লালমনিরহাটের প্রত্যন্ত গ্রামের মাদরাসাছাত্র মোহাম্মদ আসিফ ইসলাম কুরআন তেলাওয়াত প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছে। রাজধানীর ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজে (ডিআরএমসি) আয়োজিত ‘৩য় ডিআরএমসি জাতীয় ইসলামি সাংস্কৃতিক উৎসব-২০২৬’- এ সারা দেশের প্রতিযোগীদের পেছনে ফেলে কুরআন তেলাওয়াতে প্রথম স্থান অধিকার করেছে সে।
বিজ্ঞাপন
শনিবার (১১ এপ্রিল) সমাপনী দিনে প্রখ্যাত ইসলামিক স্কলার ড. মিজানুর রহমান আজহারী ও জাতীয় সংসদের হুইপ মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপুর হাত থেকে যখন আসিফ পুরস্কার গ্রহণ করছিল, তখন লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার কাকিনা ইউনিয়নের রুদ্রেশ্বর গ্রামে বইছিল আনন্দের বন্যা।
আসিফের এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে এক দীর্ঘ দীর্ঘশ্বাস ও কষ্টের পথ। জন্মের পরপরই তার বাবা তার মাকে ফেলে চলে যান। বাবার ছায়া ছাড়াই বড় হতে থাকা আসিফকে পরে তার নানি তুষভান্ডার ইউনিয়নের আমিনগঞ্জ গ্রামে নিজের কাছে রেখে লালন-পালন করেন। দারিদ্র্য আর অনিশ্চয়তার মাঝে যখন আসিফের শৈশব কাটছিল, ঠিক তখনই হাজী রেফাজ উদ্দিন শহীদ মোল্লা হাফেজী মাদ্রাসা ও এতিমখানার বিজ্ঞাপন দেখে তাকে সেখানে ভর্তি করা হয়। সেই এতিমখানাই আজ তাকে বিশ্বজয়ের স্বপ্ন দেখাচ্ছে।
ইঞ্জিনিয়ার মেজবা উদ্দিন বিপ্লব। পেশায় প্রকৌশলী হলেও নেশা তার সমাজসেবা। নিজ এলাকায় দ্বীনি শিক্ষা ছড়িয়ে দিতে গড়ে তুলেছিলেন এই প্রতিষ্ঠান। কিন্তু আলোর এই পথ চলা মসৃণ ছিল না। প্রতিষ্ঠার শুরুতেই স্থানীয়ভাবে নানা ষড়যন্ত্রের জাল বোনা হয়, তৈরি করা হয় কৃত্রিম সংকট।
বিজ্ঞাপন
বিপ্লব বলেন, প্রতিষ্ঠানটি করার সময় আমাকে অনেক কথা শুনতে হয়েছে, অনেক বাধা টপকাতে হয়েছে। কখনো কখনো মনে হয়েছে এই প্রতিকূলতা হয়তো জয় করা সম্ভব হবে না। তিস্তার কোরে যখন এটি করি, তখন কেউ মেনে নিতে রাজি হননি। কিন্তু আজ আসিফের এই অর্জন আমার সব কষ্ট ভুলিয়ে দিয়েছে। এই অর্জন প্রমাণ করেছে যে, উদ্দেশ্য যদি সৎ থাকে তবে ষড়যন্ত্র দিয়ে কারো পথ রুদ্ধ করা যায় না।
আসিফ বর্তমানে এই মাদরাসায় ১৫ পারা হিফজ সম্পন্ন করার পাশাপাশি ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ছে। সাফল্যের শিখরে দাঁড়িয়েও সে ভুলে যায়নি তার পেছনের কারিগরকে। মুঠোফোনে আসিফ বলে, আমাদের মাদরাসাটি যদি মেজবা উদ্দিন বিপ্লব স্যার অনেক লড়াই করে গড়ে না দিতেন, তবে আজ আমি ঢাকার এই বড় মঞ্চে দাঁড়াতে পারতাম না। অনেক কষ্ট করে তিনি আমাদের পড়ার সুযোগ করে দিয়েছেন। এই পুরস্কার আমি আমার সেই শিক্ষক এবং বিপ্লব স্যারকেই উৎসর্গ করলাম।
বিজ্ঞাপন
‘হাইয়্যা আলাল ফালাহ’ (এসো কল্যাণের পথে) স্লোগানে আয়োজিত এই উৎসবে দেশের শতাধিক খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠানের প্রায় দুই সহস্রাধিক শিক্ষার্থী অংশ নেয়। ৩২টি ভিন্ন ভিন্ন ক্যাটাগরির এই বিশাল আয়োজনে লালমনিরহাটের একটি মাদরাসার এই জয় পুরো জেলার জন্য এক বড় প্রাপ্তি।
ডিআরএমসির অধ্যক্ষ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ড. মোহাম্মদ জাবের হোসেনের তত্ত্বাবধানে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ড. মিজানুর রহমান আজহারী বিজয়ীদের ভূয়সী প্রশংসা করেন।
ইঞ্জিনিয়ার মেজবা উদ্দিন বিপ্লব বিশ্বাস বলেন, আসিফের এই সাফল্য অবহেলিত জনপদের হাজারো পিতৃহীন ও ভাগ্যবিড়ম্বিত শিক্ষার্থীর জন্য এক অনুপ্রেরণা। ষড়যন্ত্রকে জয় করে মানবিক শিক্ষায় শিক্ষিত এক প্রজন্ম গড়ার যে শপথ নিয়েছিলাম, আসিফের এই অর্জন সেই যাত্রায় এক নতুন মাত্রা যোগ করল।
আরএআর
