দেশের যেসব জেলায় অধিক মাছ উৎপাদন হয়, তার মধ্যে ময়মনসিংহ জেলা অন্যতম। জেলার ভালুকা, ত্রিশাল উপজেলাসহ বিভিন্ন এলাকায় বাণিজ্যিক মাছ চাষ দ্রুত বিস্তার লাভ করেছে। পুকুর, বিল ও জলাশয়ভিত্তিক চাষে কার্পজাতীয় মাছ, তেলাপিয়া, পাঙাসসহ নানা প্রজাতির মাছ উৎপাদন হচ্ছে।
এ জেলায় সাধারণত আধুনিক পদ্ধতিতে পলি-কালচার, মানসম্মত ফিড ব্যবহার, নিয়মিত পানির গুণাগুণ নিয়ন্ত্রণ এবং বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করার কথা। কিন্তু বাস্তবে কিছু অসাধু খামারির কারণে পুরো খাতের সুনাম প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।
ভালুকা উপজেলায় মাছ চাষে ভয়াবহ অনিয়মের চিত্র সামনে এসেছে। মুরগির বিষ্ঠা, মরা-পঁচা মুরগি ও মুরগির নাড়িভুঁড়ি ব্যবহার করে মাছ উৎপাদনের অভিযোগ উঠেছে একাধিক খামারের বিরুদ্ধে। কোটি টাকা বিনিয়োগে উৎপাদিত এসব মাছ নিজেরাই না খেয়ে বাজারে বিক্রি করছেন খামার মালিকরা, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, বিভিন্ন মাছের খামারে খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর উপাদান। প্রশাসনের পক্ষ থেকে একাধিকবার নিষেধাজ্ঞা ও সতর্কতা জারি করা হলেও অনেক খামারি তা উপেক্ষা করে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। ফলে সাধারণ মানুষ অজান্তেই ঝুঁকিপূর্ণ মাছ কিনে খাচ্ছেন।
উপজেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, ভালুকার ৬টি ইউনিয়নে প্রায় সাড়ে সাত হাজার মৎস্য খামার রয়েছে। এর মধ্যে নিবন্ধন রয়েছে মাত্র সাড়ে ৭০০ খামারের। অধিকাংশ খামারই নিয়ম-নীতির বাইরে পরিচালিত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, মুরগির বিষ্ঠা পরীক্ষায় ক্ষতিকর প্রমাণিত হওয়ায় সরকার বহু আগেই এটি নিষিদ্ধ করেছে। তবুও কম খরচে বেশি লাভের আশায় অনেক চাষি এই পদ্ধতি অনুসরণ করছেন। সাম্প্রতিক সময়ে মুরগির বিষ্ঠার ব্যবহার কিছুটা কমলেও মরা মুরগি ও নাড়িভুঁড়ির ব্যবহার বেড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মরা-পচা মুরগি সংগ্রহ করে গভীর রাতে খামারে এনে পানির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়। সাধারণত রাত ১২টা থেকে ভোর ৪টার মধ্যে এই কাজ করা হয়।
এছাড়াও অনেক স্থানে পুকুরের মাঝেই মুরগির খামার স্থাপন করে সরাসরি বিষ্ঠা পানিতে ফেলা হচ্ছে। এতে পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন আশপাশের বাসিন্দারা।
রাংচাপড়া এলাকার মাছ চাষি শাহাদাত হোসেন মানিক বলেন, বাজারে ফিডের দাম বাড়ায় কিছু খামারি বিকল্প হিসেবে এসব ব্যবহার করছেন। কিন্তু এটি পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর আবার খাদ্য হিসাবেও বিপজ্জনক।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের খাদ্য ব্যবহারে মাছের মধ্যে জীবাণু ও ক্ষতিকর উপাদান জমা হয়। মুরগির দেহে ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিকের অবশিষ্টাংশ মাছের মাধ্যমে মানবদেহে প্রবেশ করে, যা দীর্ঘমেয়াদে হৃদরোগ, কিডনি ও লিভারের ক্ষতির ঝুঁকি বাড়ায়।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ডা. মুশফিকুর রহমান জানান, এসব উপাদান সহজে নষ্ট হয় না এবং মানুষের শরীরে প্রবেশ করলে ক্যান্সারসহ জটিল রোগের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, বিশেষ করে শিশুদের জন্য এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক।
ভালুকা উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আরিফুল ইসলাম বলেন, মাছের খাদ্য হিসেবে মুরগির বিষ্ঠা বা মরা মুরগির অংশ ব্যবহারের কোনো সুযোগ নেই। প্রশাসনের নজরদারি জোরদার করা হয়েছে এবং দ্রুতই এসব অনিয়ম বন্ধ করা হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সাইদুর রহমান জানান, নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে এবং নিষিদ্ধ উপাদান ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. ইকবাল হোসাইন বলেন, অনেক খামারে মুরগির বিষ্ঠা পাওয়া গেছে। কর্মচারীরা স্বীকার করেছেন তারা নিজেরাও এসব মাছ খান না, সব মাছ বাজারে বিক্রি করা হয়। যে মাছ নিজেরা খায় না, তা মানুষকে কেন খাওয়ানো হচ্ছে- এর কোনো সন্তোষজনক উত্তর পাওয়া যায়নি।
সাখাওয়াত হোসেন সুমন/আরএআর
