‘আমার আর কিছুই নেই। আমার সবকিছু শেষ হয়ে গেছে।’- বাসডুবির ঘটনায় অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী, আদরের সন্তানকে হারিয়ে এভাবেই কান্নাজড়িত কণ্ঠে আর্তনাদ করছেন গার্মেন্টস কর্মী আব্দুল আজিজ।
বিজ্ঞাপন
আব্দুল আজিজের বাড়ি রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলার রতনদিয়া ইউনিয়নের মহেন্দ্রপুর গ্রামে। রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ঘাটে পদ্মা নদীতে বাসডুবির ঘটনায় তার ৬ মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী নাজমিরা ওরফে জেসমিন (৩০) ও একমাত্র ছেলে আবদুর রহমান (৬) নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় তার খালা শাশুড়ি নাসিমা বেগমও (৪০) নিহত হয়েছেন। গত ২৬ মার্চ দুপুরে জানাজা শেষে গ্রামের কবরস্থানে স্ত্রী ও ছেলেকে দাফন করেন আব্দুল আজিজ।
বাসডুবির সেদিনের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, ঈদের ছুটিতে গত ১৯ মার্চ স্ত্রী ও সন্তান নিয়ে বাড়িতে এসেছিলাম ঈদ করতে। ছুটি শেষে ২৯ মার্চ কর্মস্থলে যোগদান করার কথা ছিল। বুধবার (২৫ মার্চ) বিকেল ৩টার দিকে স্ত্রী-সন্তান ও খালা শাশুড়িকে নিয়ে গান্ধীমারা বাসস্ট্যান্ড থেকে সাভার গেন্ডা যাওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হই। বাস রাজবাড়ীর নতুন বাজার এসে মিনিট দুয়েক থেমে সেখান থেকে কিছু যাত্রী ওঠে। পরে বড়পুল এসে সেখানে স্টপেজ দিয়ে ৮/১০ জন যাত্রী ওঠে। পরে একটানে বাস ঘাটে চলে যায়। ঘাটের টার্মিনাল পাড় হয়ে ৮/১০ মিনিটের জ্যামে আটকে ছিল। যে চালক মারা গিয়েছে সেই বাস চালাচ্ছিল।
আব্দুল আজিজ বলেন, ফেরিতে ওঠার জন্য তাদের বাসটি সড়ক থেকে ফেরির পন্টুনের ঢালের সড়কে নেমে দাঁড়িয়ে ছিল। আমাদের সিট বাসের চালকের পেছনের ‘এ’ ও ‘বি’ লাইনে ছিল। দুর্ঘটনার আগে বাসের চালক ফোনে রাগান্বিতভাবে কার সঙ্গে যেন কথা বললেন। কেন তাকে এই ফেরিঘাটে দেওয়া হলো—এ নিয়ে উচ্চ স্বরে কথা বলছিলেন। এরপরই বাসে একটা জোরে ঝাঁকুনি লাগে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে বাসটি তীব্র গতিতে সামনের দিকে চলতে থাকে। একপর্যায়ে পানিতে গিয়ে অর্ধেক পড়ে। তিন-চার সেকেন্ডের মধ্যে বাসটি তলিয়ে যায়। ছেলে ছিটকে পড়ে। এ সময় সামনের সিটে থাকা স্ত্রীর হাতটা শক্ত করে ধরি। কিন্তু দুই সেকেন্ডের বেশি ধরে রাখতে পারিনি। আমি কীভাবে ভেসে উঠেছি, তা মনে নেই। পরে স্থানীয়দের সহযোগিতায় আমি পাড়ে উঠি। নিমেষেই চোখের সামনে স্ত্রী-সন্তান পানিতে তলিয়ে গেল।
বিজ্ঞাপন
আব্দুল আজিজ ঘটনার দিন সারা রাত দৌলতদিয়ায় পদ্মার পাড়েই ছিলেন। রাত ১২টার দিকে জানতে পারেন, স্ত্রীর লাশ পাওয়া গেছে। পরে হাসপাতালে গিয়ে লাশ শনাক্ত করেন। ঘটনার পরের দিন ভোরে এক পুলিশ সদস্য জানান, গেঞ্জি পরা, হাতে ঘড়ি পরিহিত একটি শিশুর লাশ পাওয়া গেছে। সেখানে গিয়ে তিনি তার ছেলের লাশ শনাক্ত করেন। স্ত্রী-সন্তানের লাশ নিয়ে সকালে বাড়িতে ফেরেন আব্দুল আজিজ।
এর আগে গত বুধবার (২৫ মার্চ) বিকেল সোয়া ৫টার দিকে গোয়ালন্দে দৌলতদিয়ার ৩নং ঘাটে ঢাকাগামী সৌহার্দ্য পরিবহনের যাত্রীবাহী বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পন্টুন থেকে পদ্মা নদীতে পড়ে যায়। কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসা বাসটিতে ৪৫ জনের মতো যাত্রী ছিলেন। এ ঘটনায় মোট ২৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
মীর সামসুজ্জামান সৌরভ/আরকে
