বিজ্ঞাপন

উত্তরের অর্থনীতি ও মানুষের ভাগ্য বদলে দিচ্ছে মওলানা ভাসানী সেতু

অ+
অ-
উত্তরের অর্থনীতি ও মানুষের ভাগ্য বদলে দিচ্ছে মওলানা ভাসানী সেতু

তিস্তার বুকে একসময় যেখানে ছিল ধু ধু বালুচর, ছিল অনিশ্চয়তা আর ভাঙনের আতঙ্ক, সেই জনপদ আজ নতুন স্বপ্নে জেগে উঠেছে। শত বছরের হারানো ভিটেমাটি ফিরে পেয়েছে মানুষ, বদলে গেছে জীবন-জীবিকা। আর নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে গাইবান্ধার হরিপুর-চিলমারী সংযোগ সড়কে তিস্তার নদীর ওপর নির্মিত মওলানা ভাসানী সেতু।

বিজ্ঞাপন

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সেতু চালুর ফলে গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রামসহ উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থায় এসেছে আমূল পরিবর্তন। আগে যেখানে দীর্ঘ পথ ঘুরে যেতে হতো, এখন সরাসরি সংযোগ স্থাপিত হয়েছে। স্থানীয় লোকদের মতে, রাজধানী ঢাকাসহ দেশের দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগে দূরত্ব কমেছে প্রায় ৪০ থেকে ১০০ কিলোমিটার। এতে কৃষিপণ্য, শিল্পপণ্য ও নির্মাণসামগ্রী পরিবহন সহজ ও সাশ্রয়ী হয়েছে। একইসঙ্গে অপার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে ছোট ও মাঝারি কলকারখানা প্রতিষ্ঠার। যা বাস্তবায়ন হলে এলাকায় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং স্থানীয় আর্থ-সামাজিক অবস্থা উন্নয়নসহ জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখবে এই সেতু। একইসঙ্গে পর্যটনের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

সরেজমিনে গত শুক্রবার দুপুরে সেতু এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, দীর্ঘ তিস্তার তল পেট দিয়ে মৃদু স্রোতধারা বইছে। উত্তর-দক্ষিণ সেতুর উত্তর দিকের সেতুর উভয় পাশে পড়েছে বিশাল চর। আবাদ হয় ভুট্টার। সেতুতে চলছে যাত্রবাহী বাস, মাইক্রো, অটোরিকশা, রিকশা ও সিট বসানো ভ্যান। এ ছাড়া, পণ্য ও খাদ্য এবং নির্মাণসামগ্রী পরিবহনে চলছে বড় বড় ট্রাক, পিকআপ, কাকড়া, ট্রলি, ভ্যান। এ ছাড়া, চোখ আটকে যায় কৃষি পণ্য পরিবহনে সেতুতে চলছে ঘোড়ার গাড়ি। অপরদিকে, ব্যক্তিগত মাইক্রো, মোটরসাইকেল এবং হেঁটেও সেতু পার হচ্ছেন হাজারো মানুষ।

এদিন সাঘাটা উপজেলা থেকে পরিবারসহ ঘুরতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী শ্রী নির্মলচন্দ্র বলেন, স্ত্রী-সন্তানসহ ঘুরতে এসেছি, দারুণ লাগছে। তিনি বলেন, এটি একটি সম্ভবানাময় পর্যটন এলাকা। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় নদীর দুই পারে বসার সিট, লাইটিং, বৃক্ষরোপণ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করলে এটি জনপ্রিয় ভ্রমণস্পটে পরিণত হবে।

বিজ্ঞাপন

বৃদ্ধ বছির উদ্দিন বলেন, এখানে ছিল ধু ধু বালুচর। বর্ষা মৌসুমে যোগাযোগ সহজ হলেও ছিল বন্যার দুঃখ। কিন্তু শুকনা মৌসুমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা নৌকার জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে। মাথায়, ঘাড়ে, কাঁধে করে মালামাল বালির পথ হেঁটে নৌকায় তুলতে হয়েছে। তাতে সময় ও খরচ দ্বিগুণ হয়েছিল কিন্তু এখন সহজেই আসা-যাওয়া করা যায়।

এ সময় কুড়িগ্রাম থেকে মালামাল নিয়ে আসা অটোচলক ইউনূস আলী বলেন, আজকে দুপুর ১২টায় চার বস্তু মাল নিয়ে কুড়িগ্রাম থেকে সীচাপাঁচপির বাজারে এসেছিলাম। এখন ৫টা বাজে ফিরে যাচ্ছি। সেতু না হলে এটা সম্ভব হতোনা।

ট্রাক্টর (কাকড়া) চালক রহিম বলেন, সেতু হওয়ায় সহজে বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রীসহ বিভিন্ন কিছু এপার-ওপার করা যাচ্ছে। আমাদের ইনকাম (আয়) বেড়েছে।

বিজ্ঞাপন

এক ঘোড়াচালক বলেন, আমার নিজের ঘরে খুঁটি লাগাবে। ঘোড়ার গাড়িতে রাঘবের চরে নিয়ে যাচ্ছি। সেতু হওয়ায় সহজে নিতে পারতেছি। সেতু না থাকলে ৭০০ টাকা বেশি খরচ পড়তো নৌকায়।

সেতুকে কেন্দ্র করে সেতুর উভয় পাশে গড়ে উঠেছে অন্তত বিভিন্ন রকমের প্রায় ১০০ ছোট-বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান।

গাইবান্ধা থেকে সেতুতে প্রবেশের আগেই পাওয়া যায় চন্ডিপুর এলাকার গোলচত্বর। যেখানে চার রাস্তার সংযোগস্থল। সেতুকে ঘিরে সেখানে হোটেল, চা স্টল, কনফেকশনারি, মনুহুরি, মাছের খাদ্য, সেলুন ও বিভিন্ন সার্ভিসিংয়ের দোকানসহ অন্তত ৩০টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান।

এ ছাড়া, সেতুর প্রবেশমুখের ঠিক পূর্ব পাশে গড়ে উঠেছে হরেক রকম খেলনাসামগ্রী ও গৃহস্থালির নিত্য প্রয়োজনীয় অর্ধশত স্থায়ী ও অস্থায়ী দোকান। এখানে সবুজ-শাহিনুর দম্পতি শিশুদের খেলনাসহ নারীদের বিভিন্ন পণ্যের ব্যবসা করেন।

শাহিননুর বলেন, আগে আমার স্বামী ঘাট দেখাশোনা করতেন। কিন্তু ব্রিজ হওয়ার পর এই ব্যবসা করছি, ভালো চলছে।

আরেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আমজাদ বলেন, আমি আগে কৃষি কাজ করেছি, শ্রমিকের কাজ করেছি। সেতু হওয়ার পর এখন পানের দোকান করি, ভালো আছি।

যুবক আশিকুর রহমান আকাশ বলেন, আমরা যে গাইবান্ধার মানুষ, তা মনেই হচ্ছিল না। কারণ আমাদের চলাফেরা ছিল চিলমারিকেন্দ্রিক। সেতু হওয়ার পর এখন মনে করলেই আমরা এপার থেকে ওপারে যেতে পারি। পাঁচপীরেসহ সুন্দরগঞ্জে আমাদের যোগাযোগ বেড়েছে।

কলেজপড়ুয়া নাজমুল হোসেন বলেন, আমরা সেতুর আগে ঢাকা যেতে প্রথমে কুড়িগ্রাম, রংপুর হয়ে গাইবান্ধা যেতাম, তারপর ঢাকা। কয়েকগুণ টাকা বেশি লাগতো এবং সময় যেতো অনেক।

সেতুর সংযোগ সড়কের সিংহভাগই পড়েছে উত্তর পাশে। সেতু পার হলেই ইসলামপুর বাজার। যেখানে ফুসকা, চটপটিসহ হরেক রকম খাবারের দোকান গড়ে উঠেছে। এ ছাড়া, আধুনিক মানের কফি ও চা স্টল, ফাস্টফুড, ভাত-বিরিয়ানির হোটেলও গড়ে উঠেছে এখানে। রয়েছে কাপড়, সার, তেল, কীটনাশক, দর্জি, সেলুন এবং কাঁচা তরকারির দোকানসহ প্রায় অর্ধশত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান।

এখানে মনোহারী দোকান করেন সাখাওয়াত-রুজিনা দম্পতি। আগে কৃষি কাজ করতেন সাখাওয়াত। কিন্তু সেতু চালুর পর থেকে দোকান করেন। সাখাওয়াত বলেন, রোদে পুড়ে কৃষি কাজ করতাম। অনেক কষ্ট করেছি জীবনে। কিন্তু সেতু হওয়ার পর কষ্টের দিন শেষ হইছে। সংসার ভালোই যাচ্ছে, স্ত্রী ব্যবসায় সহযোগিতা করে।

এর পরেই পাওয়া যায় সেতু এলাকার শহরের মোড়। এখানে গড়ে উঠেছে মাংসের দোকান, কসমেটিক, ফার্মেসী, হোটেল, মোবাইল সার্ভিসিংসহ অন্তত ১০ থেকে ১২টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। এসব পার হলেই কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার খরখরিয়া গ্রাম।

মাংস বিক্রেতা ফারুক বলেন, সেতু আসলে এখানকার চিত্রই পাল্টে দিয়েছে। আমরা আসলে এটা কখনো কল্পনাও করতে পারিনাই। বিভিন্ন হাটে-বাজারে এখানকার মানুষ মাংস কিনতেন। কিন্তু এখন হাতের নাগালে মাংস বিক্রি করি। আমরা সেতুর সুফল ভোগ করছি।

এদিকে সেতুর উত্তর পাশে সেতু-সংলগ পশ্চিম অংশটি চর হরিপুর নামে পরিচিত। এখানে গড়ে উঠেছে অর্ধশতাধিক নতুন বাড়িঘর, যারা বিভিন্ন চরে বসবাস করতেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ তিস্তার কড়াল গ্রাসে নিঃস্ব হয়েছিলেন অনেক আগে। কেউ সম্প্রতি ভূমি হারিয়ে হয়েছিলেন দিশেহারা। এ ছাড়া, অনেকেই বিভিন্ন চরে ভিটে-মাটি কিনে বসতি স্থাপন করেছিলে। সেতু-সংলগ্ন সংযোগ সড়কে অনেকেই নতুন বাড়ি নির্মাণ করছেন।

সেতু এলাকায় তিন্তার ভাঙনে শত বছর আগে ভিটেমাটি হারিয়ে এলাকাছাড়া হয়েছিলেন লিয়াকত আলীর পরিবার। পরে ফিরেও এসেছিলেন। দ্বিতীয় দফায় আবার ভাঙনে ছাড়তে হয়েছিল সেই বসতিও। কিন্তু প্রায় শত বছর পর ভাসানী সেতু তাদের বাপ-দাদার ভিটে ফিরিয়ে দিয়েছে।

ষাটোর্ধ্ব লিয়াকত আলী জানান, সেতুর যায়গাতেই তার বাপ-দাদারা বসবাস করতেন। তিস্তার ভাঙনে তারা বাস্তচ্যুত হয় ১৯৩২ সালে। কিন্তু প্রায় শত বছর পর ভাসানী সেতু তাদের শত বছরের হারানো ভূমি ফিরিয়ে দিয়েছে। যেখানে তিনি বাড়ির নির্মাণকাজ শুরু করেছেন।

লিয়াক আলী বলেন, ভাসানী সেতু শুধু জমি ফিরিয়ে দিয়ে বসতবাড়ি করার সুযোগটা দেয়নি। এসব সম্পদের কয়েকগুণ মূল্য বৃদ্ধি করে দিয়েছে। এখানে ছিল ধু ধু বালুচর। কিন্তু ধীরে ধীরে তা স্বর্ণমূল্যে পরিণত হচ্ছে।

এখানে বসবাস শুরু করেছেন অপর ষাটোর্ধ্ব লাল মিয়া। এদিন বিকেলে দুধ বিক্রি করতে যাচ্ছিলেন এই পথে। জানতে চাইলে তিনি স্মৃতি উচ্চারণ করে বলেন, তিস্তার উত্তরে ছিলাম। বাপ-দাদার আমল থেকে ১০০ বিঘার অধিক জমি নদীতে বিলিন হয়েছে। আমি নিজেও ১৩ থেকে ১৪ বার বাড়ি ভেঙেছি। কিন্তু সেতু এবং সেতুর ক্রসবাধ হওয়ার বছর বাড়ি করেছি। আর বোধহয় ভাঙন দেখতে হবে না। তিস্তার ওপরের ভাসানী সেতু আমাদের শেষ রক্ষাটা করেছে।

এখানকার নতুন বাসিন্দা নুরুল হুদা-মুর্শিদা দম্পতি। মুর্শিদা বেগম বলেন, আমার বিয়ের ১০ বছরে তিনবার বাড়ি ভেঙেছি। এরপর এখানে যায়গা নিয়ে বাড়ি করেছি। আশা করি, আর বাড়ি ভঙতে হবে না। আমরা অনেক ভালো আছি। এখন শুধু কর্মের প্রয়োজন এখানকার মানুষের।

সূর্য ডোবার সন্ধ্যাতেও মাঠে কাজ করছিলেন আহম্মদ আলী, তিনি বলেন আমাদের কোনো দুঃখ নেই। আমরা আর ভাঙন দেখি না। ষোলোআনা শষ্য পাই। এখন এখানে কিছু কল-কারখানা, চিকিৎসাকেন্দ্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলে এলাকাটি সম্পদে পরিণত হবে। দুই পাড়ে যেসব দোকানপাট হয়েছে দিনে ও রাতেও তারা জমজমাট বেচাকেনা করে।

শেষ বেলায় কথা হয় এই সেতুর দাবিতে সোচ্চার আন্দোলনের অগ্রনায়ক হরিপুর বিএসএন গার্লস হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক (বর্তমানে অবসর) আবুল বাশার মো. শরীতুল্লাহর সঙ্গে। যিনি ১৯৯৫ সাল থেকে এককভাবে এই সেতুর জন্য আন্দোলনের মাধ্যমে জনগণকে সংগঠিত করে 'তিস্তা সেতু বাস্তবায়ন কমিটি' গঠন করেছিলেন।

স্মৃতিচারণ করে তিনি এখানকার নদী ভাঙনে নিঃস্ব ও কর্মহীন হয়ে পড়া মানুষের অনাহারে, অর্ধাহারে থাকা, আশ্রয়হীন হয়ে পড়াসহ নানা দুর্দশার কথা তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, বর্তমানে সেতু হওয়ায় সেই নিদারুণ দুর্বিসহ জীবনের সমাপ্তি ঘটেছে। সেইসঙ্গে তৈরি হয়েছে অপার সম্ভাবনা। ইতোমধ্যে সেতুর দুই পারে শতাধিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান করে মানুষ জীবিকা নির্বাহ করছেন। কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি দুই জেলার মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন হয়েছে। এখন সরকার ও রাজনৈতিক ব্যক্তি তথা জনপ্রতিনিধিরা আন্তরিক হয়ে ক্ষুদ্র বা মাঝারি শিল্প কারখানার উদ্যোগ নিলে স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবনমান আরও বদলে যাবে। পাশাপাশি পর্যটনকেন্দ্র হিসেবেও গড়ে তোলার দাবি জানান তিনি।

উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের ২০ আগস্ট সেতু উদ্বোধন করেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। সৌদি সরকারের অর্থায়নে, চায়না স্টেট কনস্ট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডের তত্ত্বাবধানে ৮৮৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ১,৪৯০ মিটার দৈর্ঘ্য ও ৯.৬ মিটার প্রস্থের পিসি গার্ডার সেতুটি বাস্তবায়নে সরাসরি তদারকি করে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (LGED)। দেশের ইতিহাসে এটিই এলজিইডির সর্ববৃহৎ প্রকল্প।

এএমকে