সবুজে ঘেরা ধানক্ষেত, কাদামাটির পথ, পুকুরের স্বচ্ছ পানি আর সহজ-সরল মানুষের আন্তরিকতায় ভরপুর নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলার একদুয়ারিয়া গ্রাম এখন বিদেশি পর্যটকদের কাছে এক অনন্য গন্তব্যে পরিণত হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
গত তিন বছরে এই গ্রামে শতাধিক বিদেশি পর্যটকের আগমন ঘটেছে। শহুরে ব্যস্ততা ও আধুনিক জীবনের কোলাহল থেকে দূরে এসে তারা উপভোগ করছেন সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী গ্রামীণ জীবন। স্থানীয়দের সঙ্গে মিশে যাওয়া, ধানক্ষেত ঘুরে দেখা, গরুর দুধ দোহন, পুকুরে মাছ ধরা, ক্যারাম খেলা কিংবা কাদামাটিতে সময় কাটানো এসব অভিজ্ঞতা তাদের কাছে নতুন ও রোমাঞ্চকর।
এই উদ্যোগের উদ্যোক্তা স্থানীয় যুবক জাফর তুহিন। ২০২২ সাল থেকে তিনি বিদেশিদের জন্য গ্রামভিত্তিক ভ্রমণ প্যাকেজ চালু করেন। তার প্রচেষ্টায় একদুয়ারিয়া গ্রাম ধীরে ধীরে বিদেশি পর্যটকদের কাছে পরিচিতি পাচ্ছে। অনেক পর্যটক অভিজ্ঞতায় মুগ্ধ হয়ে পুনরায় এখানে ফিরে আসছেন।

সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের দম্পতি টাজ ও লিব্বি গ্রামটিতে এসে কয়েকদিন অবস্থান করেন। তারা স্থানীয় জীবনযাত্রার সঙ্গে মিশে গিয়ে গরুর দুধ দোহন, মাছ ধরা, রান্না শেখা ও শিশুদের সঙ্গে খেলাধুলাসহ নানা অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের শেয়ার করা ভিডিও ও ব্লগে উঠে এসেছে গ্রামবাংলার বাস্তব চিত্র।
বিজ্ঞাপন
ভাষাগত সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও তারা ইশারা-ইঙ্গিতের মাধ্যমে স্থানীয়দের সঙ্গে সহজেই যোগাযোগ করছেন। বিকেলে গ্রাম ঘুরে বেড়ানো, স্থানীয়দের সঙ্গে ফুটবল খেলা, চায়ের দোকানে আড্ডা কিংবা টেলিভিশন দেখা সবকিছুই তাদের কাছে নতুন অভিজ্ঞতা হয়ে উঠেছে।
অতিথিদের জন্য জাফর তুহিন তার বাড়ির দ্বিতীয় তলায় থাকার ব্যবস্থা করেছেন এবং নিজেই ট্যুর গাইড হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। নির্ধারিত প্যাকেজ অনুযায়ী তিন দিন চার রাতের জন্য ভাড়া ৪০০ মার্কিন ডলার, অতিরিক্ত সময় থাকলে অতিরিক্ত খরচ প্রযোজ্য।
পর্যটক লিব্বি বলেন, বাংলাদেশের মানুষ অত্যন্ত অতিথিপরায়ণ। এখানকার মানুষের ব্যবহার আমাকে মুগ্ধ করেছে। অল্প সময়েই আমি ডিম ভাজি ও রুটি বানানো শিখেছি।
বিজ্ঞাপন
খাবারের বিষয়ে তিনি জানান, শুরুতে মসলাযুক্ত খাবারে কিছুটা সমস্যা হলেও ধীরে ধীরে তিনি অভ্যস্ত হয়ে উঠছেন।
তার স্বামী টাজ বলেন, আমি এখন লুঙ্গি পরতে শিখেছি। লুঙ্গি পরেই গ্রামে ঘুরে বেড়াচ্ছি। আমরা আগে একবার এসেছিলাম, সুযোগ পেলে আবারও আসব।
জাফর তুহিনের এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছে ভ্রমণপ্রীতি ও দীর্ঘ অভিজ্ঞতা। তিনি ২০০৫ সালে ঢাকায় গিয়ে সরকারি তিতুমীর কলেজে গণিতে ভর্তি হন। পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশনি করে জীবিকা নির্বাহ করেন এবং সুযোগ পেলেই দেশের বিভিন্ন পর্যটনস্থানে ভ্রমণ করতেন। পরে ‘নিশিদল’ নামে একটি ভ্রমণপ্রেমী সংগঠন গঠন করেন। একটি আন্তর্জাতিক রেস্তোরাঁয় কাজ করার সময় এক মার্কিন পর্যটকের মাধ্যমে ‘কাউচসার্ফিং’ প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হয়ে বিদেশি পর্যটকদের আতিথ্য দেওয়ার অভিজ্ঞতা অর্জন করেন।

করোনাকালে গ্রামে ফিরে এসে সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি এই উদ্যোগ শুরু করেন। বর্তমানে তার ‘তাঁবু ট্যুর’ নামে একটি ভ্রমণপ্রতিষ্ঠান রয়েছে, যা আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম ট্রিপঅ্যাডভাইজার ও এয়ারবিএনবির সঙ্গে যুক্ত। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, চীনসহ বিভিন্ন দেশ থেকে পর্যটকেরা তার মাধ্যমে একদুয়ারিয়া গ্রামে আসছেন।
স্থানীয় বাসিন্দারাও বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন। গ্রামের বাসিন্দা হিমেল বলেন, আগে কখনো বিদেশি পর্যটক দেখেননি তারা। এখন তাদের আগমনে গ্রামে নতুন আনন্দের পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
একদুয়ারিয়া গ্রাম এখন শুধু একটি গ্রাম নয় বরং গ্রামীণ জীবন, সংস্কৃতি ও আতিথেয়তার এক জীবন্ত অভিজ্ঞতা হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে। আর এই অনন্য অভিজ্ঞতার টানেই দিন দিন বিদেশি পর্যটকদের ভিড় বাড়ছে।
আরএআর
