বিজ্ঞাপন

নোনাপানির প্রভাবে বাড়ছে অনাবাদি জমি, সুপেয় পানির সংকট

নোনাপানির প্রভাবে বাড়ছে অনাবাদি জমি, সুপেয় পানির সংকট

শরিফুল ইসলামের বয়স এখন চল্লিশ। মাত্র দশ বছর বয়সে বাবার হাত ধরে মাঠে নেমেছিলেন। বড় হয়ে নিজেই সংসারের হাল ধরেন। পারিবারিক ২০ বিঘা জমিতে ধান চাষ করে বছরে ২০০ মণের বেশি ধান উৎপাদন করতেন। সেই আয়েই চলত বাবা-মা ও দুই সন্তানসহ ছয় সদস্যের সংসার। কিন্তু সেসব এখন শুধুই স্মৃতি। নোনাপানির প্রভাবে বন্ধ হয়ে গেছে ধান চাষ।

গত সোমবার (২৭ এপ্রিল) সকালে কথা হয় বাগেরহাট জেলার রামপাল উপজেলার গিলাতলা গ্রামের এই বাসিন্দার সঙ্গে। 

তিনি বলেন, বছর দশেক ধরে আর ধান হয় না। এক সময় গোলা ভরা ধান থাকতো, এখন মুরগিকে খাওয়ানোর জন্যও বাজার থেকে ধান কিনতে হয়। বাঁধ কেটে নোনাপানি ঢোকানোর খেসারত দিতে হচ্ছে আমাদের। বাধ্য হয়ে এখন ঘেরে মাছ চাষ করি। কিন্তু একদিকে ভাইরাসের আক্রমণ, অন্যদিকে পানি মারাত্মক নোনা হয়ে যাওয়ায় মাছেও তেমন লাভ নেই।

একই এলাকার মেঠোপথে দেখা মেলে সালেহা বেগমের। বয়স পঁয়ত্রিশের কাছাকাছি। কোলে কলসিতে পানি নিয়ে ফিরছিলেন বাড়ির দিকে। কেমন আছেন জানতে চাইলে কণ্ঠে ঝরে পড়ে দীর্ঘ আক্ষেপ। বলেন, প্রায় দুই কিলোমিটার হেঁটে পানি আনলাম, তবু এই পানিও মিষ্টি না। বাধ্য হয়ে নোনাপানি খেতে হয়। পুকুরের পানি এত বেশি নোনা যে পশুপাখিও মুখ দেয় না। সেই পানিতেই আমরা গোসল করি, থালা-বাসন ধুই। পানির কারণে রোগের শেষ নেই।

একই উপজেলার হালদারপাড়া গ্রামের তরিকুল ইসলাম বলেন, আমার জমিতে আগে আমন ধান চাষ করতাম। প্রায় দশ বছর হলো তা বন্ধ। আগে এলাকার বেশিরভাগ মানুষ ধান চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করত, এখন সে দিন আর নেই। অনেক জমি অনাবাদি পড়ে আছে।

কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় মোট আবাদি জমির পরিমাণ ১ লাখ ১৮ হাজার ৮৫৮ হেক্টর। গত ১০ বছরে কমেছে ৬ হাজার ৬৫৫ হেক্টর। বছরওয়ারি অনাবাদি জমির পরিমাণ- ২০১৪-১৫ সালে ১২ হাজার ৩৭৯ হেক্টর, ২০১৫-১৬ সালে ১৩ হাজার ৩৮৬ হেক্টর, ২০১৬-১৭ সালে ১১ হাজার ১৪১ হেক্টর, ২০১৮-১৯ সালে ৯ হাজার ৮৫৩ হেক্টর, ২০১৯-২০ সালে ৯ হাজার ৬৮০ হেক্টর, ২০২০-২১ সালে ৯ হাজার ৫৪০ হেক্টর, ২০২১-২২ সালে ৯ হাজার ২৩০ হেক্টর, ২০২২-২৩ সালে ৯ হাজার ১২০ হেক্টর, ২০২৩-২৪ সালে ৮ হাজার ২৫০ হেক্টর এবং ২০২৪-২৫ সালে ৭ হাজার ৬৭২ হেক্টর। গত ১০ বছরে গড়ে মোট ১ লাখ ১০ হাজার ৭৩৫ হেক্টর জমি অনাবাদি থেকেছে।

মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের (এসআরডিআই) ২০১৫ সালের জরিপ অনুযায়ী, বাগেরহাট জেলার ৯টি উপজেলার মাটিতেই লবণের উপস্থিতি রয়েছে। তবে সদর, রামপাল, মোড়েলগঞ্জ ও মোংলা উপজেলায় লবণাক্ততার মাত্রা অত্যন্ত বেশি।

ফসল চাষ কমে যাওয়ায় পেশা ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন অনেকে। মোংলা উপজেলার চিলা এলাকার দিনমজুর বাবুল সরদার বলেন, আগে দৈনিক ৫০০ টাকা মজুরিতে ধান কাটতাম। এখন ধান চাষ না থাকায় সেই কাজ বন্ধ। এখন মাটির কাজ করি।

বাগেরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. মোতাহার হোসেন বলেন, লবণাক্ততার কারণে কৃষিজমির পরিমাণ কমছে। তবে উৎপাদন বাড়াতে নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে লবণসহিষ্ণু জাতের চাষের চেষ্টা চলছে।

সুপেয় পানির জন্য হাহাকার

শুষ্ক মৌসুমে বাগেরহাটের উপকূলীয় এলাকায় সুপেয় পানির সংকট চরম আকার ধারণ করে। গ্রামের মানুষকে মাইলের পর মাইল হেঁটে পানি আনতে হয়। এর ফলে ডায়রিয়াসহ পানিবাহিত নানা রোগের প্রকোপ বাড়ছে। ভূ-অভ্যন্তরীণ প্রতিবন্ধকতা ও কারিগরি সীমাবদ্ধতার কারণে জেলার ছয়টি উপজেলায় গভীর নলকূপ স্থাপন সম্ভব হচ্ছে না। অগভীর নলকূপের পানিও লবণাক্ত ও আর্সেনিকযুক্ত। ফলে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করাই এ অঞ্চলের মানুষের একমাত্র ভরসা।

রামপাল উপজেলার পেড়িখালি গ্রামের নূরজাহান বেগম বলেন, এক কলসি পানি আনতে যাওয়া-আসায় এক ঘণ্টার বেশি লেগে যায়। রান্নার জন্য প্রতিদিন চার কলসি পানি দরকার হয়। সকালে দুই কলসি, বিকেলে আরও দুইবার যাই। শুধু পানির জন্যই দিনের চার ঘণ্টার বেশি চলে যায়। আমাদের এই কষ্ট দেখার কেউ নেই।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের নভেম্বর পর্যন্ত বাগেরহাটে সুপেয় পানি নিশ্চিত করতে ৫০০ কোটি টাকার কাজ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ১০ হাজার ৩২০টি গভীর নলকূপ স্থাপন, ২৫ হাজার ৬০৬টি রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং সিস্টেম নির্মাণ, ১৫৫টি সোলার পিএসএফ, ৭৫টি ন্যানো ফিল্টার, ১০টি রিভার্স অসমোসিস প্ল্যান্ট, ১৯৫টি পুকুর পুনঃখনন, ১৬০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ওয়াশ ব্লক, ১৪০টি বিদ্যালয়ে সাবমার্সিবল পাম্পযুক্ত গভীর নলকূপ, ৭০ কিলোমিটার পাইপলাইন, ৩ হাজার ১০০টি পরিবারে পানির সংযোগ এবং একটি সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টসহ আরও নানা অবকাঠামো।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের বাগেরহাট কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী জয়ন্ত কুমার মল্লিক বলেন, বেশিরভাগ উপজেলায় ভূগর্ভস্থ পানিতে ক্লোরাইড ও আর্সেনিকের মাত্রা অত্যাধিক হওয়ায় গভীর নলকূপ কার্যকর নয়। রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং ও সোলার পিএসএফ পদ্ধতিতে কিছুটা সুরাহা হচ্ছে। তবে মিনি পাইপ ওয়াটার সাপ্লাই স্কিমের মাধ্যমে কমিউনিটিভিত্তিক পানি সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে উপকূলীয় এলাকার পানি সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব।

আরএআর