‘আমরা তো ভাড়া বেশি দিচ্ছি, কিন্তু মন্ত্রী প্রমাণ পাচ্ছে না’

গাজীপুরের চৌরাস্তা থেকে রংপুরের উদ্দেশ্যে বাসে উঠেছিলেন শিউলি বেগম। রংপুরের প্রবেশদ্বার মডার্ন মোড়ে নামিয়ে দেওয়ার কথা থাকলেও গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে এসে বাস আর এ পথে আসেনি। বাধ্য হয়ে তাকে নামতে হয় সেখানে। তবে ১ হাজার টাকার এক টাকাও কম নেয়নি বাস কন্ডাক্টর। বরং গোবিন্দগঞ্জ থেকে ২০০ টাকায় রংপুরে এসে ঠাকুরগাঁও যেতে বাড়তি ভাড়ার বিড়ম্বনায় পড়েছেন এই যাত্রী।
বিজ্ঞাপন
দুই বাসে টানা ১৪ ঘণ্টার ঈদযাত্রা শেষে বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ) দুপুরে রংপুর নগরীর প্রবেশদ্বার মডার্ন মোড় এলাকায় এসে বাস থেকে নেমে দীর্ঘশ্বাস ফেলে কথাগুলো বলছিলেন শিউলি বেগম। গাজীপুরের একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করেন তিনি। রংপুর থেকে বিকল্প বাসে করে যাবেন ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুরে।
শিউলি বেগমের হাজার হাজার মানুষ এখন ঘরমুখো। ঈদুল ফিতরে পরিবারের প্রিয়জনদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতেই বাড়তি ভাড়া দিয়ে হলেও বাস, ট্রাক, সিএনজি, পিকআপসহ যে যেভাবে পাড়ছে বাড়ি ফিরতে শুরু করেছে। তবে নাড়ির টানে বাড়ি ফিরতে ঘরমুখো এসব মানুষের অভিযোগের শেষ নেই।
ঢাকা-গাজীপুর-ময়মনসিংহ থেকে আশপাশের জেলাগুলো থেকে রংপুর বিভাগে ফিরতে শুরু করা যাত্রীদের পোহাতে হচ্ছে যানজটের ধকল। ঈদযাত্রায় ঢাকা-রংপুর মহাসড়কে মানুষের চাপ বাড়লেও বাড়েনি যাত্রী পরিবহনে গতি। বরং স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি পরিবহনের সঙ্গে সড়কে সৃষ্ট দীর্ঘজটে হাহুতাশ করছে সাধারণ যাত্রীরা। সাথে বাড়তি ভাড়া নেওয়াসহ পথে পথে রয়েছে ভোগান্তি ।
বিজ্ঞাপন
মডার্ন মোড়ে ট্রাফিক পুলিশের কন্ট্রোল রুমের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন ফরিদুল ইসলাম এক যাত্রী। তিনি দিনাজপুরে যাবেন। সেখানে কথা হলে তিনি বলেন, সরকারের সড়ক পরিবহন মন্ত্রীর কথা কাজে মিল নেই। পরিবহন সেক্টরে কোনো পরিবর্তন আসেনি। বরং আগের চেয়ে এখন আরও বেশি ভাড়া নিচ্ছেন বাস মালিকরা। আমি মহাখালী থেকে রংপুরে এসেছি ১৬০০ টাকায়। তাও আবার কখনো সিটে বসে আবার কখনো দাঁড়িয়ে থেকে। এ রকম ভোগান্তি কবে কমবে।
আক্ষেপ করে ফরিদুল ইসলাম বলেন, আমরাতো ভাড়া বেশি দি চ্ছি, কিন্তু আমাদের মন্ত্রী তো ভাড়া বেশি নেওয়ার কোনো প্রমাণ পাচ্ছে না। পুলিশ প্রশাসনের লোকজনের সামনেই বাড়তি টাকা ছাড়া টিকেট পাওয়া যাচ্ছে না। আর উনি (মন্ত্রী) খুঁজে পাচ্ছে না। আজব দেশ ,কোথাও কথা কাজে মিল নেই। এমন মন্ত্রী দিয়ে তো আমাদের গরিবের কোনো উপকার হবে না।
একই অভিযোগ হাজারো যাত্রীর মুখে। ঈদ ঘিরে পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের এমন সিন্ডিকেটে নতুন সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হলেও শক্ত কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় ক্ষুব্ধ সাধারণ যাত্রীরা। তারা জানান, ঢাকা, টঙ্গী, গাজীপুর চৌরাস্তা, মাওনা, টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জসহ বিভিন্ন পয়েন্ট যানজট দেখা দিচ্ছে। অন্যদিকে সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে যাত্রীদের কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বাড়তি ভাড়া। কোথাও কোথাও পরিবহন ভেদে দ্বিগুণ ভাড়া গুণতেও বাধ্য হচ্ছেন অনেকেই।
বিজ্ঞাপন
বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ) সকাল থেকে বিকেল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত রংপুরের প্রবেশদ্বার মডার্ন মোড়ে রংপুর-ঢাকা মহাসড়কে অনেককেই ঝুঁকিপূর্ণভাবে বাস, ট্রাক ও পিকআপ ভ্যানে করে গন্তব্যে যেতে দেখা যায়। যেন ঈদযাত্রার শেষ মুহূর্তেও ভোগান্তির শেষ নেই।
যাত্রীরা বলছেন, খোলা গাড়িতে করে ঈদযাত্রা কিছুটা কষ্টকর মনে হলেও উপায় নেই। ভাড়া বেশি, গাড়ির সংকট আর মহাসড়কে যানজট, টিকিট সিন্ডিকেট, পথে পথে ভোগান্তি কমেনি। এ কারণে সবচেয়ে বেশি কষ্টের শিকার হয়েছেন বয়স্ক নারী-পুরুষ ও শিশুরা।

সরেজমিনে দেখা যায়, ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলা থেকে রংপুর বিভাগের উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসা বাসগুলোতে যাত্রী ভরপুর। বাস তো বটেই ট্রাক ও পিকআপভ্যানে জায়গা পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়ছে তাদের জন্য। ঢাকা থেকে রংপুরমুখী প্রতিটি যানবাহনেই রয়েছে যাত্রীর ভিড়। ঘরমুখো মানুষের চাপে যানবাহনের ছোট জায়গাও যেন হয়ে উঠেছে মূল্যবান। যাত্রীদের বেশিরভাগই পোশাক শ্রমিক ও নিম্নআয়ের মানুষ।
রংপুর নগরীর মডার্ন মোড় সাথে কথা হয় নুরুল ও হেলেনা নামে এক দম্পতির সঙ্গে। তারা আড়াই বছরের শিশু সন্তান নিয়ে গাজীপুরের শ্রীপুর থেকে রাইসা পরিবহন বাসে ওঠেন। সেই বাসে বগুড়া পর্যন্ত দাঁড়িয়ে এসে বাস পরিবর্তন করে আরেকটি বাসে উঠে রংপুরে আসেন।
প্রতিবারের মতো এবারও গাড়িভাড়া বেশি নিয়েছে বলে অভিযোগ করেন নুরুল হুদা। তিনি বলেন, পরিবার ছেড়ে ঢাকায় গিয়ে আয় রোজগার করছি। বছরে দুইবার পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে ঈদ উদযাপন করতে আসি। গতবারের চেয়ে এবার কষ্টটা একটু বেশি মনে হলো।
স্মার্ট পরিবহনে করে ঢাকা থেকে আসা খাদেমুল ইসলাম বলেন, উত্তরাঞ্চলে যেতে বেশির ভাগ বাসই আবদুল্লাহপুর থেকে আশুলিয়ার বাইপাইল সড়ক হয়ে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক ব্যবহার করে। এই সড়কের বেশ কিছু অংশে তীব্র যানজটে আটকা পড়ে থাকতে হয়েছে। এখন রংপুর থেকে লালমনিরহাট যেতে বিকল্প পরিবহনে উঠতে সাতমাথা সড়কের দিকে যাচ্ছেন বলেও জানান তিনি।
এদিকে ঈদে ঘরমুখো মানুষের যাত্রা নিরাপদ করতে মডার্ন মোড়ে সাব-কন্ট্রোল রুম স্থাপন করেছে র্যাব ও মেট্রোপলিটন পুলিশ।
রংপুর বিভাগের আট জেলার মধ্যে গাইবান্ধা ছাড়া বাকি সাত জেলা রংপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, দিনাজপুর, পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁও যেতে মডার্ন মোড়ে নামতে হয় বেশির ভাগ যাত্রীদের। এখান থেকে নিজ নিজ জেলার পরিবহনে যেতে যাত্রীদের বাড়তি ভাড়া দিতে হচ্ছে বলে অভিযোগ অনেকেরই। তবে প্রশাসনের দায়িত্বরত কর্মকর্তারা বলছেন- সাব-কন্ট্রোল রুমের মাধ্যমে ঈদ পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সময়ে যানবাহন চলাচল, যাত্রীদের নিরাপত্তা ও জরুরি সেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বাড়তি ভাড়া আদায় বন্ধেও কাজ করছেন তারা।
রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মজিদ আলী বলেন, ঈদে ঘরমুখো মানুষের যাত্রা যেন নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক হয়, সেজন্য আমরা কাজ করছি। এই সাব কন্ট্রোল রুম থেকে যাত্রীদের সব ধরনের তথ্য, দিকনির্দেশনা ও সহায়তা দেওয়া হচ্ছ। সেই অজ্ঞান পার্টি, মলম পার্টিসহ প্রতারক চক্রের হাত থেকে যাত্রীদের জানমাল রক্ষায় কাজ করছে সাব-কন্ট্রোল রুমটি।
র্যাব-১৩ উপ-অধিনায়ক মেজর সাইফুল ইসলাম বলেন, অপরাধ দমন ও যাত্রীদের সুরক্ষার জন্য র্যাব বদ্ধপরিকর। ইতোমধ্যে গরুর হাট, বাজার, মহাসড়কে র্যাব চেকপোস্ট বসিয়ে নাগরিকদের সেবা প্রদান করছে। ঈদের আগে ও পরে এ কার্যক্রম অব্যহত থাকবে।
ফরহাদুজ্জামান ফারুক/আরএআর