সুনামগঞ্জে বাঁধ কাটা নিয়ে দুই গ্রামবাসীর সংঘর্ষ, আহত ২০

সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলার বৃহত্তর পাগনার হাওরের উপরের অংশের জলাবদ্ধতার পানি নিষ্কাশনের জন্য কানাইখালী নদীর বাঁধ কাটা নিয়ে দুই গ্রামবাসীর সংঘর্ষ হয়েছে। এতে অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন।
বিজ্ঞাপন
শনিবার (২১ মার্চ) দুপুরে উপজেলার ফেনারবাঁক ইউনিয়নের শান্তিপুর গ্রামের পশ্চিমে কানাইখালী নদীর উত্তর তীরে শান্তিপুর ও জামালগঞ্জ সদর ইউনিয়নের কাশীপুর গ্রামের লোকজনের মধ্যে এই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
সংঘর্ষে আহত হয়েছেন, শান্তিপুর গ্রামের মাসুদ মিয়া (৪১), আবু হানিফ (২৬), মো. রাফাত (২০), মো. সামিরুল ইসলাম (২৭), আবু সালেক (১৮), নুর মোহাম্মদ (৪০), কিসমত আলী (২৫), বাকি বিল্লাহ (২৬), মো. সানুয়ার হোসেন (৪৩)। গুরুতর আহত মাসুদ মিয়া, আবু হানিফ, মো. রাফাত ও মো. সামিরুল ইসলামকে সিলেটের এমএজি ওসামানী মেডিকলে কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
অন্যদিকে কাশীপুর পক্ষের আহতরা হলেন- জসিম উদ্দিন (৩৫), আবুল হোসেন (৩০), আবু কালাম (২৫), তায়েফনগর গ্রামের সুজন মিয়া (২৬), রমজান আলী (২৫), হাজু মিয়া (৬২) ও রাব্বি মিয়া (১৬)। এছাড়া আরও কয়েক স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা নিয়েছেন।
বিজ্ঞাপন
স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, কানাইখালী নদী দিয়ে জামালগঞ্জ উপজেলার ফেনারবাঁক, ভীমখালী ও জামালগঞ্জ সদর ইউনিয়নের অর্ধ শতাধিক গ্রামের কয়েক হাজার হেক্টর বোরো জমির পানি নিষ্কাশিত হয়। কিন্তু এই নদীর শান্তিপুর গ্রামের পশ্চিম দিকে অবৈধভাবে একটি বাঁধ দিয়ে পানি আটকে রাখা হয়েছে।
একইভাবে কানাইখালী নদীর একটি শাখা পাঠামারা খালে আরেকটি বাঁধ দিয়ে পানি আটকে রেখেছে একই ইউনিয়নের হটামারা গ্রামের লোকজন। হটামারা ও শান্তিপুর গ্রামবাসীর দাবি- বাঁধ না দিলে উপরের পানিতে তাদের হাওরের নিচু জমি তলিয়ে যাবে।
এদিকে কানাইখালী নদীতে বাঁধ দিয়ে রাখার কারণে বাঁধের উজান এলাকায় বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে শত শত একর বোরো জমির ধান। দুটি বাঁধ কাটা নিয়ে কয়েকদিন ধরে স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছিল।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা জানান, কানাইখালী নদী ও পাঠামারা খালে অবৈধভাবে বাঁধ দিয়ে উজানের পানি নিস্কাশনে বাঁধা দেওয়ার কারণে ফেনারবাঁক ইউনিয়নের রাজাপুর, গঙ্গাধরপুর, ছয়হারা, রাজাবাজ, উজান দৌলতপুর, ভাটি দৌলতপুর, ফেনারবাঁক, ভীমখালী ইউনিয়নের রাজাবাজা, ভান্ডা, মল্লিকপুর ও জামালগঞ্জ সদর ইউনিয়নের কালাগোজা, কাশীপুর, লালপুর, লক্ষীপুরসহ আরও বিভিন্ন গ্রামের কৃষকদের ফসলি জমিতে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। অনেক কৃষকের বোরো জমির কাঁচা ধান পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। হটামারা ও শান্তিপুর গ্রামবাসীকে বাঁধ কেটে দেওয়ার জন্য বার বার তাগিদ দিলেও তারা কর্ণপাত করছে না। তাই আজ কাশীপুর গ্রামের কৃষকরা নিজেরাই বাঁধ কাটতে গিয়েছিলেন। বাঁধ কাটা নিয়ে শান্তিপুর ও কাশীপুর গ্রামের লোকজনের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এসময় উভয় পক্ষের লোকজন মসজিদের মাইকে সংঘর্ষের খবর প্রচার করে। সংঘর্ষে উভয়পক্ষের অন্তত ১৫ জন আহত হয়। আহতদের জামালগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
ফেনারবাঁক গ্রামের বাসিন্দা মোজ্জামেল চৌধুরী বলেন, কানাইখালী নদী দিয়ে তিনটি ইউনিয়নের হাজার হাজার কৃষকদের জমির পানি নিষ্কাশিত হয়। কিন্তু দুইটি স্থানে বাঁধ দিয়ে পানি আটকে রাখার কারণে অনেক কৃষকের জমি পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছে। দ্রুত বাঁধ অপসারণ করা না হলে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
কাশীপুর গ্রামের জসিম উদ্দিন বলেন, শান্তিপুর গ্রামের লোকজন কানাইখালী নদীতে অবৈধভাবে বাঁধ দেওয়ার কারণে হাওরের অনেক জমি পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। বার বার অনুরোধ করার পরও তারা বাঁধটি কেটে দিচ্ছে না। আজকে উল্টো আমাদের গ্রামের লোকজনের উপর হামলা করেছে।
শান্তিপুর গ্রামের বাসিন্দা মো. সানোয়ার হোসেন বলেন, হটামারা গ্রামের লোকজন পাঠামারা খালে বাঁধ দেওয়ায় আমাদের হাওরের পানি ঢুকতে শুরু করে। তাই আমরা জমি রক্ষায় নদীতে বাঁধ দিয়েছি। ফেনারবাঁক ও ভীমখালী ইউপি চেয়ারম্যান এবং ইউএনও আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন একসাথে দুটি বাঁধ কাটা হবে। আমরা কথা দিয়েছিলাম আমাদের বাঁধ আমরা নিজেরাই কেটে দেব। কিন্তু হটামারা গ্রামবাসী বাঁধ আরও উঁচু করেছে। অন্যদিকে কাশীপুর গ্রামের লোকজন হঠাৎ করে আমাদের গ্রামের লোকজনের ওপর হামলা করেছে। আমাদের ১০-১২ জন আহত হয়েছে।
হটামারা গ্রামের আব্দুল হেকিম বলেন, হাওরের পানি নিস্কাশনের রাস্তা নেই। কানাইখালী নদী দিয়ে হাওরের পানি সুরমা নদীতে যায় না। উজানের সব পানি আমাদের হাওরে ঢুকে যায়। ইতোমধ্যে শতাধিক বিঘা জমি পানির নিচে চলে গেছে। তাই পানি আটকানোর জন্য আমরা বাঁধ দিয়েছি। এই বাঁধ কেটে দিলে আমাদের হাওরের সব জমি পানিতে তলিয়ে যাবে।
তবে শান্তিপুর গ্রামের সানোয়ার হোসেন দাবি, হটামারা গ্রামের কারো মূল জমিতে পানি যায়নি। বিলের চরায় কিছু খাস জমিতে পানি উঠেছে।
জামালগঞ্জ থানার এসআই সুব্রত দাস বলেন, শান্তিপুর গ্রামের কাছের কানাইখালী নদীর বাঁধ কাটা নিয়ে দুইপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে উভয়পক্ষের ৮-১০ জন আহত হয়। বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে।
ফেনারবাঁক ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কাজল তালুকদারের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়ায় তার সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
ভীমখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আখতারুজ্জামান বলেন, উপজেলা প্রশাসনের আলোচনায় সিদ্ধান্ত হয়েছিল দুটি বাঁধই কেটে দেওয়ার জন্য। আমি ও ফেনারবাঁক ইউপি চেয়ারম্যান হটামারা গ্রামে গিয়েছিলাম, কিন্তু তারা বাঁধ কাটতে রাজি নয়। বাঁধের কারণে পানি নিষ্কাশন না হওয়ায় শত শত কৃষকের জমি পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। বাঁধ কাটার দাবিতে তিনটি ইউনিয়নের কয়েক হাজার কৃষক এখন আন্দোলনে যেতে বাঁধ্য হবে।
এ বিষয়ে জামালগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুশফিকুন নুর বলেন, শান্তিপুর ও হটামারা গ্রামের মুরব্বীদের অনুরোধ করে বলেছিলাম বাঁধ কেটে পানি প্রবাহ স্বাভাবিক করে দেওয়ার জন্য। কিন্তু হটামারা গ্রামের লোকজন জানিয়েছেন, তাদের জমির পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করে দিলে তারা বাঁধ অপসারণ করবেন। আমরা জানিয়েছি, প্রকৃতিগতভাবে উজানের পানি নদী দিয়ে নিষ্কাশিত হবে। এটা আটকানোর সুযোগ নেই, বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবগত করা হয়েছে। দুটি বাঁধ অপসারণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তামিম রায়হান/এসএইচএ