‘জিনের মসজিদের’ স্থাপত্যশৈলীতে মুগ্ধ দর্শনার্থীরা

মুঘল স্থাপত্যশৈলীতে বরগুনায় নির্মিত একটি শাহী মসজিদের সৌন্দর্য আজও মুগ্ধ করছে দূর-দূরান্ত থেকে ঘুরতে আসা দর্শনার্থীদের। মুঘল আমলের গৌরবময় স্থাপত্য ঐতিহ্যের এক অনন্য নিদর্শন, দৃষ্টিনন্দন কারুকাজ, নান্দনিক নকশাই এ মসজিদের মূল আকর্ষণ। তবে কথিত আছে- প্রায় ৩০০ বছর আগে জিন-পরির মাধ্যমে এ মসজিদটি রাতারাতি নির্মাণ করা হয়। আর এ কারণেই স্থানীয়দের কাছে মসজিদটি ‘পরীর মসজিদ’ নামেও পরিচিত।
বিজ্ঞাপন
বরগুনার বেতাগী উপজেলায় নির্মিত বিবিচিনি শাহী মসজিদটি লাল ইটের গাঁথুনি, সুচারু অলংকরণ আর প্রাচীন ঐতিহ্য ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কয়েক শতাব্দী ধরে এ মসজিদটি কেবল ইবাদতেরই স্থান নয়, এটি ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলমানদের সমৃদ্ধ অতীতের একটি গর্বিত স্মারক। বর্তমানে এ মসজিদটি সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে রয়েছে।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, সুউচ্চ টিলার ওপর বরগুনার বেতাগী উপজেলার বিবিচিনি ইউনিয়নে মুঘল শাসক সম্রাট শাহজাহানের শাসনামলে এ মসজিদটি নির্মাণ করা হয়। এর আয়তন ৩৩ ফুট লম্বা, ৩৩ ফুট চওড়া এবং প্রতিটি দেওয়াল প্রায় ৬ ফুট প্রশস্ত। ১৬৫৯ সালে সুদূর পারস্য থেকে আধ্যাত্মিক সাধক শাহ নেয়ামতউল্লাহ দিল্লিতে আসেন। পরে তিনি ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে বেতাগীর ওই এলাকায় এসে ওই সময়ের সুবেদার মোহাম্মদ শাহ সুজার অনুরোধে এক গম্বুজ বিশিষ্ট একটি মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন। পরে ওই মসজিদটি তার মেয়ে হায়াচ বিবি চিনির নামে বিবিচিনি মসজিদ নামে নামকরণ করা হয়। তবে ওই সময়ে এলাকাটি প্রায় জনমানবহীন থাকায় হঠাৎ করে জঙ্গলের মধ্যে মসজিদটি দেখে জিন-পরিরা রাতারাতি তৈরি করেছেন বলে ধারণা অধিকাংশ স্থানীয় বাসিন্দাদের। বর্তমানে মসজিদটির স্থাপত্যশৈলী ও প্রাচীন সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতিদিনই ভিড় করছেন দূর-দূরান্ত থেকে আসা বিভিন্ন বয়সী পর্যটকরা।
বিবিচিনি শাহী মসজিদ দেখতে আসা মো. মিরাজ নামে এক পর্যটক ঢাকা পোস্টকে বলেন, মসজিদটি প্রায় সাড়ে তিনশ বছরের পুরোনো। এর যে ধরনের স্থাপত্য সৌন্দর্য রয়েছে তা আসলেই মুগ্ধ করে। বিশেষ করে প্রাচীন নিদর্শন হওয়ায় এখানে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ নামাজ আদায় করতে আসেন। তবে জায়গা কম থাকা একসঙ্গে অনেক বেশি মানুষ নামাজ আদায় করতে পারে না। যদি সরকারিভাবে উদ্যোগ নিয়ে মসজিদটির জায়গা বৃদ্ধি করা হয় তাহলে অনেক বেশি মানুষ একসঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারবেন।
বিজ্ঞাপন
একটি ওষুধ কোম্পানিতে বেতাগী উপজেলায় কর্মরত মো. আহাদ রহমান ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমি চাকরির সুবাদে বেশ কয়েকবার এ মসজিদটি দেখতে এবং নামাজ পড়তে এসেছি। তবে যতবারই এখানে এসেছি ততবারই মুগ্ধ হয়েছি। তবে আমি মনে করি এ মসজিদটির উন্নয়ন এবং প্রাচীন ঐতিহ্য ধরে রাখতে সরকারিভাবে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত।
বিবিচিনি এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা মো. সবুজ হোসেন ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমরা মসজিদটিকে জিনের মসজিদ হিসেবেই চিনি। তবে অনেকে আবার শাহী মসজিদ বলেন। আসলে আমরা বাবা-দাদার মুখে শুনেছি মসজিদটি এক রাতে নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়াও মসজিদটি আরও অনেক উঁচুতে ছিল। এর পাশে একটি পুকুর ছিলো সে পুকুর থেকেও গায়েবিভাবে অনেক কিছু পাওয়া যেত শুনেছি।

আব্দুল শুক্কুর মোল্লা নামে স্থানীয় আরেক বাসিন্দা ঢাকা পোস্টকে বলেন, আগেকার মানুষের মুখে শুনেছি এ মসজিদটি জিন-পরিরা তৈরি করেছে। মসজিদের জয়গাটি উঁচু করে এক রাতের মধ্যেই মসজিদটি নির্মাণ করে তারা। এছাড়াও এই জায়গাটি জঙ্গল থাকায় বাঘ ভাল্লুকের বসবাস ছিল। মানুষের মাধ্যমে ওই সময় এখানে এ মসজিদ তৈরি হয়নি। নির্মাণ কাজে ব্যবহৃত ইট কোনো জায়গার বা কি নাম তা উল্লেখ নেই।
বিজ্ঞাপন
ঐতিহাসিক বিবিচিনি শাহী মসজিদে দীর্ঘ ২০ বছর ধরে ইমাম হিসেবে কর্মরত আছেন মো. আব্দুল মান্নান। তিনি ঢাকা পোস্টকে বলেন, বিবিচিনি এলাকার ফুলতলা নামক এলাকায় রুহুল আমিন নামে একজন মেজর ছিলেন। তিনি লন্ডন গিয়ে এই মসজিদটির খোঁজ জানতে পারেন এবং একটি ছবি দেখেন। পরে তিনি এখানে এসে স্থানীয়দের সঙ্গে নিয়ে জঙ্গল কেটে হাঁটার পথ তৈরি করে মসজিদটি বের করেন। পরবর্তীতে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত মসজিদটিতে শুধু জুমার নামাজ আদায় করা হতো। ইতিহাস থেকে জেনেছি ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন সময় আল্লাহর অলিরা এই দেশে এসেছেন। ওই সময়ে থাকার জন্য তারা বিভিন্ন জায়গায় এমন অনেক মসজিদ নির্মাণ করেছেন।
জিন অথবা পরির মাধ্যমে মসজিদটি তৈরি করা হয়েছে স্থানীয়দের এমন দাবির বিষয়ে তিনি বলেন, মসজিদটি শাহ নেয়ামতউল্লাহ তৈরি করেছেন এটাই সত্য। তবে যে সময়ে নির্মাণ করা হয়েছে সে সময়ের কোনো মানুষই এখন বেঁচে নেই। এ কারণেই কে কীভাবে মসজিদটি নির্মাণ করেছে তা না জানায় অনেকেই মসজিদটিকে জিনের মসজিদ বলেন। এছাড়াও ওই সময় এই এলাকার সঙ্গে কোনো ধরণের যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় মসজিদটি ইটের মাধ্যমে তৈরি করায় অনেক মানুষ এটাকে গায়েবি মসজিদও বলেন। কারণ কোনোভাবেই এত ইট মানুষের পক্ষে কোনো প্রকার যোগাযোগ মাধ্যম ছাড়া এখানে নিয়ে আসা সম্ভব না। তবে আল্লাহর অলি যারা ছিলেন তাদেরকে কিছু ক্ষমতা আল্লাহ দিয়েছেন। এবং সেই ক্ষমতার বলেই তারা এ ধরনের অনেক কাজ করেছেন। যার আরও অনেক নিদর্শন রয়েছে। বর্তমানে মসজিদটি দেখতে প্রতিদিনই দেশের দূর-দূরান্ত থেকে অনেক পর্যটকরাই আসেন।
উল্লেখ্য, ১৯৮৫ সালে মসজিদটি প্রথম সংস্কার করে বেতাগী উপজেলা প্রশাসন। পরে ১৯৯২ সালে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ মসজিদটির রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারের দায়িত্ব গ্রহণ করে।
আব্দুল আলীম/আরএআর