বিজ্ঞাপন

‘যন্ত্রনির্ভরতায় বদলাচ্ছে কর্মসংস্থান, টিকে থাকতে প্রয়োজন দক্ষতা’

‘যন্ত্রনির্ভরতায় বদলাচ্ছে কর্মসংস্থান, টিকে থাকতে প্রয়োজন দক্ষতা’

‎প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার ও যন্ত্রনির্ভরতার কারণে ঝালকাঠিতে কর্মসংস্থানের চিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। আগে যেসব কাজ একাধিক মানুষের মাধ্যমে সম্পন্ন হতো, এখন সেগুলো অল্প সময়েই কম জনবল, একজন দক্ষ কর্মী ও প্রযুক্তি ব্যবহারের মধ্যে দিয়ে করা সম্ভব হচ্ছে। এতে উৎপাদনশীলতা বাড়লেও অদক্ষ শ্রমজীবী মানুষের জন্য কাজের সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে।

ঝালকাঠি ‎জেলা শহরের রাস্তায় ইজিবাইক ও ব্যাটারিচালিত যানবাহনের সংখ্যা বাড়ায় প্যাডেলচালিত রিকশাচালকদের আয় কমে গেছে। শহরের বাসিন্দা রিকশাচালক আব্দুল জলিল বলেন, ‘আগে দিনে ৮০০-৯০০ টাকা আয় হতো, এখন ইজিবাইকের কারণে ৪০০-৫০০ টাকাও হয় না। অনেক সময় খালি হাতেই ফিরতে হয়।’

‎নির্মাণ ও মাটি কাটার কাজেও একই চিত্র। আগে পুকুর খনন, জমি ভরাট বা খাল কাটার কাজে বিপুল সংখ্যক দিনমজুর কাজ পেতেন। বর্তমানে এস্কেভেটর বা ভেকু মেশিন ব্যবহারের ফলে অল্প সময়েই কাজ শেষ হচ্ছে। দিনমজুর রহিম হাওলাদার বলেন, ‘আগে একেকটা কাজ কয়েকদিন চলত, এখন মেশিনে একদিনেই শেষ। আমাদের কাজ কমে গেছে।’

‎ইট, বালু ও নির্মাণসামগ্রী পরিবহনেও প্রযুক্তির প্রভাব পড়েছে। ট্রলি ও ডাম্প ট্রাক ব্যবহারের কারণে মালামাল ওঠানো-নামানোর জন্য অতিরিক্ত শ্রমিকের প্রয়োজন পড়ছে না। একইভাবে কৃষি খাতে ধান কাটার হারভেস্টার, থ্রেশার ও স্প্রে মেশিন ব্যবহারের ফলে মৌসুমি শ্রমিকদের কাজ কমে গেছে।

‎‎শহরের বাজার ও ক্ষুদ্র ব্যবসাতেও পরিবর্তন স্পষ্ট। ডিজিটাল ওজন মেশিন, মোবাইল ব্যাংকিং ও কিউআর কোডভিত্তিক লেনদেনের কারণে আগের মতো অতিরিক্ত কর্মচারীর প্রয়োজন হচ্ছে না। পাশাপাশি অনলাইন কেনাবেচা বাড়ায় ছোট ব্যবসায়ীরাও চাপের মুখে পড়ছেন।‎

‎ফটোকপি, স্টুডিও ও টাইপিং ব্যবসায় যুক্তদের অবস্থাও আগের মতো নেই। স্মার্টফোন ও ব্যক্তিগত প্রিন্টার ব্যবহারের কারণে এসব সেবার চাহিদা কমে গেছে।

‎তবে, প্রযুক্তির এই পরিবর্তনের মধ্যে নতুন ধরনের কাজের সুযোগও তৈরি হচ্ছে। ইজিবাইক চালানো, ব্যাটারি ও মোটর মেরামত, মোবাইল সার্ভিসিং বা অনলাইন ব্যবসার মতো কাজে অনেকেই যুক্ত হচ্ছেন। শহরের এক তরুণ মেকানিক সোহেল হাওলাদার বলেন, ‘আগে কাজ জানতাম না, এখন ইজিবাইকের বডি আর মোটর মেরামত শিখে ভালোই আয় করছি।’

‎শিক্ষিত তরুণদের মধ্যেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। শুধু সনদ থাকলেই চাকরি পাওয়া যাচ্ছে না, প্রয়োজন বাস্তবমুখী দক্ষতা। অনেকেই এখন ফ্রিল্যান্সিং, ডিজিটাল মার্কেটিং বা অনলাইনভিত্তিক কাজে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করছেন।

‎এ পরিবর্তনের প্রভাব পড়ছে নারী শ্রমজীবী মানুষের ওপরও। আগে অনেক নারী বাড়িতে বসে সেলাই, হাতের কাজ, কৃষিকাজ বা বিভিন্ন ছোটখাটো উৎপাদনমূলক কাজে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু বাজারে তৈরি পণ্যের সহজলভ্যতা ও আধুনিক মেশিনের কারণে এসব কাজের চাহিদা কমে গেছে। ফলে অনেক নারী আগের মতো আয় করতে পারছেন না এবং আর্থিকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন।

‎প্রযুক্তির এই পরিবর্তনের মধ্যেই নারীদের জন্য নতুন সুযোগও তৈরি হচ্ছে। অনেকে এখন ঘরে বসেই অনলাইন ব্যবসা, ফেসবুক পেজের মাধ্যমে পণ্য বিক্রি, মোবাইল ব্যাংকিং সেবা বা হস্তশিল্পের ডিজিটাল বিপণনের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন। যারা এসব কাজে দক্ষতা অর্জন করছেন, তারা পরিবারে অর্থনৈতিকভাবে অবদান রাখার পাশাপাশি স্বাবলম্বী হচ্ছেন। 

‎এই পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে চেষ্টা করছেন অনেক নারীও। শহরের বাসিন্দা গৃহিণী ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা রিনা আক্তার বলেন, ‘আগে হাতে সেলাই করে কিছু আয় করতাম, এখন সেই কাজের চাহিদা কমে গেছে। পরে অনলাইনে কাপড় বিক্রি শুরু করেছি। শুরুতে কঠিন ছিল, কিন্তু এখন ধীরে ধীরে ভালোই চলছে।’

‎সব মিলিয়ে প্রযুক্তির অগ্রগতি ঝালকাঠির অর্থনীতিতে গতি আনলেও কর্মসংস্থানে তৈরি করছে নতুন বাস্তবতা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সময়ের সঙ্গে খাপ খাইয়ে দক্ষতা অর্জনই এখন টিকে থাকার প্রধান শর্ত। নইলে অদক্ষ শ্রমজীবী মানুষের জন্য ঝুঁকি আরও বাড়বে।

‎এ বিষয়ে বিসিক ঝালকাঠি জেলা কার্যালয়ের উপব্যবস্থাপক মো. আল আমিন বলেন, ‘প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শ্রমবাজারের ধরনও বদলে যাচ্ছে। অদক্ষ শ্রমিকদের জন্য কাজের সুযোগ কমে গেলেও যারা প্রশিক্ষণ নিয়ে দক্ষতা অর্জন করছেন, তাদের জন্য নতুন নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। তাই তরুণ ও শ্রমজীবী মানুষকে সময়ের চাহিদা অনুযায়ী প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা অর্জনে এগিয়ে আসতে হবে।’

‎জেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা দিলরুবা খানম বলেন, ‘প্রযুক্তির এই পরিবর্তনের প্রভাব নারীদের ওপরও পড়ছে। অনেক নারী আগের মতো প্রচলিত কাজ থেকে আয় করতে পারছেন না। তবে আমরা বিভিন্ন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নারীদের অনলাইন ব্যবসা, হস্তশিল্পের আধুনিকায়ন ও প্রযুক্তিনির্ভর কাজের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করছি। সঠিক প্রশিক্ষণ পেলে নারীরাও এই পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারবেন।’

ঝালকাঠি সরকারি কলেজের রসায়ন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আশিস কুমার হালদার বলেন, অটোমেশন, ডিজিটালাইজেশন, কম খরচে বেশি উৎপাদনের প্রবণতা এবং দক্ষতার ঘাটতি—এই চারটি কারণে শ্রমবাজারে এই পরিবর্তন ঘটছে। ফলে একদিকে দক্ষ কর্মীদের চাহিদা বাড়ছে, অন্যদিকে অদক্ষদের জন্য কাজের সুযোগ কমছে।

‎ঝালকাঠি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের অধ্যক্ষ শামীম আহমেদ বলেন, ‘বর্তমান সময়ে শুধু সনদ থাকলেই চাকরি পাওয়া যাচ্ছে না, প্রয়োজন হাতে-কলমে দক্ষতা। আমাদের কেন্দ্রে বিভিন্ন টেকনিক্যাল ট্রেডে প্রশিক্ষণ নিয়ে অনেকেই ইজিবাইক মেরামত, ইলেকট্রিক কাজ, মোবাইল সার্ভিসিংসহ বিভিন্ন পেশায় যুক্ত হচ্ছেন। যারা সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দক্ষতা অর্জন করছে, তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।’

এসএইচএ