচীন এ মসজিদে এখনো নিয়মিত নামাজ পড়েন মুসল্লিরা। মসজিদের অবকাঠামোও প্রায় একই রকম রয়েছে।
২৮ শতক জায়গার ওপর নির্মিত দৃষ্টিনন্দন এই মসজিদটি মধ্যযুগীয় রীতি অনুযায়ী চুন, সুরকি ও ক্ষুদ্র ইট দিয়ে তৈরি। মসজিদের ছাদে রয়েছে তিনটি সুদৃশ্য বড় গম্বুজ এবং চারকোণায় ও মাঝে রয়েছে উঁচু ও সরু আকারের আরও কয়েকটি গম্বুজ। মসজিদের দক্ষিণ পাশে রয়েছে চাঁদগাজী ভূঁঞার কবর। ঐতিহাসিক চাঁদগাজী ভূঁঞা মসজিদটি ১৯৮৭ সালে প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগের গেজেটভুক্ত হয়। ফেনী থেকে ছাগলনাইয়া হয়ে চাঁদগাজী বাজার গেলে সিএনজিযোগে এ মসজিদ ঘুরে আসা যাবে।
ফখরুদ্দীন মুবারক শাহ মসজিদ
ফেনী সদর উপজেলা শর্শদি ইউনিয়নে বাংলায় সুলতানি আমলের প্রথম স্বাধীন মুসলিম শাসক ফখরুদ্দীন মুবারক শাহ প্রায় ৬৭৪ বছর আগে নিজ নামে ইট, পাথর ও সুরকি দিয়ে ছয় গম্বুজের নান্দনিক স্থাপনাটি নির্মাণ করেছিলেন। সুলতানি স্থাপত্যরীতির সুন্দর এ কাঠামোতে শত শত বছর ধরে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা এখানে নামাজ আদায় করে আসছেন। ১৯৯৫ সালের ১১ মে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে মসজিদটি তালিকাভুক্ত হয়েছে। প্রাচীন নিদর্শন সমৃদ্ধ এ মসজিদ দেখতে মহিপাল থেকে মোহাম্মদ আলী বাজার হয়ে সিএনজিযোগে যেতে হবে।
ফেনী সরকারি কলেজ বধ্যভূমি
মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত ফেনী কলেজ ও ফেনী সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়৷ এই দুই প্রতিষ্ঠানের মূল ভবন শতবর্ষী পুরনো। এখনো যা ঐতিহ্যের ধারক হয়ে আছে। এর পেছনেই ফেনী কলেজ বধ্যভূমি, যেখানে নির্বিচারে মুক্তিকামী বাঙালিদের গোলপোস্টে ঝুলিয়ে হত্যা করা হতো।
'মুক্তিরও মন্দিরে সোপানে তলে, কত প্রাণ হলো বলিদান, লেখা আছে অশ্রুজলে' এবং 'এক সাগর রক্তের বিনিময়ে, বাংলার স্বাধীনতা আনল যারা, আমরা তোমাদের ভুলব না-এ দুটো গানের লাইনের প্রতিপাদ্য নিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত ফেনী সরকারি কলেজে করা হয়েছে বধ্যভূমি স্মৃতিস্তম্ভ কমপ্লেক্স। বধ্যভূমির একপাশে সরু লম্বা দেয়াল দাঁড়িয়ে শহীদদের সম্মান জানাচ্ছে, অন্যদিকে নান্দনিকভাবে তৈরি করা হয়েছে মুক্তমঞ্চ। ফেনীর অন্যতম দর্শনীয় স্থান হিসেবে গড়ে উঠেছে এ স্মৃতিস্তম্ভ কমপ্লেক্স।
বধ্যভূমি স্মৃতিস্তম্ভের চূড়ান্ত নকশা করা হয় হত্যাযজ্ঞের কেন্দ্রবিন্দু গোলপোস্টের আদলে। দুইপাশে সুউচ্চ দেয়াল নীরবতার নিস্তব্ধতার বেষ্টনী, সামনে রয়েছে ক্ষতবিক্ষত দেয়াল যা গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া চিহ্নের প্রতিরূপ। দুইপাশের দেয়াল থেকে স্ট্রিং দিয়ে ঝুলন্ত ছয়টি সিলিন্ডার অমর শহীদের চেতনা, জাগরণ, সংগ্রাম, বেদনা, জয়, স্বাধীনতার গৌরবকে নির্দেশ করে। তলদেশে বয়ে যাওয়া লোহিত পানির ধারা রক্তক্ষয়ী ইতিহাসের প্রতিরূপ।
ফেনী শহরের জিরো পয়েন্ট থেকে জেল রোড হয়ে কলেজের ভেতরের ফটকের ভেতরে বধ্যভূমি স্মৃতিস্তম্ভ অবস্থিত। পাশাপাশি ফেনী রেলওয়ে স্টেশন থেকে সহজেই এর সৌন্দর্য্য উপভোগ করা যায়।
বিলোনিয়া স্থলবন্দর
প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ২০০৯ সালের ৪ অক্টোবর দেশের ১৭তম স্থলবন্দর হিসেবে পথচলা শুরু হয় ফেনীর বিলোনিয়া স্থলবন্দরের। পরশুরাম উপজেলার সীমান্ত এলাকায় স্থাপিত বন্দরটি দেশের একমাত্র রপ্তানিমুখী বন্দর। ত্রিপুরাসহ উত্তর-পূর্ব ভারতের সাতটি রাজ্যে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে এটি। এ বন্দর দিয়ে ইট, বালু, সিমেন্ট, পাথর, রড, শুঁটকি, মসলাসহ নানা সামগ্রী রপ্তানি হয়। একমুখী বাণিজ্যের কারণে বন্দরটি পিছিয়ে পড়লেও অবকাঠামোগত উন্নয়নে নজর কাড়ছে পর্যটকদের।
রাজধানী থেকে ফেনী জেলার দূরত্ব প্রায় ১৫১ কিলোমিটার এবং চট্টগ্রাম বিভাগীয় সদর থেকে প্রায় ৯৭ কিলোমিটার। এ জেলার উত্তরে কুমিল্লা জেলা ও ভারতের ত্রিপুরা, দক্ষিণ চট্টগ্রাম, পূর্বে ভারতের ত্রিপুরা, পশ্চিমে নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুর জেলার অবস্থান। জেলার যেকোন স্থান ভ্রমণে ঢাকা-চট্টগ্রাম থেকে মহাসড়ক হয়ে বাসযোগে মহিপাল এলাকায় আসা যায়। সেখান থেকে যে কোনো পর্যটন স্পট ঘুরে এসে শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে স্বল্প থেকে বড় বাজেটে হোটেলে অবস্থান করা যায়।
এএমকে