চার প্রতিবন্ধী মেয়েকে নিয়ে গোলাপ-ফিরোজা দম্পতির বেঁচে থাকার যুদ্ধ

নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার মেথিকান্দা রেলওয়ে স্টেশন সংলগ্ন রেলের সরকারি জায়গায় একটি জরাজীর্ণ টিনের ঘরে বসবাস করছেন মোহাম্মদ গোলাপ মিয়া ও ফিরোজা বেগম দম্পতি। চার প্রতিবন্ধী মেয়েকে নিয়ে তাদের দিন কাটছে চরম কষ্ট ও অনিশ্চয়তার মধ্যে।
বিজ্ঞাপন
ঘরের ভেতরে ঢুকলেই চোখে পড়ে হৃদয়বিদারক এক দৃশ্য। টলমলিয়ে তাকিয়ে থাকে বাবার চার রাজকন্যা। একজন অকারণে হাসে, আরেকজনের হাত-পা সিকলে বাঁধা। কেউই স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারে না। অন্যসব শিশুর মতো তাদের বেড়ে ওঠা হয়নি, জন্ম থেকেই তারা প্রতিবন্ধী।
প্রায় ৪৫ বছর আগে শুরু হওয়া এই দাম্পত্য জীবনে জন্ম নেয় চার কন্যা ফেরদৌসি, সুমি, পেয়ারা ও ছামিদা। কিন্তু সুখের সেই সংসার আজ দুঃখের ভারে ন্যুব্জ। মাথার ওপর থাকা টিনের ছাউনিও এখন আর নিরাপদ নয়। বৃষ্টি নামলেই পানি পড়ে ঘরের ভেতরে, ভিজে যায় বিছানা, কাপড় আর সেই সঙ্গে ভিজে যায় তাদের স্বপ্ন।
পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি গোলাপ মিয়া এখন শ্বাসকষ্ট ও হৃদরোগে আক্রান্ত। কাজ করার মতো শক্তি নেই তার। এক সময় রিকশা চালানো, মাটির কাজ করা কিংবা মৌসুমী ফল বিক্রি করে সংসার চালালেও এখন তিনি প্রায় কর্মক্ষমতাহীন।
বিজ্ঞাপন
কান্নাজড়িত কণ্ঠে গোলাপ মিয়া বলেন, আমি রেলের জায়গায় থাকি, আমার শ্বাসকষ্ট, হার্টের সমস্যা। কোনো কাজ করতে পারি না, ৫ কেজি মাল নিয়ে হাঁটতে পারি না। দম বন্ধ হয়ে যায়। আমার ৪টা প্রতিবন্ধী মেয়ে, ওদের নিয়ে যে কি করি। মানুষের হায়াত মওতের কথা বলা যায় না আমার কিছু হলে ওদের কী হবে।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নির্বাচনে পাস করছে, তার জন্য দোয়া করি। প্রধানমন্ত্রী মানুষকে সাহায্য করতেছে আমার পরিবারকেও যদি সাহায্য করে তাহলে আমি একটু চলতে পারমু।
গোলাপ মিয়া বলেন, দেশবাসীর কাছে অনুরোধ করি, যেন আমি পরিবার নিয়ে চলতে পারি এমন ব্যবস্থা করে দেয়। সরকার যদি একটা পথ করে দিত, তাহলে আমার জানটা বাঁচতো। এখন তো আর কোনো কাজ করতে পারি না দুই বছর ধরে। এলাকাবাসী যা সহযোগিতা করে তা দিয়ে চলতেছি। এক বেলা খাইলে আরেক বেলা খাইতে পারি না। আমার মেয়েরা কান্নাকাটি করে। তাদেরকে ঠিকমতো খাবার দিতে পারি না। বাবা হিসেবে আমার অনেক কষ্ট হয়, আমি নিরুপায়।
বিজ্ঞাপন
তিনি আরও বলেন, আমার মেয়েরা কথা বলতে পারে না। যদি কথা বলতে পারতো, কবেই বিয়ে হয়ে যাইতো। এতদিন আমার কাছে থাকতো না। আল্লাহ এমন করছে— আল্লাহর ইচ্ছা। আমার বিয়ে হয়েছে ৪৫ বছর আগে। আগে রিকশা চালাইতাম, মাটির কাজ করতাম, সিজনে ফল বেচতাম। যে কাজ পাইতাম সেই কাজই করতাম।
মা ফিরোজা বেগম বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক জিয়ার কাছে আমার একটা আবেদন—আমি ৪টা মেয়ে লইয়া চলতে পারি না। অনেকেরে অনেক কিছু দিতাছে, আমি কিছু পাইতাম না কেরে। আমারে যদি সাহায্য করে তাহলে আমি ওদের নিয়ে চলতে পারমু।
তিনি বলেন, আমার স্বামী আগে সব কাজ করতে পারতো, এখন কিছুই করতে পারে না। আমার ৪টা প্রতিবন্ধী মেয়ে, এমন কপাল যেন কারো না হয়। সকালে খাওয়াতে পারলে রাতে দিতে পারি না। একবার দিতে পারলে আরেকবার পারি না। ওরা কান্নাকাটি করে। মাঝে মাঝে বিরক্ত হয়ে মারি, পরে নিজেরই মায়া লাগে—নিজেই কাঁদি। খাবার না পাইলে তারা অস্থির হয়ে যায়। বড়দের মানানো যায়, কিন্তু ছোটটা মানে না, খাবার চায়।
স্থানীয় বাসিন্দা খোদেজা খাতুন বলেন, গোলাপ ভাই আগে সব কাজ করতে পারতো আখ বেচতো, পেয়ারা বেচতো, বরই বেচতো। এখন শ্বাসকষ্টের কারণে কিছুই করতে পারে না। তার ৪টা মেয়ে প্রতিবন্ধী। একবার ভাবেন, তারা দুইজন মারা গেলে মেয়েগুলোর কী হবে? আমরা চাই সরকার একটা ব্যবস্থা করে দিক, যাতে তারা ভালোভাবে থাকতে পারে।
আরেক বাসিন্দা জালাল মিয়া বলেন, তার ৪টা মেয়ে, ৩টা প্রতিবন্ধী একটা একটু ভালো। সরকার যদি একটা সুযোগ করে দেয়, ছোট মেয়েটা পড়ালেখা করতে পারে। গোলাপ মিয়ার শরীরও ভালো না। তার থাকার জায়গা নাই, রেলের জায়গায় থাকে। ঝড়-তুফান আসলে তাদের অনেক কষ্ট হয়। আমরা চাই সরকার তাদের দিকে একটু নজর দিক।
স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ আক্তার বলেন, আমার ঘরের পাশে গোলাপ ভাই থাকে। ৪টা প্রতিবন্ধী মেয়ে নিয়ে অনেক কষ্ট করে। গ্রামের মানুষ মাঝে মাঝে সাহায্য করে। তাও ৩ বেলা থেকে ২ বেলা খেতে পারে। এই মেয়েগুলোর বিয়েও দিতে পারতেছে না। গোলাপ মিয়া অসুস্থ কখন কি হয়, ৪টা মেয়ে নিয়ে তখন কী হবে? সরকার যদি একটু সহায়তা করে, তারা ভালোভাবে চলতে পারতো।
এ বিষয়ে রায়পুরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাসুদ রানা বলেন, তাদের বিষয়ে আমরা অবগত রয়েছি। সরকারিভাবে বিভিন্ন সহায়তা কার্যক্রম রয়েছে। ভিক্ষুক পুনর্বাসন কর্মসূচির আওতায় দোকানপাট করে দেওয়া হচ্ছে, ৫০ হাজার টাকা নগদ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। এছাড়াও জটিল রোগে আক্রান্তদেরও ৫০ হাজার টাকা সহায়তা দেওয়া হয়। গোলাপ মিয়ার পরিবার আবেদন করলে যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে।
আরএআর