গাইবান্ধার ব্র্যান্ডিং পণ্য লাল মরিচে শক্তিশালী অর্থনীতি

দেশের উত্তরের চরাঞ্চলে যখন শীতের শেষে রোদ পড়ে, তখন ব্রহ্মপুত্রের বুকে জেগে ওঠা বালুচরগুলো ধীরে ধীরে লাল রঙে রঙিন হয়ে ওঠে। দূর থেকে মনে হয় যেন বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে লাল কার্পেট বিছানো হয়েছে। কাছে গেলেই বোঝা যায়— সেটি আসলে গাইবান্ধার কৃষকদের ঘামে ফলানো টকটকে লাল মরিচের ক্ষেত। এই মরিচ এখন শুধু একটি ফসল নয়, এটি গাইবান্ধার কৃষি অর্থনীতির শক্ত ভিত এবং জেলার অন্যতম ব্র্যান্ডিং পণ্য।
বিজ্ঞাপন
গাইবান্ধাকে দেশব্যাপী পরিচিত করতে জেলা প্রশাসন তিনটি পণ্যকে সামনে এনেছে— রসমঞ্জুরী, চরাঞ্চলের ভুট্টা এবং মরিচ। শুধু তাই নয়, এই তিনটি পণ্যের সমন্বয়ে তৈরি হয়েছে জেলার পরিচিত স্লোগান—‘স্বাদে ভরা রসমঞ্জুরীর ঘ্রাণ, চরাঞ্চলের ভুট্টা-মরিচ গাইবান্ধার প্রাণ।’
স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে ২০১৮ সালে রসমঞ্জুরী, ভুট্টা ও মরিচকে জেলার ব্র্যান্ডিং পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয় সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর। এরপর থেকেই মরিচ চাষ, সংরক্ষণ ও বাজার ব্যবস্থার দিকে গুরুত্ব বাড়ে।
গাইবান্ধার কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে জেলায় প্রায় ১ হাজার ৯৫৬ হেক্টর জমিতে মরিচের চাষ হয়েছে। এর মধ্যে ফুলছড়িতে ৯২০ হেক্টর, সাঘাটায় ৪৯১, সুন্দরগঞ্জে ১২২, গোবিন্দগঞ্জে ১৪৫, সাদুল্লাপুরে ১৬৫, পলাশবাড়ীতে ৪৫ এবং সদরে ৬৮ হেক্টর জমিতে মরিচ চাষ হয়েছে। এই পরিমাণ জমি থেকে এ বছর ৫ হাজার ৪০৯ মেট্রিক টন মরিচ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে কৃষি বিভাগ।
বিজ্ঞাপন
জেলার সদর, সাঘাটা, সুন্দরগঞ্জ ও ফুলছড়ি উপজেলার ছোট-বড় ১৬৫টি চরসহ সাত উপজেলাতেই কম-বেশি আবাদ হয় মরিচের।। তবে নদীবেষ্টিত ফুলছড়ি উপজেলার বিস্তীর্ণ চরগুলোতেই সবচেয়ে বেশি চাষ হয়।
চরের মাঠে, মরিচ রাজ্য
ফুলছড়ি উপজেলার পুরাতন চরগুলোর মধ্যে একটি চর ফজলুপুর ইউনিয়নের খাটিয়ামারি। চরটি মরিচ উৎপাদনের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। সরেজমিনে ফুলছড়ি উপজেলার ফজলুপুর ইউনিয়নের খাটিয়ামারি, নিশ্চিতপুর, বাজে তেলকুপি, তালতলা, কাউয়া বাজার ও বুলবুলির এবং উরিয়া ইউনিয়নের রতনপুর ও কাবিলপুর ঘুরে দেখা যায়, ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নদীর মাঝখানে জেগে ওঠা বিস্তীর্ণ চরজুড়ে যেন রঙের উৎসব। দিগন্তজোড়া মাঠে সারি সারি গাছের ফাঁকে ঝুলছে লাল, সবুজ আর হলুদ মরিচ। কোথাও কাঁচা, কোথাও আধাপাকা, আবার কোথাও টকটকে লাল মরিচে ভরে আছে গাছ। দূর থেকে তাকালে মনে হয় যেন সবুজ মাঠের বুক জুড়ে ছড়িয়ে আছে আগুনরঙা বিন্দু।
বিজ্ঞাপন
তবে মাঠজুড়ে সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে পাকা মরিচ তোলার ব্যস্ততা। কৃষকরা এখন মৌসুমের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় পার করছেন। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত কেউ ঝুড়ি হাতে, কেউ বস্তা নিয়ে মরিচ তুলতে ব্যস্ত। প্রায় প্রতিটি ক্ষেতেই নারী শ্রমিকদের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। কোথাও গৃহস্থ কৃষক পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে মরিচ তুলছেন, আবার কোথাও কেবল নারী শ্রমিকরাই দল বেঁধে গাছ থেকে মরিচ সংগ্রহ করছেন।
এই চরে পা রাখলেই চারদিকে শুধু মরিচ আর মরিচের দৃশ্য। ক্ষেত থেকে তোলা পাকা মরিচ কেউ বস্তায় ভরে বাড়ির পথে নিচ্ছেন, কেউ আবার ঝুড়িতে সাজিয়ে রাখছেন। এরপর শুরু হয় শুকানোর পালা। নদীর কোলঘেঁষা বালুচর, বাড়ির উঠান, পুকুরপাড়, খোলা মাঠ কিংবা মিলের চাতাল—যেখানে রোদ পাওয়া যায়, সেখানেই বিছিয়ে দেওয়া হয়েছে টকটকে লাল মরিচ।

রোদে শুকাতে দেওয়া মরিচের সেই লাল আভা পুরো চরজুড়ে যেন তৈরি করেছে এক ভিন্ন আবহ— যেখানে কৃষকের পরিশ্রম আর প্রকৃতির রঙ মিশে গড়ে উঠেছে গাইবান্ধার মরিচ অর্থনীতির এক জীবন্ত ছবি।
এ সময় স্থানীয় কৃষকরা জানান, শীতের শেষের দিকে শুরু হয় মরিচ চাষের প্রস্তুতি। জমি তৈরি, বীজ বপন কিংবা চারা রোপণ— সব মিলিয়ে কৃষকদের ব্যস্ততা বাড়তে থাকে। প্রায় চার থেকে পাঁচ মাসের পরিচর্যার পর মাঠজুড়ে দেখা দেয় টকটকে লাল মরিচ।
চরের কৃষক ফুল মিয়া বলেন, আমাদের বিঘা প্রতি মরিচ উৎপাদনে হাল, সার, বীজ, কীটনাশক ও শ্রমিকসহ খরচ হয় ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা। আর আবহাওয়া অনূকূল থাকলে প্রতি বিঘা ১০ থেকে ১৪ মণ মরিচ উৎপাদন সম্ভব হয়। এই মরিচেই আমাদের সংসার চলে।
চরের কৃষক হযরত আলী বলেন, এবার মরিচ অনেক ভালো হয়েছে, আবহাওয়া ভালো ছিলো। আমি আমার নিজের পরিবারের সদস্য মা আর স্ত্রীকে নিয়ে ক্ষেত থেকে মরিচ তুলছি। আমাদের মতো কৃষকরা পরিবারের সবাই মিলে কাজ করি। এই মরিচই আমাদের রুটি-রুজি।
নৌকা আর ঘোড়ার গাড়িতে মরিচের হাটে
মরিচসহ চরাঞ্চলের উৎপাদিত পণ্য বেচা-কেনা হয় ফুলছড়ি হাটে। ফুলছড়ি উপজেলার গজারিয়া ইউনিয়নের পুরাতন হেডকোয়ার্টার এলাকায় বসে ঐতিহ্যবাহী এই ফুলছড়ি মরিচের হাট। সপ্তাহে শনিবার ও মঙ্গলবার এই দুই দিন হাট বসে। হাটবার সকালে ব্রহ্মপুত্র নদীর ঘাটে দেখা যায় ব্যস্ততা। একের পর এক নৌকা ভিড়তে থাকে ঘাটে। প্রতিটি নৌকায় বোঝাই থাকে সাদা বস্তায় ভরা শুকনা মরিচ। নৌকা থেকে নেমে কেউ মাথায় করে, কেউ বা ঘোড়ার গাড়িতে করে মরিচ নিয়ে ছুটে চলেন হাটের দিকে।
চরের কৃষক রইচ উদ্দিন বলেন, চরে মরিচের এটিই প্রধান হাট। অল্প মরিচ হলে মাথায় করে হেঁটে নিয়ে আসি। বেশি হলে চরের বাহন ঘোড়ার গাড়িতে। এখানেই সারা বছরের মরিচ বিক্রি করি। চলতি মৌসুমে মরিচের দাম নিয়ে খুশি কৃষকরা। এবার ভালো মানের মরিচ ১২ হাজার ৫০০ টাকা মনে বিক্রি হচ্ছে।
ফুলছড়ির মরিচের সুনামের কারণে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকারি ব্যবসায়ীরা এখানে আসেন। জামালপুর থেকে আসা পাইকারী ব্যবসায়ী সিরাজুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এই হাট থেকে মরিচ কিনছি। এখানকার মরিচের মান অত্যন্ত ভালো। এখান থেকে কিনে দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করি।
হাটের ইজারাদার অহিদুল ইসলাম জানান, এটি উত্তরাঞ্চলের অন্যতম বড় মরিচের হাট। প্রতি হাটবারে সোয়া কোটি থেকে দুই কোটি টাকার মরিচ বেচাকেনা হয়। এবারে মরিচের বাজার অনেক ভালো। মান ভেদে ১০ হাজার থেকে ১২হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত বেচাকেনা হচ্ছে।
সংরক্ষণাগার ও চরভিত্তিক বাজারের দাবি
মরিচ উৎপাদন বাড়লেও বিপণন ও সংরক্ষণ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক সময় কৃষকদের ন্যায্যমূল্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
চরাঞ্চলের কৃষকদের মতে, আধুনিক সংরক্ষণাগার বা গুদাম স্থাপন করা গেলে মরিচ দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। এতে মৌসুম শেষে বাজার পরিস্থিতি অনুকূলে এলে তারা ভালো দামে মরিচ বিক্রির সুযোগ পাবেন। পাশাপাশি চরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় ছোট ছোট সংগ্রহ কেন্দ্র বা চরভিত্তিক বাজার গড়ে তোলার দাবিও জোরালো হয়ে উঠেছে। চর থেকে মূল হাটে মরিচ নিয়ে যেতে অনেক সময় দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়, যা কৃষকদের জন্য কষ্টসাধ্য ও ব্যয়বহুল। বিশেষ করে শুকনা মৌসুমে চরের বিস্তীর্ণ বালুচর পার হয়ে মরিচ হাটে পৌঁছাতে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যায়। বর্ষায় নৌপথে যাতায়াত তুলনামূলক সহজ হলেও শুষ্ক মৌসুমে সেই সুবিধা থাকে না। ফলে মরিচ বাজারজাত করতে কৃষকদের অতিরিক্ত সময় ও খরচ গুনতে হয়।
গাইবান্ধা কৃষি বিভাগের উপ-পরিচালক সাদেকুল ইসলাম বলেন, কৃষকদের মরিচ উৎপাদনে সব ধরনের পরামর্শ দেওয়া হয়। গুনগত মানের কারণে দেশের মানুষের কাছে এবং দেশের নামি-দামি মসলা জাতীয় খাদ্য পণ্য উৎপাদনকারী কোম্পনিগুলোর কাছে এর বিশেষ চাহিদা রয়েছে। কৃষকদের উন্নয়নে চরাঞ্চলে ক্রয় কেন্দ্র ও পণ্য সংরক্ষণাগার নির্মাণের বিষয়টি নতুন সরকারকে অবগত করা হবে বলে জানান তিনি।
এ বিষয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) যাদব সরকার বলেন, কৃষক বাঁচলে, দেশ বাঁচবে। গাইবান্ধর চরাঞ্চলের কৃষকরা এ জেলার অর্থনীতির বড় একটি শক্তি। চরের ভুট্টা-মরিচ গাইবান্ধার ব্র্যান্ড। তাদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে খুব গুরুত্বের সাথে উচ্চপর্যায়ে জানানো হবে এবং যতটা সম্ভব পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
আরএআর