রাজশাহীর রাজতিলক সিনেমা হল। হলের প্রাক্তন ব্যবস্থাপক রফিকুল ইসলাম রফিক। রফিক ছোটবেলায় বাদাম বিক্রেতা হিসেবে কাজ শুরু করে হয়েছেন হলের ব্যবস্থাপক। দীর্ঘ ৩০ বছরের সিনেমা হলকেন্দ্রিক জীবনে চোখের সামনে সিনেমা হল জগতের উত্থান-পতনের রাজসাক্ষী তিনি। সিনেমা হলের মালিকানা পরিবর্তন, নামকরণের ইতিহাস এবং নব্বইয়ের দশকের সেই জমজমাট স্বর্ণযুগের স্মৃতি আজও মনে পড়ে এই সিনেমা হল শ্রমিকের।
রফিক আক্ষেপ করে বলেন, সিনেমা শিল্পের বর্তমান সংকটের পেছনে অশ্লীল চলচ্চিত্র, ডিশ লাইনের প্রভাব এবং ক্রমবর্ধমান টিকিটের মূল্য প্রধান কারণ। এক সময়ের সিনেমা হলের জৌলুস ছিল। জৌলুস ছিল হল সংশ্লিষ্ট লোক জনেরও। সিনেমা হলের জৌলুস হরানোর সঙ্গে সঙ্গে কর্মীদেরও জীবিকার তাগিদে ছিটকে পড়েছে বিভিন্ন কর্মে। তবে সেই উত্তেজনাপূর্ণ ও রোমাঞ্চকর আজও মনে পড়ে রফিক ও হাবিবুর রহমান ওরফে হাব্বারদের। সিনেমা হল বন্ধের পরে এখন নিদারুণ কষ্টে দিন কাটছে হাব্বারদের।
হাব্বারের (৬০) বাড়ি পবা উপজেলার কাটাখালীর বেলঘড়িয়া এলাকায়। তিনি কাটাখালীর রাজতিলক সিনমা হলের গেটম্যান ছিলেন। তার বেতন ছিল ৭০০ টাকা। তার বাড়িতে গিয়ে দেখা গেল, প্যারালাইজড হয়ে বিছানাগত তিনি। কথা বলার শক্তি হারিয়েছেন। সাহায্য ছাড়া উঠে বসতেও পারেন না। এখন স্ত্রী ও এক ছেলে সন্তান নিয়ে ধুঁকে ধুঁকে দিন কাটছে তার।
তার স্ত্রী জানান, ৩০-৩২ বছর আগে সিনেমা হলে তার স্বামী ৭০০ টাকা বেতন পেতেন। সেই টাকায় এক বস্তা চাল দিতেন আমার শ্বশুরের পরিবারে। আর দেবর ও বড় ভাইয়েরা দিতেন তরিতরকারি। এ দিয়ে চলত সবার সংসার। হল বন্ধের পরে দীর্ঘদিন বিভিন্ন কাজ করেছে। সবশেষে শ্যামপুর বালুর ঘাটে ২৫০ টাকায় দেখাশোনার কাজ করতেন উনি (স্বামী)। সেই টাকায় দুই ছেলের লেখাপড়া ও সংসার চলত কোনোমতে। এছাড়া হাব্বারের শ্বশুরবাড়ি নাটোর থেকে আসত চাল। এ নিয়ে সেই সময় ও এই সময় চলছে তাদের সংসার।
তিনি আরও বলেন, এতো দুঃখ-কষ্টের মধ্যে ছেলেটার সেনাবাহিনীতে চাকরি হলো। তখন আমাদের অভাবের সংসারে আর অভাব থাকল না। কিন্তু দুঃখের কপালে, আবার দুঃখ ফিরে এলো। ছেলেটা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে মারা গেল। সেই থেকে বিভিন্ন চিন্তা ভাবনায় স্ট্রোক করে বিছানাগত হয়ে গেলেন তিনি। এখন শুধু চেয়ে থাকা ছাড়া সে কিছুই বলতে পারে না। সিনেমা হল নিয়ে নানা স্মৃতির কথা আগে মাঝে মাঝেই বলত সে। এখন ছেলের অফিস থেকে প্রতিমাসে ১০ হাজার টাকা পাই। তারমধ্যে স্বামীর ওষুধ কিনতে লাগে মাসে সাত হাজার টাকা। সিনেমা হলের মানুষকে বিয়ে করে নিজের জীবন সিনেমায় পরিণত হয়ে গেছে।
জানা গেছে, রাজশাহী মহানগরীতে প্রেক্ষাগৃহ ছিল ছয়টি। এগুলোর মধ্যে অলকা পরবর্তী নাম স্মৃতি, কল্পনা পরবর্তী নাম উৎসব, স্নিগ্ধা পরবর্তী নাম উপহার এবং বর্ণালি ও লিলি। এছাড়াও মহানগরের উপকণ্ঠে কাটাখালীতে রাজতিলক এবং নওহাটায় বাবুল ও নগরের মোল্লাপাড়ায় লিলি। এগুলোর মধ্যে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রেক্ষাগৃহটি ছিল রাজশাহীর বর্ণালি সিনেমা হল। বর্তমানে শুধু রাজতিলক ছাড়া সব সিনেমা হল বন্ধ। আবার অনেকগুলো সিনেমা হলের অস্তিত্বই নেই।
সোমবার (২৭ এপ্রিল) কাটাখালীর রাজতিলক সিনেমা হলে প্রদর্শিত হচ্ছিল 'দম' সিনেমা। হলজুড়ে সিনেমা দেখছিল মাত্র পাঁচজন। এরমধ্যে একজন নারী ও চারজন পুরুষ। কয়েকজনের সঙ্গে কথা হলে তারা জানায়, 'সিনেমা মোটামুটি ভালো। তবে হলে দর্শক নেই। দর্শক অনলাইনে এখন সিনেমা বেশি দেখে। এছাড়া টিকিটের মূল্য বেশি।' জানা গেছে- হলটির রমরমা অবস্থায় ১২ থেকে ১৫ জন লোক বিভিন্ন পদে কাজ করতেন। আর প্রতি শুক্রবার চলত চারটা করে সিনেমা। এছাড়া প্রতিদিন চলত তিনটা সিনেমা। প্রায় সব সিনেমায় থাকত দর্শকে ঠাসা। ২০০৩ সালের দিকেও হলের কর্মচারীদের বেতন সর্বোচ্চ ১৫০০ টাকা বেতন ছিল।

কাটাখালী সিনেমা হলের সামনে দেখা হয়, রফিকুল ইসলাম রফিকের সঙ্গে। রাজতিলক হলে পুরো যৌবনকালটাই কেটেছে তার। তার জীবনকাহিনি বেশ বৈচিত্র্যময়। তিনি সিনেমা হলে বাদাম বিক্রি থেকে শুরু করে ম্যানেজার পর্যন্ত হয়েছিলেন। তিনি জানান, ১৯৯৮ সালের দিকে সিনেমা হলের ব্যবসা খুব রমরমা ছিল। যে ছবিই লাগানো হতো তা-ই হিট হতো। রাজতিলক সিনেমা হলটি রাজশাহীর আজিজ খান প্রথম ‘নতুন সিনেমা হল’ নামে চালু করেছিলেন। পরবর্তীতে এর মালিকানা পরিবর্তন হয়ে নায়ক আলমগীরের হাতে যায়। তিনি হলের নাম দেন 'আলমগীর ছবিঘর'। এরপর এসডি প্রোডাকশন এবং সর্বশেষ রাজশাহীর শহিদুল ইসলাম বাচ্চুরা এর মালিকানা গ্রহণ করেন এবং নাম দেন 'রাজতিলক'।
রাজতিলক সিনেমা হলের স্মৃতিচারণ করে রফিক বলেন, আমি সিনেমা হলে বাদাম বিক্রি করতাম। আজিজ খানের আমলে বগুড়ার এক ম্যানেজার ছিল ওনার নাম ছিল ইউসুফ। আমাকে খুব ভালোবাসতো, বলল যে, রফিক পড়াশোনা করবি? আমি বললাম হ্যাঁ পড়াশোনা করব, কারণ ফ্যামিলি থেকে আমাদের সমস্যা ছিল। তখন উনি উনার শালীকে নিয়ে আমাকে ক্লাস থ্রিতে ভর্তি করে দেয়। সকালে স্কুলে পড়াশোনা করি, আবার দুপুরের পরে হলে বাদাম বিক্রি করি। এভাবে পড়তে পড়তে জুটমিল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক (এসএসসি) পাস করি ১৯৯৩ সালে। পরে আদর্শ কলেজে ভর্তি হই। কলেজে পড়াকালে আমাকে ম্যানেজারের পোস্টে কাজ করার জন্য বলল। এখানে আরো অনেক সিনিয়র ভাইয়েরা ছিল, যারা আমাকে মেনে নিতে পারতো না, যে সিনেমা হলে বাদাম বেচতে বেচতে আজকে সিনেমা হলের ম্যানেজার।
ব্যবসার হ্যান্ড চেঞ্জ হতে হতে লাস্টে বাচ্চু সাহেবরা নাম দিল 'রাজতিলক' উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রথমে হলের নাম ছিল 'নতুন সিনেমা হল', পরে হলো 'আলমগীর ছবিঘর', সেখান থেকে এসে হলো 'রাজতিলক'। শুক্রবার হলেই দর্শকের যে একটা চাপ থাকতো টিকিটের জন্য, মারামারি টিকিট নেওয়ার জন্য এটা হবেই। আমরা স্টাফদের সুবিধার জন্য কিছুটা সাইড দিতাম। আগে মিন্টু, আলমগীর কুমকুম বা কাজী হায়াতের মতো পরিচালকদের ছবির একটা মানুষের ডিমান্ড থাকতো। এখন নতুন নতুন পরিচালকের ছবির কাহিনি বোঝা যায় না যে কোত্থেকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে।
বর্তমান রাজতিলক সিনেমা হলে প্রথম সিনেমা হচ্ছে 'গরমিল'। রফিক বলেন, ওইদিন এক প্যাকেট করে জিলাপি দিয়েছিল, সেটাও আমরা খাইছি। আমার বাবা ১৯৯২ সালে মারা যান, উনি জুটমিলে চাকরি করতেন। আমরা চার ভাই হলে বাদাম বিক্রি করছি, গ্যারেজ চালিয়েছি, হলটাকে পুরাটাই নিয়ন্ত্রণ করতাম আমরা। ২০০৩-এর দিকে আমি সিনেমা হল থেকে বের হয়ে আসছি। প্রায় ৩০ বছরের মতো সময় আমি সিনেমা হলে কাটিয়েছি। যদিও আমি এখন ঠিকাদারি কাজ করি। তবে হলের সঙ্গে একসময় যারা জড়িত ছিলে তাদের কষ্টে দিন যাচ্ছে। এদের মধ্যে অনেকে মারাও গিয়েছে।
রাজতিলক সিনেমা হলে স্মরণীয় মারামারির ঘটনা তার আজও মনে পড়ে বলে তিনি জানান, একবার ডিবি অফিস থেকে কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা রাজতিলক সিনেমা হল (তৎকালীন নাম অনুযায়ী) থেকে কয়েকজনকে তুলে নিয়ে যাওয়ার জন্য এসেছিলেন। সেই সময় হলের ভেতরে দর্শকদের সঙ্গে পুলিশের একটি ঝামেলা বা বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছিল। তখন সঙ্গে পুলিশকে বলা হয়, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র বা পেপার ছাড়া তারা কাউকে নিয়ে যেতে পারবেন না। তিনি এই ঘটনাটিকে তার জীবনের একটি অত্যন্ত স্মরণীয় মুহূর্ত হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, সেই সময়ে সিনেমা হল থেকে কাউকে এভাবে ধরে নিয়ে যাওয়ার এখতিয়ার পুলিশের ছিল না। রফিক আরও জানান যে, সেই আমলে 'ফিল্ম ট্রেড' বা চলচ্চিত্র জগতের বিশাল ক্ষমতা ও প্রভাব ছিল, কারণ তারা সরকারকে প্রচুর রাজস্ব পেত।
তিনি বলেন, ১৯৯৮ সালের দিকে সিনেমাহলের ব্যবসা ছিল তুঙ্গে। বিশেষ করে শুক্রবার মানেই ছিল দর্শকদের উপচে পড়া ভিড় এবং টিকিট পাওয়ার জন্য রীতিমতো মারামারি ও হুড়োহুড়ি লেগে যেত। তখন যে ছবিই মুক্তি পেত, সেটিই 'হিট' হতো। সেই সময়ের পরিচালক যেমন- মিন্টু, আলমগীর কুমকুম বা কাজী হায়াতের ছবির ব্যাপক চাহিদা ছিল। তাদের সিনেমার গল্পগুলো ছিল গোছানো এবং দর্শক সহজেই বুঝতে পারত এর পরে কী হতে যাচ্ছে। ফলে দর্শকদের মধ্যে সিনেমা দেখার প্রতি একটি বিশেষ আকর্ষণ বা ‘ডিমান্ড’ কাজ করত। এখন এমন সিনেমা পাওয়া যায় না।
রাজতিলক সিনেমা হলে বর্তমানে কাজ করছেন আক্কাস আলী। তিনি সাবেক মালিক শহিদুল ইসলামের সময়ে হলে কাজ করেছেন। এরপরে দীর্ঘ সময় বন্ধ ছিল হলটি। সেই সময় তিনি বেকার ছিলেন। আক্কাস আলী বলেন, সিনেমা হলে তেমন দর্শক নেই। তারপরে প্রতিদিন সিনেমা চালানো হচ্ছে। সিনেমা চালানোর যে খরচ, সে টাকা ওঠে না। ফলে কোনো রকমে সংসার চলছে।
কাটাখালী রাজতিলক সিনেমা হলের মালিক সাজ্জাদ হোসেন সাগর বলেন, হল কোনমতে চলছে। আমাদের এখানে বেশ কয়েকজন কাজ করছে। শুনেছি আগে অনেকেই কাজ করত, এখনও কয়েকজন কাজ করছে। শুনেছি অনেকে মারা গেছে। এদের মধ্যে বেলঘরিয়ার হাব্বার প্যারালাইস্টড হয়ে বিছানাগত। অনেক কষ্টে দিন কাটছে তার।
তিনি বলেন, এই ঐতিহ্যবাহী বিনোদন মাধ্যমটিকে টিকিয়ে রাখতে সাধারণ দর্শকদের নিয়মিত সিনেমা হলে আসা একান্ত প্রয়োজন। বর্তমান সময়ে হলের ব্যয়ভার মেটাতে শতভাগ দর্শক না হলেও অন্তত ২০ শতাংশ দর্শক উপস্থিতি কাম্য বলে তিনি উল্লেখ করেন। কেবল নির্দিষ্ট বড় তারকাদের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে সব ধরনের অভিনয়শিল্পীদের চলচ্চিত্র দেখার জন্য তিনি দর্শকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। ভালো মানের সিনেমার অভাব এবং দর্শকদের অনাগ্রহের কারণে এই শিল্পটি হুমকির মুখে রয়েছে বলে তিনি সতর্ক করেছেন।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক গীতিকবি ও প্রামাণ্য চলচ্চিত্র নির্মাতা সাজ্জাদ বকুল বলেন, রাজশাহী সিনেমা হলগুলো বন্ধ হয়ে বিপণি বিতান গড়ে উঠেছে। অনেকে কর্ম হারিয়েছেন, সর্বশেষ ২০১৮ সালে উপহার সিনেমা হলটি বন্ধ হয়ে যায়। কাটাখালীতে রাজতিলক সিনেমা হল চালু হয়েছে, তবে এখনো সেখানে সেভাবে সাড়া পড়ে না। আশা করি, সিনেমা হলটি আরও ভালোভাবে চলুক, আরও নতুন নতুন সুন্দর গল্পের সিনেমা আসুক।
এসএইচএ
