বিজ্ঞাপন

জ্বালানি তেল-গ্যাস ছাড়াই চলছে ফারুকের গাড়ি

অ+
অ-
জ্বালানি তেল-গ্যাস ছাড়াই চলছে ফারুকের গাড়ি

চারদিকে জ্বালানি তেলের সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। বেড়েছে গ্যাসের দামও। জ্বালানি তেল সংগ্রহে দেশের বিভিন্ন স্থানে গাড়ি চালকদের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। কেউ আবার তেল না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতে বিকল্প পথ খুঁজছেন সবাই। এরই মধ্যে সাতক্ষীরার শেখ ফারুক হোসেন (৫৫) জ্বালানি তেল বিহীন একটি গাড়ি তৈরি করে এলাকায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

ইতোমধ্যে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষজন তার বাড়িতে ভিড় জমাচ্ছেন গাড়িটি দেখতে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক, ইউটিউবসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে তার এই গাড়ির খবর ছড়িয়ে পড়ায় আগ্রহ বাড়ছে সাধারণ মানুষ, গণমাধ্যমকর্মী ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের।

শেখ ফারুক হোসেন সাতক্ষীরা সদর উপজেলার থানাঘাটা গ্রামের মৃত শেখ আলী আহমেদের ছেলে। শিক্ষাগত যোগ্যতা অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত। প্রাতিষ্ঠানিক কোনো প্রকৌশল ডিগ্রি না থাকলেও, ছোটবেলা থেকেই যন্ত্রপাতির প্রতি আগ্রহ থেকে নিজেই গড়ে তুলেছেন দক্ষতা।

তিনি জানান, ১৯৮০ সাল থেকে বিভিন্ন ধরনের মেকানিক্যাল ও উদ্ভাবনী কাজের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। দীর্ঘ এই অভিজ্ঞতা থেকেই একের পর এক নতুন কিছু তৈরির চেষ্টা করে যাচ্ছেন।

বিজ্ঞাপন

ফারুক হোসেন বলেন, প্রথমে আমি তুষ কাঠ তৈরি করি। এরপর পর্যায়ক্রমে ফিল্টার পানি তৈরি, ফার্নিচার, বজ্র পলিথিন দিয়ে পেট্রোল ও ডিজেল তৈরির কাজ করেছি। ২০২২ সালে তেল ও বিদ্যুৎ ছাড়াই চলবে এমন একটি ‘টাইগার বাইক’ তৈরি করি। এবার তেলবিহীন প্রাইভেট কার তৈরি করেছি।

তিনি বলেন, দূষণমুক্ত ও পরিবেশবান্ধব তেলবিহীন এই গাড়িটি ঘণ্টায় ৮০ থেকে ৯০ কিলোমিটার গতিতে চলাচল করতে পারে। গাড়িতে পাওয়ার সিস্টেম হিসেবে পাঁচটি ৬০ ভোল্টের ব্যাটারি ও একটি ৬০ ভোল্টের মোটর ব্যবহার করা হয়েছে। এর বাইরে মেকানিক্যাল বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ব্যবহার করে গাড়িটি চলাচলের উপযোগী করা হয়েছে।

শেখ ফারুক হোসেন বলেন, প্রথমে ব্যাটারি থেকে গাড়িটি পাওয়ার নিয়ে ইঞ্জিন চালু হবে। পরবর্তীতে ইঞ্জিনটি মোটরের সাহায্যে আবারো বিদ্যুৎ উৎপন্ন করে ওই ৬০ ভোল্টের ব্যাটারি অটোমেটিক চার্জ হতে থাকবে। গাড়িটি যতই চলবে ততোই ইঞ্জিন থেকে বিদ্যুৎ উৎপন্নের মাধ্যমে ব্যাটারি চার্জ হয়ে গাড়িটি নিজে নিজেই পাওয়ার উৎপন্ন করে চলতে থাকবে। এর জন্য বাড়তি কোনো খরচ হবে না। প্রাইভেট কারটিতে স্টিয়ারিং, গিয়ারসহ সব ধরনের মেকানিক্যাল প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। গাড়িটি নির্মাণ করতে প্রায় দুই মাস সময় লেগেছে। তবে এখন ৬ চাকার একটি গাড়ি তৈরি করতে ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা খরচ হবে। এতে চালকসহ পাঁচজন যাত্রী পরিবহন করা সম্ভব। শব্দবিহীন ও পরিবেশবান্ধব হওয়ায় যাত্রীরা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন।

বিজ্ঞাপন

গাড়িটি পরিদর্শনে এসে ইঞ্জিনিয়ার জাহিদুল হক বলেন, আমরা ফারুক হোসেন ভাইয়ের গাড়িটি সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখার পর তার বাড়িতে দেখতে এসেছি। আমার কাছে ভালো লাগলো তেল ছাড়া গাড়িটি চলে। একবার চার্জ দেওয়ার পর নিজে থেকে চার্জিং হয়ে নিজেই চলতে পারে। গাড়িটি আমরা চড়েছি, গাড়ির স্পিড ভালো আমাদের ভালো লেগেছে। আমরা আশা করি উনি আরও ডেভেলপ করবেন। এটা আমাদের দেশের জন্য অনেক ভালো ফল নিয়ে আসবে।

থানাঘাটা এলাকার মিজানুর রহমান বলেন, জ্বালানি তেল সংকটের সময়ে উনি যে গাড়িটা তৈরি করেছেন এটি এই মুহূর্তে মানুষের জন্য অনেক উপকার হবে। এর আগেও অনেক কিছু তিনি তৈরি করেছেন। তাকে যদি সরকার থেকে সহযোগিতা করা হয় তাহলে আরও ভালো কিছু তৈরি করতে পারবেন।

একই এলাকার হাফিজুর রহমান বলেন, গাড়িটা উনি নিজে নিজে আবিষ্কার করেছেন। এতে তেল লাগে না, বিদ্যুৎ লাগে না। গাড়িটি দেখতে অনেকে আসতেছেন। আমাদের কাছেও ভালো লেগেছে। আমাদের এলাকার একজন এমন কাজ করতে পেরেছেন এটা গর্বের। সরকার সহযোগিতা করলে আরও এগিয়ে যেতে পারবেন।

তার এ সাফল্যে খুশি স্থানীয়রা। তাদের মতে, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে এই প্রযুক্তি দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হলে জ্বালানি সংকট অনেকটাই কাটিয়ে ওঠা যাবে এবং দেশের মানুষ উপকৃত হবে।

সাতক্ষীরা সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা অর্ণব দত্ত বলেন, বিষয়টি ভালোভাবে জেনে তারপরে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সাতক্ষীরা কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের অটোমেটিক মেকানিক বিভাগের ইন্সট্রাক্টর মো. মেহেদী হাসান বলেন, বাইরের কোনো সোর্স ছাড়া ব্যাটারিতে চার্জ হওয়া বা গাড়ি চালানো কতটুকু সম্ভব সেটা নিয়ে গবেষণা করা দরকার। এটি অনেকটা ‘ফ্রি এনার্জি’র মতো শোনাচ্ছে। সুতরাং তার দাবির প্রেক্ষিতে বিষয়টি যাচাই-বাছাই করা প্রয়োজন।

ইব্রাহিম খলিল/আরএআর