বিজ্ঞাপন

১৭০ বছরেও কাটেনি মদের নেশা, চা-বাগানে সস্তা শ্রমে বাড়ছে বেকারত্ব

অ+
অ-
১৭০ বছরেও কাটেনি মদের নেশা, চা-বাগানে সস্তা শ্রমে বাড়ছে বেকারত্ব

প্রায় ১৭০ বছর আগে বাংলাদেশে চা চাষের সূচনা। সময়ের সঙ্গে উৎপাদন ও বাগানের পরিধি বেড়েছে, কিন্তু বদলায়নি চা-শ্রমিকদের জীবনমান। ব্রিটিশ আমল থেকে বাগানকেন্দ্রিক এক ধরনের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মধ্যে বেকারত্ব, কুসংস্কার ও মদের পাট্টার মাধ্যমে শ্রমিকদের আটকে রাখা হয়েছে। এর প্রভাব এখনো বহন করছে বাগানের বড় একটি অংশ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মদের পাট্টা (মদের আসর) বন্ধ করা গেলে চা-শ্রমিকদের জীবনমানে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।

বিজ্ঞাপন

জানা যায়, দেশে ১৬৭টি চা বাগান রয়েছে। এসব বাগানে চা শ্রমিক পরিবারে প্রায় ৯ লাখ মানুষ বসবাস করেন। এর মধ্যে নিয়মিত অনিয়মিত মিলে প্রায় দেড় লাখ চা শ্রমিক কাজ করছেন। সময়ের পরিবর্তনে চা শ্রমিকের সন্তানেরা উচ্চ শিক্ষা অর্জনের পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন। তবে এখনো বাগানের বড় একটি অংশ কুশিক্ষা, কুসংস্কার, পাট্টা ও চোলাইমদে আসক্ত। বিশেষ করে মদের কারণে বেকারত্ব দূর হচ্ছে না। এখনো অনেক বাগানে প্রায় ৫০-৫৫ শতাংশ মানুষ মদ পান করেন। তবে যে সব বাগানে শিক্ষার হার বেশি সেসব বাগানে এর সংখ্যা কমে এসেছে। 

মৌলভীবাজারে বিভিন্ন চা বাগানে গিয়ে দেখা যায়, মদের পাট্টা থেকে বৈধভাবে যে মদ বিক্রি হয় এরচেয়ে বেশি অবৈধভাবে মদ বিক্রি হচ্ছে। পাট্টা থেকে কিছু মদ কিনে এগুলোর সঙ্গে চোলাইমদ বিক্রি করা হয়। বৈধ মদ ১০০ কেজি বিক্রি হলে অবৈধ মদ ১০০০ কেজি বিক্রি হয়। সন্ধ্যা নামলেই শুরু হয় মদ বেচা-কেনা। অনেক চা শ্রমিক নেশাগ্রস্ত হয়ে নিজ সন্তান ও পরিবারের লোকজনকে নির্যাতন করেন এমন ঘটনাও ঘটছে প্রতিনিয়ত। 

মৌলভীবাজার মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, জেলায় ৯২টি চা বাগানে ৪৫টি বৈধ মদের পাট্টা রয়েছে। এসব পাট্টা থেকেই শ্রমিকেরা মদ পান করেন। অবৈধভাবে যারা চোলাইমদ বিক্রি করেন তাদের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর থেকে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হয়।এছাড়া পুলিশ, ডিবি পুলিশের পক্ষ থেকে পৃথকভাবে অভিযান পরিচালনা করা হয়।

বিজ্ঞাপন

উচ্চ শিক্ষা অর্জনকারী চা শ্রমিকের সন্তানদের দাবি, যতদিন পর্যন্ত চা বাগান থেকে মদের পাট্টা বন্ধ করা না হবে ততদিন পর্যন্ত চা বাগানের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন হবে না। নেশা ও সভ্যতা এক সঙ্গে বসবাস করতে পারে না। যত দ্রুত সম্ভব বাগান থেকে মদের পাট্টা বন্ধ করতে হবে। এই মদের নেশায় বেকারত্ব দূর হচ্ছে না। মদ খাওয়ার লোভে বাগানের বাইরে কাজে যেতে চায় না অনেকেই। অতি কৌশলে চা বাগানে বেকারত্ব বৃদ্ধি করা হচ্ছে। এ বেকারত্ব নিরসনের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না।

বাগান পঞ্চায়েত কমিটির সদস্যরা বলেন, চা বাগানে এককাজ করলে ৪-৫ জন বসে থাকে। এ বেকারত্ব নিরসনের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। বাগানের ভেতরে আইন অনুযায়ী একর প্রতি নির্দিষ্ট সংখ্যক শ্রমিক নিয়োগের বিধান থাকলেও তা মানা হয় না। প্রচুর পরিমাণ আবাদি জমি থাকা সত্ত্বেও আবাদ করা হচ্ছে না। আর এ জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে না। যে জমিগুলো চা চাষের জন্য অনুপযোগী সে জমিন ধানচাষের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়। 

কিন্তু জমির একর প্রতি প্রায় ১১ মণ ধান কর্তৃপক্ষকে দিতে হয়। বাগান কর্তৃপক্ষ চা-শ্রমিকের পাওনা রেশন থেকে এই ১১ মণ ধানের সমপরিমাণ চাল কেটে রাখেন। অথচ এ জমিগুলো চা-শ্রমিকদের নামে স্থায়ী বরাদ্দ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হলে তাদের জীবন জীবিকার একটি সুযোগ সৃষ্টি হতো। কিন্তু সরকার জমি বরাদ্দ কেবল চা-বাগান কর্তৃপক্ষকে দেন। আর চা-বাগান কর্তৃপক্ষের মনে যা চায় তারা তাই করেন শ্রমিকদের সঙ্গে। 

বিজ্ঞাপন

বিভিন্ন বাগানের একাধিক চা-শ্রমিক নেতারা বলেন, আমরা দাবি-দাওয়া নিয়ে কথা বললেই ব্রিটিশ আইনে ধরিয়ে দেওয়া হয়। চা-বাগানে সবচেয়ে বড় সমস্যা হল বেকারত্ব। চা-শ্রমিকদের তুলনায় প্রায় চারগুণ বেশি হলো বেকারদের সংখ্যা। সরকার এবং চা-বাগান মালিক পক্ষরা চাইলে এই বেকারত্ব দূর করতে পারেন। তারা এটা না করে মদের বোতল হাতে ধরিয়ে দিয়েছে। ধীরে ধীরে হলেও সরকারকে মদের পাট্টা বন্ধ করতে হবে। এক সঙ্গে সব মদের পাট্টা বন্ধ করা যাবে না। সরকারকে মদের পাট্টা বন্ধের উদ্যোগ নিতে হবে। 

বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও চা শ্রমিক নেতা রামভজন কৈরি বলেন, বাগান থেকে বাইরে বের হওয়ার প্রবণতা এখনো সৃষ্টি হয়নি। মদকে ছেড়ে যদি শিক্ষার হার বাড়ানো যেতো তাহলে বাগানে শিক্ষার হার অনেক বেড়ে যেত। কমলগঞ্জের আলীনগর চা বাগানে ১০০ জনের ওপরে বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি চাকরি করেন। এভাবে যদি প্রতিটা বাগানে হতো তাহলে চা বাগানের মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন হতো। বর্তমানে বাগানে শিক্ষার হার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মদের হার অনেকটা কমছে। সরকার যদি মদের পাট্টাগুলো বন্ধ করার উদ্যোগ নেয় তাহলে বেকারত্ব দূর হবে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর মৌলভীবাজারের উপপরিচালক মো. রাশেদুজ্জামান বলেন, মৌলভীবাজার জেলার চা বাগানে মোট ৪৫টি বৈধ মদের পাট্টা রয়েছে। এর মধ্যে শ্রীমঙ্গল একটা রয়েছে, যেখানে বিলেতি মদ বিক্রি করা হয়। অবৈধভাবে যারা চোলাই মদ বিক্রি করে তাদের বিরুদ্ধে আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে তাদেরকে আইনের আওতায় আনা হয়। 

আরকে

বিজ্ঞাপন