কুষ্টিয়ার মিরপুরে তেল পাম্পে জ্বালানি তেল নেওয়াকে কেন্দ্র করে উপজেলা প্রশাসন ও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মধ্যকার টানাপোড়েনে প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন ছিল পুরো এলাকা। কোনো আগাম ঘোষণা ছাড়াই দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ বন্ধ থাকায় চরম ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ মানুষ ও সেবাগ্রহীতারা।
বিজ্ঞাপন
তেল না পাওয়ায় গোটা উপজেলা বিদ্যুৎহীন করার অভিযোগ উঠেছে। উপজেলা বিদ্যুৎহীন হওয়ায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা থমকে যায়। কৃষি অধ্যুষিত উপজেলার সেচ, ছোট ছোট শিল্পকারখানা, ব্যবসা বাণিজ্য ব্যাংক কার্যক্রম সব কিছু থমকে পড়ে বলে অভিযোগ উপজেলার পল্লীবিদ্যুৎ গ্রাহকদের।
জানা গেছে, গতকাল বুধবার রাতে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে মিরপুর উপজেলাধীন পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির দুটি সাব-স্টেশনের ১৫টি ফিডারের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত লাইনগুলো মেরামতের জন্য বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) সকালে পল্লী বিদ্যুতের কর্মীরা স্থানীয় মল্লিক তেল পাম্পে মোটরসাইকেলে তেল নিতে যান। এ সময় মিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আরাফাত আমান আজিজ সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তিনি পল্লী বিদ্যুতের কর্মীদের লাইনে দাঁড়িয়ে তেল নিতে বলেন। কিন্তু জরুরি পরিষেবার দোহাই দিয়ে কর্মীরা দ্রুত তেল নিতে চাইলে বাগবিতণ্ডার সৃষ্টি হয়।
অভিযোগ উঠেছে, দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়েও তেল না পাওয়ায় বিদ্যুৎ মেরামতের জরুরি কাজ ব্যাহত হয় এবং ক্ষোভে বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ রাখা হয়।
কুষ্টিয়া পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি মিরপুর অঞ্চলের জুনিয়র ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল বলেন, গতরাতের বৈরি আবহাওয়া ও বজ্রপাতের ঘটনায় প্রায় দেড় শতাধিক গ্রাহকের অভিযোগ পড়ে। ফলে রাত থেকেই বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ ছিল। বৃহস্পতিবার সকালে আমরা আমাদের সকল লাইনম্যানদের কাজ বুঝিয়ে দিয়ে মিরপুর মল্লিক তেল পাম্পে ৪টি মোটরসাইকেলে তেল নিতে যাই। সেখানে গিয়ে প্রায় সহস্রাধিক মানুষের দীর্ঘলাইন দেখে বিষয়টি আমার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করি এবং ওই পাম্পে উপস্থিত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে অনুরোধ করতে বলি যাতে জরুরি বিবেচনায় স্বল্প সময়ের মধ্যে আমরা তেল নিয়ে কাজে যেতে পারি। পরে আমরা ইউএনও স্যারকে গিয়ে অনুরোধ করি বিষয়টি বিবেচনা করতে। কিন্তু উনি আমাদের অনুরোধ তো শোনেন নাই, আরও আমাদের সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন এবং আমাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে হুমকি দেন। এই অবস্থায় আমরা তেল না পেয়ে আমাদের উপকেন্দ্রে ফিরে আসি।
বিজ্ঞাপন
সকাল ৯টা থেকে টানা সাড়ে চার ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় পুরো উপজেলা স্থবির হয়ে পড়ে। মিরপুর উপজেলা পাড়ার বাসিন্দা সবুজ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, কোনো ঘোষণা ছাড়াই সকাল থেকে বিদ্যুৎ নেই। বাড়িতে পানি তুলতে পারছি না, রান্নাবান্নাসহ সব কাজে চরম ভোগান্তি হচ্ছে।
বিদ্যুৎবিহীন একই চিত্র সরকারি অফিসগুলোতে। মিরপুর পৌর এলাকার সুলতানপুর থেকে জমির নামজারি করতে আসা রফিকুল ইসলাম জোয়ার্দার জানান, সকাল থেকে বসে আছি। বিদ্যুৎ না থাকায় অনলাইনে ফরম পূরণ বা টাকা জমা দিতে পারছি না। আজ বৃহস্পতিবার, সপ্তাহ শেষ। এখন আবার রোববার পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। সাধারণ মানুষের এই কষ্টের দায় কে নেবে?
মিরপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ডিজিএম) আরিফুল হক বলেন, ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত লাইন মেরামতে আমাদের কর্মীরা রাত থেকেই কাজ করছিল। সকালে নতুন কিছু ত্রুটি দেখা দিলে দ্রুত যাতায়াতের জন্য কর্মীদের তেল প্রয়োজন হয়। আমি নিজে ইউএনও মহোদয়কে অনুরোধ করেছিলাম যেন জরুরি বিবেচনায় আমাদের দ্রুত তেল দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু আমরা কোনো সহযোগিতা পাইনি। তেল পেতে দেরি হওয়ায় লাইন চেক করে চালু করতেও বিলম্ব হয়েছে। তারপরও আমি নিজে আমার স্টাফদের ভ্যানে করে অভিযোগ আসা বিভিন্ন লাইন মেরামতের জন্য পাঠিয়েছিলাম। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জরুরি বিবেচনায় আমার স্টাফদের তেল দিতে পারতেন। পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সাথে কথা বলে বিষয়টি সমাধান করা হয়েছে।
বিদ্যুৎ না থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করে মিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আরাফাত আমান আজিজ বলেছেন, ঝড়ের কারণে বিদ্যুৎ লাইনে কিছুটা ফল্ট হয়েছিলো। আমাদের পল্লী বিদ্যুতের যারা লাইন ঠিক করতে যাবেন তারা তেল পেতে বিলম্ব হওয়ার কারণে তারা লাইন ঠিক করতে পারেনি। সেই কারণে বিদ্যুৎ বন্ধ ছিল।
বিজ্ঞাপন
পল্লী বিদ্যুৎ কর্মীদের জরুরিভাবে তেল নিতে বাধা ও মামলার হুমকির দেওয়ায় বিষয়ে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়টি জানালে তিনি বলেন, তেল পাম্পে আলাদা জরুরি সেবার সার্ভিস ব্যবস্থা ছিল না, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতি হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেওয়া তাদের লাইনে তেল নিতে বলা হয়েছিল। তবে তারা কি কারণে বিদ্যুৎ বন্ধ রেখেছিল জানি না। তবে অফিসে আসার পর জানলাম বিদ্যুৎ নেই। পরে পল্লী বিদ্যুতের ডিজিএমের সাথে কথা বলে বিষয়টির সমাধান করা হয়েছে। এখন বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে।
এ বিষয়ে মুঠোফোনে কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসক তৌহিদ বিন-হাসান বলেন, বিষয়টি আমি শুনেছি। এটা দেখার জন্য অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রবিউল আলম ইভান/আরএআর
