সালিশে চোর সাব্যস্ত, অপমানে গৃহিণীর আত্মহত্যা

পটুয়াখালীর গলাচিপায় সালিশে চোর সাব্যস্ত হওয়া অপমান সইতে না পেরে সেলিনা বেগম (৫০) নামে এক বিধবা নারীর আত্মহত্যার অভিযোগ উঠেছে। রোববার (২২ মার্চ) সকালে গলাচিপা উপজেলার গলাচিপা সদর ইউনিয়নের উত্তর চরখালী গ্রামে এমন ঘটনা ঘটে।
বিজ্ঞাপন
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, স্বামীহারা সেলিনা বেগম দীর্ঘ দিন ধরে গলাচিপা উপজেলার গলাচিপা সদর ইউনিয়নের উত্তর চরখালী গ্রামে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়িবাঁধে ছেলে ও ছেলের স্ত্রীকে নিয়ে বসবাস করে আসছিলেন। সম্প্রতি বেড়িবাঁধ সংস্কার কাজের জন্য তাদের উচ্ছেদ করা হয়। এমতাবস্থায় তারা পাশে একটি ঝুপড়ি ঘর তৈরি করেছেন।
কয়েক দিন আগে পাশের বাড়ির আল আলমগীর মাস্টারের ঘরের সামনের বারান্দায় শুধুমাত্র রাতে ঘুমানোর জন্য তাদের আশ্রয় দেয়া হয়। গত মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) ওই ঘর থেকে আলমগীরের স্ত্রীর ১২ আনা স্বর্ণ ও ৪ ভরি রূপার গহনা হারিয়ে গেছে বলে দাবি করা হয়। এ ঘটনায় আলমগীর মাস্টার ও তার পরিবারের লোকজন সেলিনা বেগমকে সন্দেহ করেন। এরপরে ওই দিন সন্ধ্যায় স্থানীয় লোকজন সিরাজুল সিকদারের বাড়িতে সালিশ বৈঠকের আয়োজন করে। অভিযোগ রয়েছে, সালিশ বৈঠকে শারীরিক, মানসিক নির্যাতন ও ভয়ভীতি দেখিয়ে চাল পড়া খাইয়ে সেলিনাকে চোর সাব্যস্ত করা হয়। এরপরে তার স্বীকারোক্তি নিয়ে একটি ৩শ টাকার স্ট্যাম্পে সেলিনা ও তার ছেলে এবং ছেলের স্ত্রীর স্বাক্ষর নেওয়া হয়। তখন চুরি হওয়া স্বর্ণ ও রূপার ক্ষতিপূরণ দেয়ার জন্য রোববার পর্যন্ত সময় বেধে দেয়া হয় সেলিনাকে। কিন্তু অভাবের সংসারে এত টাকা দেয়া সম্ভব ছিল না তার। তাই লজ্জা, অপমান ও চুরির অপবাদ সইতে না পেরে অতিরিক্ত পরিমাণ গ্যাসের ট্যাবলেট খেয়ে আত্মহত্যা করেন তিনি।
নিহত সেলিনার পুত্র ইফাজুল ইসলাম (২২) বলেন, 'সালিশ বৈঠকে জসিম খান, রিয়াজ খান, নেওয়াজ সিকদার, মিজান সিকদার, শামীম সিকদারসহ ৪-৫ জন আমার মাকে মারধর করে। এরপরে একটা রুমে নিয়ে বাইন্ধা প্লাস দিয়ে নখ উঠাইয়া ফালানোর ভয় দেখায়। তারপর চাল পড়া খাইয়ে স্বীকারোক্তি নিয়ে ৩শ টাকার স্ট্যাম্পে আমাগো স্বাক্ষর নেয়। এরপর আমার মাকে হুমকি দিচ্ছিল, এই স্বর্ণের টাকা না দিলে আমাকেও মারধর করবে, আমার পা কেটে ফেলবে। টাকা দেওয়ার তারিখ ছিল গতকাল। মা টাকা দিবে কোথা থেকে? এই কষ্ট সইতে না পেরে আমার মা মরে গেল।'
বিজ্ঞাপন
কান্না বিজরিত কন্ঠে ইফাজুল আরও বলেন, 'আমারে নিয়া অনেক কষ্ট করছে মা, শুনছি ছোটবেলায় টানা ৭ দিনও না খাইয়া রইছে। আজ ওদের এই অপবাদে সে দুনিয়া ছাইড়া গেল। আমি ওদের সবার বিচার চাই।'
নিহতের বোনের ছেলে মো. কবির গাজী বলেন, 'তারা ওখানকার প্রভাবশালী। তাদের বিরুদ্ধে কেউ কিছু বলতে পারে না। তাদের কারণে আজ আমার খালা মারা গেল।'
ওই এলাকার বাসিন্দা মোশারফ মুন্সি (৫৫) জানান, দীর্ঘদিন যাবৎ সেলিনা অন্যের বাড়িতে কাজকর্ম করে ছেলেকে নিয়ে সংসার পরিচালনা করত। কখনও শুনি বা দেখিনি সেলিনা চুরি করেছে।
বিজ্ঞাপন
নিহতের আরেক বোনের ছেলে মো. হাদিস বলেন, 'গরীব মানুষের সবচেয়ে বড় হচ্ছে মান-সম্মান। আমার খালা এই অপবাদ সইতে না পেরে আত্মহত্যা করছে।'
সালিশদার সিরাজুল সিকদার ৩শ টাকার স্ট্যাম্প রাখার কথা স্বীকার করে বলেন, সেলিনাকে কোনো নির্যাতন করা হয়নি।
চুরি হওয়া সোনার মালিক আলমগীর মাস্টার জানান, ১৭ মার্চ থেকে আমার স্ত্রীর কিছু গহনা হারিয়েছে। আমি স্থানীয় লোকজনকে চুরির বিষয় জানালে তারা সেলিনাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। সেলিনা চুরির বিষয় স্বীকার করে, আজকে চুরির মালামাল ফেরত দেওয়ার কথা ছিল।'
এ বিষয়ে গলাচিপা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. জিলন সিকদার বলেন, গতকালকে তিনি আত্মহত্যা করেছেন। খবর পেয়ে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পটুয়াখালী মর্গে পাঠানো হয়েছে। এ বিষয়ে একটি অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে। আইনগতভাবে যে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার, সে লক্ষ্যে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। '
সোহাইব মাকসুদ নুরনবী/এসএইচএ