বিজ্ঞাপন

লেবাননে নিহত দিপালীর বোনের আহাজারি

‘আমার বোন না জানি কত কষ্ট নিয়া মরছেরে'

অ+
অ-
‘আমার বোন না জানি কত কষ্ট নিয়া মরছেরে'

‘আমার বয়স যখন ১০-১২ বছর, তখন আমার বড় বোনটা বিদাশ চইলা যায়। যখন বড় হইলাম বোনটারে কাছে পাইলাম না। আল্লায় জানে যুদ্ধের বোমায় আমার বোন না জানি কত কষ্ট নিয়া মরছেরে, আল্লাহ।’

বিজ্ঞাপন

কাঁদতে কাঁদতে কথাগুলো বলছিলেন লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় নিহত নারী শ্রমিক দিপালী বেগমের (৩৪) ছোট বোন লাইজু বেগম (২৪)। 

ফরিদপুরের চরভদ্রাসন উপজেলার পূর্ব শালেপুর মুন্সিরচর গ্রামের মেয়ে দিপালী বেগম। বাবা শেখ মোকা একজন দিনমজুর। তার কোনো কৃষিজমি নেই। মা রাজিয়া বেগম মারা গেছেন অন্তত আট বছর আগে। বাড়ির ভিটার জন্যও এক বিন্দু জমি নেই এই অসহায় দরিদ্র পরিবারের। সরকারি খাসজমিতে কোনোভাবে মাথা গোঁজার জায়গা করে পড়ে রয়েছে পরিবারটি। তিন বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় শেফালী, এরপর দিপালী, তারপর দুই ভাই ওবায়দুর ও সিকেন্দার এবং সবার শেষে লাইজু।

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, ১৫ বছর আগে ২০১১ সালে সংসারের দারিদ্র্য ঘোচাতে জীবিকার তাগিদে প্রথম লেবানন যান দিপালী। ওই সময় তার বয়স ছিল মাত্র ১৯। দিনের পর দিন বিদেশে থেকে টাকা পাঠাতেন দেশে। সেই টাকা দিয়ে দুটি ভাঙা ছাপড়া থেকে তোলা হয় দুটি চারচালা টিনের ঘর। তিনি বাদে একে একে সব ভাইবোনের বিয়ে হয়ে যায়। বিয়েতে আর্থিকভাবে সাহায্য করেন দিপালী। একে একে সব ভাইবোনের বিয়ে হয়ে গেলেও নিজের বিয়ের কথা ভাবেননি দিপালী। প্রতি মাসে বাড়িতে খরচের জন্য লেবানন থেকে টাকা পাঠাতেন তিনি। এভাবে আস্তে আস্তে বদলে যায় সংসারের চেহারা।

বিজ্ঞাপন

শৈশবে অভাবের কারণে স্কুলের দুয়ারে পা রাখা হয়নি দিপালীর। যে বয়সে হাতে বই-খাতা থাকার কথা, সেই বয়সেই কাঁধে চেপেছিল সংসারের বোঝা। নিজের সুখ-আহ্লাদ বিসর্জন দিয়ে পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে পাড়ি জমিয়েছিলেন সুদূর লেবাননে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের তপ্ত যুদ্ধের আগুন কেড়ে নিল অদম্য সেই স্বপ্নচারী নারীকে। বৈরুতে বোমা হামলায় দিপালী বেগমের এমন করুণ মৃত্যুতে এখন শোকে পাথর ফরিদপুরের চরভদ্রাসন উপজেলার পূর্ব শালেপুর মুন্সিরচর গ্রাম।

২০১১ সালে যখন দিপালী প্রথম জীবিকার তাগিদে লেবানন যান, তখন ছোট বোন লাইজু বেগমের বয়স ছিল মাত্র ১০-১২ বছর। বড় বোনের সঙ্গে কাটানো সেই শৈশবের স্মৃতি মনে করে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন লাইজু।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে লাইজু বলেন, ‘আমার আপা হাসতো ভালো। কথায় কথায় হাসতো। কত কথা কইতো আমারে ইমোতে। আমি যখন ছোট তখন আমাগো অভাব ছিল বেশি। আমার এই আপা কইতো আমি বিদেশ গেলি তোর আর অভাব থাকবি না। তোরে আমি দেখবো। সেই আপা আমাগো সবাইরে দেখছে, সংসার চালাইছে। আল্লাহ তারে আইজা নিয়া গেলো’।

বিজ্ঞাপন

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘ সময় প্রবাস জীবনে থেকেও দিপালীর মন পড়ে থাকতো দেশের বাড়িতে। ২০২০ এবং ২০২৩ সালে দুইবার দেশে এলেও শেষবার তার ফিরে যাওয়া ছিল কিছুটা অভিমানের। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে যখন তিনি দেশে আসেন, পরিবার তাকে বিয়ে দেওয়ার জন্য পাত্র ঠিক করেছিল। কিন্তু বিয়ে না করে ২০২৪ সালের এপ্রিলে তিনি লেবাননে চলে যান। 

গত ৮ এপ্রিল বৈরুতের যে ভবনে দিপালী কর্মরত ছিলেন সেখানেই আঘাত হানে ইজরায়েলের বোমা। গুরুতর আহত হন তিনি। পরে বৈরুতের রফিক হারিরি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। অথচ ওইদিন সকালেই আদরের ছোট বোন লাইজুর সঙ্গে শেষবারের মতো ইমোতে কথা হয়েছিল দিপালীর।

সেই কথা মনে করে লাইজু বলেন, যুদ্ধের ভয়াবহতা বাড়লে মালিকের পরিবারের সঙ্গে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে বৈরুতে গিয়েছিলেন দিপালী। কিন্তু নিয়তি তাকে সেই নিরাপদ আশ্রয়েও শান্তিতে থাকতে দিল না।

দীর্ঘ প্রবাস জীবনে যে বোনটি ইমোতে কথা বলে পরিবারের একাকিত্ব দূর করতেন, আজ তার নিথর দেহ বিদেশের হাসপাতালের হিমঘরে পড়ে আছে। বাড়িতে এখন শুধু দিপালীর পাঠানো পুরোনো কাপড় আর স্মৃতির স্তূপ। শোকাহত পরিবারের এখন একটাই আকুতি— সংসারের জন্য জীবন বিলিয়ে দেওয়া মেয়েটির মুখটি যেন শেষবারের মতো একবার দেখতে পারেন।

চরহরিরামপুর ইউনিয়ন পরিষদের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য শেখ ফালু বলেন, চরাঞ্চলের অতি গরিব পরিবারের মেয়ে ছিল দিপালী। ওর টাকায় সংসার চলতো। বৃদ্ধ বাবাও ওর টাকার ওপর নির্ভরশীল ছিল। হঠাৎ যে কি থেকে কি হয়ে গেল। এ ঘটনায় ওই পরিবারটির পাশাপাশি গ্রামবাসীও শোকাহত।

জহির হোসেন/আরএআর