সারাদেশের ন্যায় প্রান্তিক জেলা সুনামগঞ্জেও বিদ্যুতের চরম লোডশেডিং হচ্ছে। দিনের অর্ধেক সময়ই বিদ্যুৎ পাচ্ছেন না গ্রাহকরা। সংশ্লিষ্টরা লোডশেডিংয়ের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, চাহিদা অনুযায়ী অর্ধেক বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না, তাই বাধ্য হয়েই অনেক ফিডার বন্ধ রাখতে হচ্ছে এবং লোডশেডিং হচ্ছে।
জানা যায়, সুনামগঞ্জ জেলায় বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির গ্রাহক রয়েছে প্রায় ৪ লাখ ৫৩ হাজারের বেশি। এরমধ্যে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির গ্রাহক ৪ লাখ, পিডিবির সুনামগেঞ্জ শহর এলাকার ৩৫ হাজার ও দিরাই জোনের আওতায় ১৮ হাজার গ্রাহক।
সুনামগঞ্জের ছাতক ও শহরতরীর সুনামগঞ্জ-সিলেটে সড়কের ইকবালনগর গ্রিড থেকে পিডিবির ২টি ও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ১০টি উপকেন্দ্রে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়ে থাকে। পরে পিডিবি ও পল্লী বিদ্যুতের গ্রাহকরা বিভিন্ন ৩৩/১১ উপকেন্দ্র থেকে গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ পান। সুনামগঞ্জ শহর ও আশপাশের এলাকার পিডিবির প্রায় ৩৫ হাজার গ্রাহকের মধ্যে আবাসিক গ্রাহক রয়েছে ২৬ হাজার ২৮৩ জন, বাণিজ্যিক গ্রাহক ৪ হাজার ২৮৯ জন, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প ২৬২ জন, অনাবাসিক মন্দির, মসজিদ, ধর্মীয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ২৯৭টি, কৃষিসহ আরও অন্যান্য গ্রাহক রয়েছেন।
সুনামগঞ্জ পিডিবি কর্তৃপক্ষের দাবি, গ্রাহকদের জন্য প্রতিদিন প্রায় ১২ থেকে ১৩ মেগাওয়াট বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়। কিন্তু গত কয়েক দিন ধরে চাহিদার অর্ধেক বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। ৪ থেকে সাড়ে ৪ ও ৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। এতে দিনের অর্ধেক সময়ই গ্রাহকদের বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে লোডশেডিং এর কবলে পড়ে গ্রাহকরা অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন।
এছাড়া পিডিবির দিরাই জোনের অধীনে রয়েছে প্রায় ১৯ হাজার গ্রাহক। সেখানে প্রতিদিন প্রয়োজন ৬ থেকে সাড়ে ৬ মেগাওয়াট বিদ্যুতের, কিন্তু এখন প্রতিদিন সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ২ থেকে আড়াই মেগাওয়াট। এতে দিরাই এলাকার গ্রাহকরাও দিনের অর্ধেকের বেশি সময় বিদ্যুৎ সেবা পাচ্ছেন না।
এদিকে সুনামগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির প্রায় ৪ লাখ গ্রাহক রয়েছে। এরমধ্যে ৩ লাখ ৯০ হাজারই আবাসিক গ্রাহক। অনাবাসিক, বাণিজ্যিক, ক্ষুদ্র কুটির শিল্প ও কৃষির গ্রাহক রয়েছে প্রায় ১০ হাজার। এসব গ্রামের দৈনিক প্রয়োজন ৩৫ থেকে ৪৫ মেগাওয়াট কিন্তু পাচ্ছেন মাত্র ১৯ মেগাওয়াট, রাতে ৫৫ থেকে ৬৫ মেগাওয়াটের স্থলে পাচ্ছেন অর্ধেক বা কম।
গ্রাহকদের চাহিদার অর্ধেক বা অর্ধেকের চেয়ে কম বিদ্যুৎ সরবরাহ হওয়ায় গ্রাকদের চাপে রয়েছেন পিডিবি ও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে দিনের অর্ধেক সময়েও বিদ্যুৎ না পেয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন গ্রাহকরা। বিশেষ করে উৎপাদন ও সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠান কাঙ্ক্ষিত সেবা দিতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে।
জামালগঞ্জ উপজেলার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির গ্রাহক সাচনাবাজারের ব্যবসায়ী বিশ্বজিত রায় বলেন, বিদ্যুতের কারণে সব ধরনের ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষতি হচ্ছে। দিনের অধিকাংশ সময় বিদ্যুৎ থাকে না, সারা দিনে ৪-৫ ঘণ্টাও বিদ্যুৎ পাওয়া যায় না। যাদের সামর্থ আছে, তারা আইপিস বা জেনারেটর ব্যবহার করছেন। বিদ্যুতের কারণে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে, সাধারণ মানুষ নাজেহাল অবস্থায় পড়েছেন।
বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা পলাশ এলাকার মোটরসাইকেল চালক বাবুল মিয়া বলেন, পেট্রোল, ডিজেল, অকটেনের জন্য এদিকে গাড়ি চালকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। অন্যদিকে কারেন্ট না থাকায় ভোগান্তি আরও বাড়ে। কারেন্ট না থাকলে পাম্পও বন্ধ থাকে।
দিরাই পৌর শহরের দউজ এলাকার বাসিন্দা জিয়াউর রহমান লিটন বলেন, পৌর এলাকায় দিনের অধিকাংশ সময়ে বিদ্যুৎ থাকে না। এতে অনুমান করা যায় গ্রামাঞ্চলের গ্রাহকরা কেমন সেবা পাচ্ছেন। একদিকে জ্বালানি সংকট ও অন্যদিকে বিদ্যুতের লোডশেডিং সবমিলিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছে মানুষ।
সুনামগঞ্জ শহরের কালীবাড়ির বাসিন্দা এসএসসি পরীক্ষার্থী মানশিকা রায় দীয়া বলেন, কয়েক দিন পর আমাদের পরীক্ষা কিন্তু ভালো করে পড়ালেখা করা সম্ভব হচ্ছে না। একদিকে কয়েক মিনিট পরপরই কারেন্ট চলে যায়, অন্যদিকে প্রচণ্ড গরম পড়েছে। কারেন্ট না থাকায় লেখাপড়ায় কষ্ট হচ্ছে।
সুনামগঞ্জ শহরের বড়পাড়ার বাসিন্দা এহসান মমিন বলেন, ‘কারেন্টের যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ অইয়া পরছি। দিনে-রাইতে লোডশেডিং অইতাছে। কারেন্ট না থাকায় দিনও কোন কাম-কাজ করা যায় না, আর রাইত গরমের লাগি ঘুমানি যায় না। কারেন্ট অফিসে ফোন দিলে খালি কয় লোডশেডিং চলছে।’
শহরের লন্ডনপ্লাজা মাকের্টের ব্যবসায়ী রাজিব দাস বলেন, গরম পড়ার আগেই বিদ্যুতের লোডশেডিং দেখা দিয়েছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় ব্যবসার ক্ষতি হচ্ছে। কারণ সন্ধ্যা ৭টার পর আবার মার্কেট বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে ব্যবসায় গ্রাহকসেবার মান ধরে রাখা যাবে না।
সুনামগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার (জি এম) মিলন কুমার কুন্ডু ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমাদের প্রায় ৪ লাখ গ্রাহক রয়েছে। বর্তমানে আমাদের দিনে ৩৪ থেকে ৪৫ মেগাওয়াটের প্রয়োজন কিন্তু আমরা পাচ্ছি মাত্র ১৯ মেগাওয়াট। রাতে আমাদের চাহিদা অনেক বাড়ে, রাতে প্রায় ৫৫ থেকে ৬৫ মেগাওয়াটের চাহিদা থাকে কিন্তু পাওয়া যায় অর্ধেকের চেয়ে কম। যার কারণে সকল শ্রেণির গ্রাহকরাই চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ পাচ্ছেন না।
সুনামগঞ্জ পিডিবির বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাসেল আহমদ ঢাকা পোস্টকে বলেন, সুনামগঞ্জের পিডিবির গ্রাহকদের জন্য প্রতিদিন গড়ে ১২ থেকে ১৩ মেগাওয়াট বিদ্যুতের প্রয়োজন। কিন্তু পাওয়া যায় মাত্র ৬ থেকে সাড়ে ৬ মেগাওয়াট। চাহিদার তুলনায় অর্ধেক বিদ্যুৎ পাওয়ায় গ্রাহকসেবা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। যার কারণে গত তিন-চার দিন ধরে কোনভাবেই গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না।
এই অবস্থার অবসান কবে হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এমন কোনো ধরনের তথ্য আমাদের কাছে নেই। নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে আমাদের যে বার্তা দেওয়া হয়, আমরা সেই অনুযায়ী ফিডার নিয়ন্ত্রণ করি।
তামিম রায়হান/এসএইচএ
