বিজ্ঞাপন

কুমিল্লায় কৃষককে কুপিয়ে হত্যা, আসামিদের ধরছে না পুলিশ

কুমিল্লায় কৃষককে কুপিয়ে হত্যা, আসামিদের ধরছে না পুলিশ

কুমিল্লার মুরাদনগরে পূর্বশত্রুতার জেরে মাওলা সরকার (৪৫) নামের এক কৃষককে কুপিয়ে হত্যার ১০দিনেও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন আসামিরা। হত্যার প্রধান আসামি আওয়ামী লীগ নেতা খোরশেদ আলমসহ ১০ আসামির মধ্যে এ হত্যাকাণ্ডে এজাহারনামীয় একজন গ্রেপ্তার হলেও স্থানীয় বাসিন্দারা আটক করে তাকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেছিল দাবি নিহতের স্বজনদের। ঘটনার এতদিনেও আসামিদের গ্রেপ্তার করতে না পারায় ন্যায়বিচার পাওয়া নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছে নিহতের পরিবার।

নিহত মাওলা সরকার মুরাদনগর উপজেলার বাঙ্গরা বাজার থানার পূর্ব ধইর পশ্চিম ইউনিয়নের মহেশপুর গ্রামের মৃত হাসেম সরকারের ছেলে। গত ৭ এপ্রিল (মঙ্গলবার) রাতে বাজার থেকে ফেরার পথে তাকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। মহেশপুর গ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা খোরশেদ আলমের নেতৃত্বে ৮-১০ জনের একদল সশস্ত্র দুর্বৃত্ত ঝোপে লুকিয়ে থেকে পথরোধ করে তাকে কুপিয়ে হত্যা করেন।

এ ঘটনার পরদিন নিহত মাওলা সরকারের স্ত্রী ফাতেমা বাদী হয়ে ১০ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেন। ১ নম্বর আসামি করা হয় আওয়ামী লীগ নেতা খোরশেদ আলম সরকারকে। ঘটনার ১০ দিন পার হলেও পুলিশ মাত্র একজনকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে। বাকি ৯ জনই অধরা রয়েছেন।

শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) দুপুরে মাওলা সরকারের স্ত্রী ফাতেমা বেগমের সঙ্গে কথা হলে তিনি ঢাকা পোস্টকে বলেন, এতগুলো দিন চলে গেল পুলিশ আসামিদের ধরছে না। আমরা যোগাযোগ করলেই শুধু বলে আমরা চেষ্টা করছি। একজন আসামি ধরতে পারলেও তো মনটাকে বুঝাতাম। গত পরশু ওসি সাহেব বলেছেন ৭২ ঘণ্টার মধ্যে তাদেরকে ধরবেন, কিন্তু ৭২ ঘণ্টা পার হতে আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা বাকি। পুলিশ কাউকেই ধরছে না।

কাঁদতে কাঁদতে ফাতেমা বলেন, আমার ৫টা সন্তান। প্রথম তিন সন্তান ছেলে, শেষের দুইটা মেয়ে। সবার বড় সন্তানের বয়স ১৫ বছর, ছোট মেয়েটার বয়স ২০ মাস। ৫ সন্তান নিয়ে আমি কী করব-কোথায় যাব? পরিবারের একমাত্র উপার্জন করতেন আমার স্বামী। নিষ্ঠুর মানুষেরা ওই মানুষটাকে মেরে ফেলেছে। সামান্য সেচের স্কিম নিয়ে দ্বন্দ্বের কারণে একটা লোককে ৮-১০ জন লোকে কুপিয়ে মারতে পারে?

তিনি আরও বলেন, আমরা নিরীহ মানুষ। আমাদের টাকা-পয়সা নেই। যারা হত্যা করেছে তারা অনেক প্রভাবশালী। অনেক টাকা-পয়সা তাদের। আমরা অর্থবিত্ত দিয়ে তাদের সঙ্গে পারব না। আমি সরকারের কাছে স্বামী হত্যার বিচার চাই।

বাঙ্গরা বাজার থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল কাদের খান ঢাকা পোস্টকে বলেন, ঘটনার পর থেকেই আসামিরা আত্মগোপনে চলে গেছেন। তাদের কোনোভাবেই ট্রেস করা যাচ্ছে না। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। আশা করছি খুব শিগগির সবাইকে আইনের আনতে সক্ষম হব। এ মামলার একজন আসামি গ্রেপ্তার আছেন। তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে উল্লেখ করেন ওসি।

স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা ঢাকা পোস্টকে বলেন, পুলিশ চাইলে সবই সম্ভব। কিন্তু কী অজ্ঞাত কারণে পুলিশ তাদের ধরতে পারছে না বা ধরছে না সেটি আমাদের বোধগম্য নয়। আমরা এলাকাবাসী আসামিদের আইনের আওতায় দেখতে চাই। একটা নিরীহ কৃষককে এভাবে কয়েকজন মিলে মেরে ফেলবে, অবশ্যই তাদের ফাঁসি চাই।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় থেকে স্থানীয় ইউপি সদস্য আব্দুর রহিম সরকারের সঙ্গে আওয়ামী লীগ নেতা খোরশেদ আলমের দ্বন্দ্ব শুরু হয়। মাওলা সরকার ইউপি সদস্য আব্দুর রহিম সরকারের চাচাতো ভাই এবং তার পক্ষের লোক ছিলেন। উভয়পক্ষের এই দ্বন্দ্ব দিনেদিনে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বাড়তে থাকে। ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর মাওলা সরকারকে মারধর করেছিলেন খোরশেদ আলমের লোকজন। এ নিয়ে মাওলা সরকার থানায় অভিযোগ দিয়েছিলেন। 

সম্প্রতি বুরো মৌসুমের ধানের জমিতে সেচ স্কিমকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ আরও তীব্র হয়। গত ৭ এপ্রিল রাত সাড়ে ৯টার দিকে বাজার থেকে বাড়ি ফিরছিলেন মাওলা সরকার। রাস্তার পাশে ঝোপে লুকিয়ে থাকা কয়েকজন দুর্বৃত্ত মাওলা সরকারের পথরোধ করে এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকে। কুপিয়ে জখম করে রাস্তায় ফেলে চলে গেলে স্থানীয়রা চিৎকার শুনে এগিয়ে এসে তাকে মুমূর্ষু অবস্থায় উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

মামলার আসামিরা হলেন, মহেশপুর গ্রামের মৃত নোয়াব সরকারের ছেলে খোরশেদ আলম সরকার, তার ভাই নানু সরকার, আনু সরকারের ছেলে সায়মন সরকার, জাহেরের ছেলে আলাউদ্দিন, কালাম সরকারের ছেলে মোজাম্মেল, আব্দুল জলিলের ছেলে জামাল সরকার, তার ভাই কামাল সরকার, আব্দুর রশিদের ছেলে দেলোয়ার হোসেন, ওসমান আলীর ছেলে শাহ আলম এবং আব্দুল মজিদের ছেলে মজিবুর রহমান।

এরমধ্যে ৯ নম্বর আসামি ওসমান আলীর ছেলে শাহ আলমকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকি ৯ জন আত্মগোপনে আছেন।

এদিকে কৃষক মাওলা সরকার হত্যার সাথে জড়িত আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে মানববন্ধন করেন স্থানীয়রা। গত ১২ এপ্রিল (রোববার) সকালে কোম্পানীগঞ্জ-নবীনগর সড়কের বাঙ্গরা ডাকবাংলোর সামনে স্থানীয় এলাকাবাসী ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের উদ্যোগে এই মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়।
মানববন্ধনে এলাকার শতাধিক নারী-পুরুষ অংশগ্রহণ করেন।

মামলার অগ্রগতি ও আসামিদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে জানতে জেলা পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামানকে ফোন করা হলে তিনি ফোন রিসিভ না করায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

আরিফ আজগর/এমএএস

বিজ্ঞাপন