বিজয়ের উষালগ্নে ডুব সাঁতার দিয়ে গুলি থেকে প্রাণে বাঁচেন মনিরুজ্জামান মনি

১৯৭১ সালে সবে মাত্র কলেজে পা দিয়েছেন। উচ্চ শিক্ষা লাভের জন্য ভর্তি হন খুলনার বিশেষায়িত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আযম খান কমার্স কলেজে। একাত্তরের মার্চে অসহযোগ আন্দোলনের এক পর্যায়ে পাক বাহিনীর অত্যাচারে বাঙালি ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। পাকবাহিনীকে পরাস্ত এবং দেশমাতৃকার স্বাধীনতার জন্য তৎকালীন সময়ের শহরের যুবকেরা মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার প্রস্তুতি নেয়। শহর থেকে নৌপথে সাতক্ষীরার সীমান্ত অতিক্রম করে অবস্থান নেন ভারতের দেরাদুনের মুক্তিবাহিনীর প্রশিক্ষণ শিবিরে। প্রশিক্ষণ শেষে দেশে ফিরে খুলনার বিভিন্ন স্থানে যুদ্ধে অংশ নেন।
বিজ্ঞাপন
৫৪ বছর আগের যুদ্ধ জীবনের স্মৃতিচারণ করে বীর মুক্তিযোদ্ধা সাবেক মেয়র মনিরুজ্জামান মনি বলেন, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ ভয়াল কালরাতে অনেক মানুষ হত্যা করা হলো। তার পরের রাতে খুলনার সাউথ সেন্ট্রাল রোডে এক সঙ্গে সাতজন মানুষকে ব্রাশ ফায়ার করে হত্যা করা হলো। সারা দেশের মানুষের মধ্যে তখন একদিকে আতঙ্ক আরএকদিকে প্রতিরোধ করার যুদ্ধে তারা লিপ্ত হল। খুলনায়ও একই অবস্থা। আমরা মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহে গোলাম রসুল অ্যান্ড কোম্পানির বন্দুকের দোকান থেকে কিছু রাইফেল এবং গোলাবারুদ নিয়ে আসছিলাম। সেটিই আমাদের কাছে ছিল এবং এগুলো দিয়েই প্রতিরোধ শুরু করি। কার্যকর নেতৃত্ব দেন শেখ কামরুজ্জামান টুকু।
তিনি বলেন, প্রথমে খালিশপুর বৈকালি সিনেমা হলের ওখানে একটা প্রতিরোধ করার চেষ্টা করা হয়। তারপর পিকচার প্যালেস মোড়েও প্রতিরোধ করা হয়। যখন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর মূল কমান্ডার তার সঙ্গী-সাথিদের নিয়ে খুলনা সার্কিট হাউজে আসলে, সেখানে আক্রমণ হয়। খুলনা পুলিশ লাইনের অস্ত্রাগারেও আক্রমণ করা হয়। কিন্তু তখনও ততোটা সুসংগঠিত না। মাঠ পর্যায়ের যুদ্ধের অবস্থা সেইরকম ছিল না। সে কারণে পিছু হটতে হয়েছে। সে সময় যোদ্ধাদের সঙ্গে চলে গেলাম, আমার সেজো ভাই, ইমিডিয়েট বড় ভাই আগে চলে গেলেন। পাড়ার বন্ধুরা চলে যায়। আমি যাত্রা করি শেষের দিকে।
রণাঙ্গনের এই বীর সৈনিক বলেন, প্রথমে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে গিয়ে একটা ক্যাম্পে ছিলাম, রিক্রুটমেন্ট ক্যাম্প। পরবর্তীতে চলে গেলাম দেরাদুন মিলিটারি একাডেমিতে ট্রেনিং করার জন্য। সেখানে দেড় মাসের ট্রেনিং সম্পন্ন করে আবার আমরা বারাকপুর ক্যাম্পে ফিরে আসলাম। একদিন পরেই সেখান থেকে অস্ত্র, মাইনসহ যুদ্ধের সরঞ্জামাদি নিয়ে ফিরে আসলাম। আমাদের লক্ষ্য ছিল, দেশ স্বাধীন করে তার পরে বিশ্রাম। সেভাবেই বিভিন্ন রণাঙ্গনে পাক বাহিনী এবং তাদের দোসরদের সঙ্গে আমাদের লড়াই হয়েছে। সর্বশেষ ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর খুলনার বটিয়াঘাটার জলমায় এসে উপস্থিত হলাম। পরের দিন ১৫ তারিখে আক্রমণ করা হল। সেই সময়ের পাক বাহিনীর বড় ডিফেন্স ছিল বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয়, যেটা সেই সময়ে খুলনা বেতার কেন্দ্র ছিল। আমরা সেটাতে আক্রমণ করি। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল তাদেরকে পরাজিত করে ওই পথ দিয়েই খুলনা শহরে প্রবেশের। তবে ১৫ তারিখে ওটা সম্ভব হলো না। সন্ধ্যার পর আবার আমরা ফিরে গেলাম। ১৬ তারিখ ভোরে খুলনা বেতার কেন্দ্রের সামনে আবার উপস্থিত হলাম। সেখানে ব্যাপক লড়াই হল। সন্ধ্যার সময় জানতে পারলাম পাক বাহিনী স্যালেন্ডার করবে পরের দিন দুপুরে। এরপর ১৭ ডিসেম্বর আমরা লঞ্চে চড়ে খুলনা সার্কিট হাউজে আসলাম। দুপুর ১ টা ৫৫ মিনিটে খুলনা সার্কিট হাউজের হেলিপ্যাডে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার হায়াত খান আত্মসমর্পন করেন। ১৭ ডিসেম্বর খুলনা মুক্ত হয়।
বিজ্ঞাপন
যুদ্ধ ক্ষেত্রে সরাসরি অংশগ্রহণের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, পাকবাহিনীর কাছে অত্যাধুনিক অস্ত্র ছিল। আমার কাছে একটি অটো এসএলআর মেশিন ছিল, যেটা লাইট মেশিনগানের মতোই কাজ করে। সেটা দিয়েই লড়াই করছিলাম। এটা একটা দুর্দান্ত লড়াই ছিল। হলিউডে যেমন, যুদ্ধের সিনেমা তৈরি হয়, আমার যুদ্ধকালীন অভিজ্ঞতাটা প্রায় একই রকম।
তিনি বলেন, ১৫ ডিসেম্বর দুপুরের জোয়ারে বিলের ভেতরে উন্মুক্ত খালের পানি বৃদ্ধি পেল। তখন আমাদের পক্ষে শুকনো জায়গায় দাড়ানো সম্ভব হচ্ছিল না। খাল পার হচ্ছিলাম ডুব দিয়ে। তখন আমার বয়স অনুযায়ী ভারী অস্ত্র ছিল। ওটা নিয়েই আমাকে পার হতে হচ্ছিল। আমি ডুবে যাচ্ছিলাম। সহযোদ্ধা লেফট্যানেন্ট গাজী রহমতুল্লাহ বীর প্রতীক আমার পাশেই ছিলেন। তিনি একজন দক্ষ মেরিন কমান্ডো। তিনি আমাকে ডুব সাঁতার দিয়ে টেনে তুলেছিলেন। ডুব সাঁতার দিয়ে পার হওয়ার সময়ও পাশ দিয়ে মেশিনগানের গুলি যখন পানি ভেদ করে যায় এই দৃশ্যটা আমার ১৯৭১ সালেই দেখা আছে। ডুব সাঁতার দিয়ে প্রতিপক্ষের গুলি থেকে প্রাণে বাঁচি। যেটা পরবর্তীকালে আমরা সিনেমাতেও দেখেছি। আবার আমার পাশের সহযোদ্ধাদের গায়ে গুলি লাগছে, তারা আহত হচ্ছে। তাদেরকে উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়া এগুলো চলছে। ভয়াবহ অবস্থা ছিল। যুদ্ধের ময়দানের বিষয়গুলো সবসময় এইরকমই হয়।
মনিরুজ্জামান মনি বলেন, কপিলমুনি যুদ্ধে আমার সেজো ভাই গুলিবিদ্ধ হয়। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাকে আমরা তাৎক্ষণিক নৌকায় করে ভারতের বারাকপুর মিলিটারি হাসপাতালে চিকিৎসা করানোর জন্য নিয়ে যায়। এখানকার যুদ্ধে আমাদের এক সহযোদ্ধা আনোয়ার হোসেন আনু শহিদ হয়।
বিজ্ঞাপন
মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান মনি ১৯৯৪ সালে খুলনা সিটি করপোরেশনের ২৯নং ওয়ার্ডের কমিশনার (কাউন্সিলর) নির্বাচিত হয়েছিলেন। সেই থেকে জনপ্রতিনিধিত্বের দীর্ঘ পথচলায় আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। চারবার ভারপ্রাপ্ত মেয়র হন তিনি। ২০১৩ সালে বিপুল ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়ে মেয়রের চেয়ারে বসেন। ওই বছরের ২৬ নভেম্বর পুলিশের ওপর হামলা ও নাশকতার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় মনিকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়। তাই, ২০১৫ সালের ২ নভেম্বর স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। গত ২২ মার্চ তিনি খুলনা মহানগর দায়রা জজ আদালতে আত্মসমর্পণ করলে বিচারক জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠান। হাজতবাসের পর ১৮ এপ্রিল জামিনে মুক্ত হয়ে তিনি ফিরে আসেন মানুষের মাঝে।
এখনও মুক্তিযোদ্ধাদের সুখ-দুঃখের সাথী। ২০২৪ সালের অক্টোবরে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের খুলনা জেলা ইউনিটের আহ্বায়কের দায়িত্ব কাঁধে নেন। তার নেতৃত্বে ৫৪ বছর পর একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়ের সৃষ্টি হয় ২০২৫ সালের ১৭ ডিসেম্বর, শিল্পকলা একাডেমিতে বৃহত্তর খুলনার মুক্তিযোদ্ধাদের মিলন মেলা।
মনিরুজ্জামান মনি বলেন, যুদ্ধ ওই দিন শেষ হয়ে যায়নি। রাজনৈতিক লড়াইয়ের মধ্যদিয়ে এখনও চলছে। এটা চলবে, চলমান প্রক্রিয়া।
মোহাম্মদ মিলন/আরকে