পরিবার ছাড়া ১৬০ শিশুর ঈদ, আনন্দের মাঝেও অদৃশ্য কষ্ট

পঞ্চগড় সদর উপজেলার হাফিজাবাদ ইউনিয়নের জলাপাড়া গ্রামে অবস্থিত আহছানিয়া মিশন শিশু নগরী। চারপাশে নীরবতা, আর ভেতরে ভেসে আসে শিশুদের হাসির শব্দ। এখানে বর্তমানে ১৬০ জন এতিম, পথশিশু ও পরিবারহীন শিশু আশ্রয় পেয়েছে। কেউ শৈশবে হারিয়ে গেছে, কেউ পরিত্যক্ত, আবার কেউ জানেই না নিজের বাড়ির ঠিকানা। আসন্ন ঈদুল ফিতরকে ঘিরে তাই তাদের জীবনে আনন্দ আর আক্ষেপ-দুটোই পাশাপাশি চলে।
বিজ্ঞাপন
১২ বছর বয়সী সাগর ইসলাম এখনও মনে করতে পারে পুরান ঢাকার সেই বাড়ির কথা। ছোটবেলায় হারিয়ে গিয়ে দীর্ঘ সাত বছর কাটিয়েছে কমলাপুর এলাকায়। পরে ইউসুফ নামে এক সমাজকর্মীর মাধ্যমে আশ্রয় পায় এই শিশু নগরীতে। সাগর বলে, এখানে এসে ভালোই লাগে। ঈদে নতুন কাপড়, আতর, মেহেদি-সবই পাই।
একই গল্প ফাহিমের (১১)। ছয় বছর বয়সে হারিয়ে যাওয়ার পর আর খুঁজে পায়নি পরিবারকে। মা আগেই মারা গেছেন, বাবার সঙ্গে বিচ্ছেদ সেই হারানোর দিন থেকেই। ফাহিমের কণ্ঠে আবেগ, ইচ্ছা ছিল পরিবারের সাথে ঈদ করব। কিন্তু এখন স্যাররাই আমার পরিবার। তার স্মৃতিতে এখনও জ্বলজ্বল করে পথশিশুর কঠিন জীবন-বোতল কুড়ানো, অনিয়মিত খাবার। তবে এখানে এসে পেয়েছে নতুন জীবন। খাওয়া, পড়ালেখা, কাপড়-সবই ফ্রি। ঈদও ভালো লাগে।
আট বছরের শুকুর আলীকেও একসময় স্টেশন থেকে উদ্ধার করা হয়। বাইরে ঈদের আনন্দ তার কাছে ছিল অচেনা। এখানে মেহেদি দেয়, ভালো খাবার হয়-অনেক ভালো লাগে, জানায় সে।
বিজ্ঞাপন
চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় এসে হারিয়ে যাওয়া ১৪ বছর বয়সী সাজ্জাদুল ইসলাম বাইজিদের গল্পও কম কষ্টের নয়। মা দোকানে গেছিল, আমি ঘুরতেছিলাম। পরে দেখি মা নাই, কণ্ঠে চাপা বেদনা। তিন বছর পেরিয়ে গেলেও পরিবারকে ভুলতে পারেনি সে। বাইজিদ বলে, সবার মতো আমারও পরিবারের সাথে ঈদ করতে ইচ্ছা করে।
ইমাম মাহাদী (১৪) হারিয়ে যায় ২০১৯ সালে। ঢাকায় এসে পড়ে এবং পথশিশুর জীবনে নানা নির্যাতনের শিকার হয়। পরে পুলিশের সহায়তায় আশ্রয় পায় এখানে। মাহাদী বলে, এখানে ঈদের নামাজ পড়ি, পড়ালেখা করি। স্যাররাই এখন আমার মা-বাবা।
সাত বছর বয়সী জয়নালের গল্প আরও হৃদয়বিদারক। তার দাবি, সন্ত্রাসীদের হাতে নিহত হয়েছেন তার বাবা-মা। পরে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে একসময় এই শিশু নগরীতে এসে ঠাঁই পায় সে।
বিজ্ঞাপন
আহছানিয়া মিশন শিশু নগরীর সমাজকর্মী ইউসুফ আলী বলেন, এখানে ১৬০ জন পরিবারবিহীন শিশু আছে। আমরা চেষ্টা করি, তাদের একটি পারিবারিক পরিবেশ দিতে, যেন ঈদে তারা কষ্ট না পায়।
আহছানিয়া মিশন শিশু নগরীর সেন্টার ম্যানেজার দীপক কুমার রায় জানান, ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানটি ঢাকা আহছানিয়া মিশনের একটি অঙ্গসংগঠন। এখানে শিশুদের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার পূর্ণ ব্যবস্থা রয়েছে।
তিনি বলেন, প্রতি বছরের মতো এবারও ঈদের প্রস্তুতি নিয়েছি। নতুন পোশাক, ভালো খাবার, এমনকি মাংসের জন্য ছাগলও কেনা হয়েছে। আমরা চাই, তারা যেন পরিবারের অভাবটা কিছুটা হলেও ভুলে থাকতে পারে।
নুর হাসান/এসএইচএ