বরগুনায় উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। গত এক সপ্তাহে জেলায় ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৩৮২ জন। তাদের মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্ত হয়ে ৬৫ জন বর্তমানে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তবে নির্ধারিত শয্যার বিপরীতে আক্রান্তের সংখ্যা বেশি হওয়ায় অধিকাংশ রোগীকে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে হাসপাতালের মেঝেতে। এছাড়াও প্রয়োজনীয় বেশিরভাগ ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন আক্রান্ত রোগী ও স্বজনরা।
বিজ্ঞাপন
বরগুনা জেলা সিভিল সার্জন অফিসের তথ্য সূত্রে জানা যায়, চলতি বছর এখন পর্যন্ত ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন ২ হাজার ৭০৩ জন। তাদের মধ্যে গত এক সপ্তাহে চিকিৎসা নিতে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৩৮২ জন রোগী। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছেন ৬৭ জন। তবে চিকিৎসা নিতে আসা আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে ২ হাজার ৪৮১ জন রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন।
ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হওয়া রোগীদের মধ্যে এখন পর্যন্ত শুধু বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন ১ হাজার ৩৫৯ জন। বাকি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেগুলোর মধ্যে আমতলীতে ৪৮৫, বেতাগী ১২৭, বামনা ১৫১, পাথরঘাটা ৩১৫ এবং তালতলী উপজেলায় ২৬১ জন ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগী ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। আর গত ২৪ ঘণ্টায় বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে ৩৭, আমতলীতে ১২, বামনায় ৩, পাথরঘাটায় ৬ এবং তালতলী ৭ জন ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগী ভর্তি হয়েছেন।
সরেজমিনে বরগুনা জেনারেল হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে শিশু এবং বৃদ্ধসহ বিভিন্ন বয়সী রোগীরা চিকিৎসাধীন রয়েছে। তবে আক্রান্ত রোগীদের জন্য ২০টি শয্যা নির্ধারণ করা থাকলেও বর্তমানে রোগী ভর্তি হয়েছে ৫৩ জন। ফলে শয্যার সংকটে অপরিচ্ছন্ন মেঝেতেই গাদাগাদি করে চিকিৎসা নিচ্ছেন ডায়রিয়ায় আক্রান্ত অধিকাংশ রোগী। হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা এসব রোগী ও স্বজনদের অভিযোগ, শুধুমাত্র স্যালাইন ছাড়া প্রয়োজনীয় তেমন কোনো ওষুধ নেই হাসপাতালে। ফলে বাধ্য হয়েই বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে হচ্ছে রোগীদের।
বিজ্ঞাপন
ডায়রিয়ায় আক্রান্ত বাবাকে নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন মো. ফোরকান। তিনি ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমার বাবাকে নিয়ে আজ সকালে হাসপাতালে এসেছি। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী তাকে ভর্তি করা হয়েছে। আমাদেরকে চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধ লিখে দেওয়া হয়েছে। বাইরের দোকান থেকে কিনে আনার পর নার্সরা চিকিৎসা শুরু করেছেন।
ডায়রিয়ায় আক্রান্ত আরেক রোগীর স্বজন জেসমিন বেগম ঢাকা পোস্টকে বলেন, রোগী নিয়ে এসে হাসপাতালে বেড পাইনি। যারা আগে এসে ভর্তি হয়েছেন, তারাই বেড পেয়েছে। হাসপাতালে যে ওষুধ আছে তা আমাদেরকে দেওয়া হয়েছে। বাকি ওষুধ লিখে দিয়েছে, বাইরে থেকে কিনে এনেছি।
শিমু নামে আরেক স্বজন ঢাকা পোস্টকে বলেন, হাসপাতাল থেকে স্যালাইন ছাড়া আর কিছুই পাইনি। অন্য সব ওষুধ বাইরের দোকান থেকে কিনতে হয়েছে। নার্সদের কাছে বললে, তারা বলে বাজেটের থেকে রোগী বেশি, অতিরিক্ত ওষুধ আমরা কীভাবে দেব। বেড পাইনি এখন বাধ্য হয়ে মেঝেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
বর্তমানে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে অতিরিক্ত রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় ওষুধের কিছুটা সংকট রয়েছে জানিয়ে বরগুনা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. রেজওয়ানুর আলম ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমরা একটা বিপর্যয় সামাল দিচ্ছি। এর মধ্যে আবার চলছে ডায়রিয়ার প্রাদুর্ভাব। প্রতিবছরই ডায়রিয়া আক্রান্ত হয়। তবে এ বছর হাম এবং ডায়রিয়া একই সঙ্গে চলছে। ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগীদের জন্য ২০টি শয্যা নির্ধারণ করা থাকলেও এখন প্রায় পাঁচগুণ রোগী চলে এসেছে। এ অবস্থায় তাদেরকে আলাদাভাবে জায়গা দেওয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই। কিন্তু হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের প্রয়োজনীয় স্যালাইন সরবরাহ করা হচ্ছে। কিছু ওষুধ আনা সম্ভব হয়নি, যা টেন্ডার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আনতে হয়। আমরা টেন্ডার প্রক্রিয়ায় গিয়েছি এবং তা সম্পন্ন হলে অনেক ধরনের ওষুধ চলে আসবে।
ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিতের বিষয়ে বরগুনার সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ আবুল ফাত্তাহ ঢাকা পোস্টকে বলেন, প্রতি বছরই এই সময়ে ডায়রিয়ার রোগী বৃদ্ধি পায়। বরগুনা সদরসহ আমতলী উপজেলায় কিছুটা রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও আমাদের প্রয়োজনীয় ওষুধের সংকট নেই। আক্রান্ত রোগীর বেশিরভাগই চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগীদের সর্বোচ্চ চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। আসা করছি ডায়রিয়ায় আক্রান্তের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে চলে আসবে।
আব্দুল আলীম/আরএআর
