কাম করলে খাওয়া জোটে, না করলে উপোস, এটাই দিনমজুর মনিরুজ্জামান মনিরের জীবনের সরল কিন্তু নির্মম বাস্তবতা। বিশ্ব শ্রমিক দিবসে যখন শ্রমিক অধিকারের কথা উঠে আসে, তখন শেরপুরের এই শ্রমজীবী মানুষের কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন থাকে পরের দিনের খাবার জুটবে তো? প্রতিদিনের অনিশ্চয়তা আর সংগ্রামের মধ্যেই কাটছে তার জীবন।
শেরপুর সদর উপজেলার মধ্য শেরী এলাকার বাসিন্দা মনিরুজ্জামান মনির (৪৯)। বয়স প্রায় ৫০ ছুঁইছুঁই। প্রতিদিন সকাল হলেই তার শুরু হয় জীবনযুদ্ধ। কাজের খোঁজে বের হয়ে কখনও রিকশা চালান, কখনও দিনমজুর হিসেবে পাহাড়ে কাজ করেন, আবার কখনও রং মিস্ত্রির কাজ। যে কাজ পান, সেটাই করেন শুধু পরিবারটাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য।
রোদে পোড়া মুখ, চোখে ক্লান্তি তবুও থামে না তার হাত। কারণ তিনি জানেন, একদিন কাজ না করলে বন্ধ হয়ে যাবে সংসারের চুলা, থেমে যাবে অসুস্থ বাবার চিকিৎসা। জীবনের শুরু থেকেই সংগ্রাম তার নিত্যসঙ্গী। সম্প্রতি চিকিৎসার অভাবে মারা গেছেন তার মা। এখন পরিবারের পুরো দায়িত্ব তার কাঁধে। নিজের সংসার চালানোর পাশাপাশি বাবার চিকিৎসা ও ওষুধের খরচও তাকেই বহন করতে হয়।
কিন্তু কয়েকদিন ধরে টানা ঝড়-বৃষ্টিতে বন্ধ রয়েছে দিনমজুরের কাজ, নেই রং মিস্ত্রির কাজও। তাই বাধ্য হয়ে ভাড়ায় অটোরিকশা চালিয়ে কোনোভাবে দিন পার করছেন তিনি।
মনিরুজ্জামান মনির বলেন, আমাদের মতো গরিব মানুষকে কে দেখে? আমরা তো কারও কিছু না। একদিন কাজ না করলে না খাইয়া থাকতে হয়। কোনো সরকারি ভাতা পাই না। নিজের জমিজমা নাই, নিজের বলতে শুধু একটা ঘর।
আবেগাপ্লুত কণ্ঠে তিনি বলেন, কিছুদিন আগে আমার মা মারা গেল। ঠিকমতো চিকিৎসা করাতে পারি নাই। নিজেরাই চলতে পারি না, চিকিৎসা করামু কীভাবে?
তিনি জানান, মাকে শেরপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি করালেও সঠিক চিকিৎসা পাননি। ডাক্তার আসে তো আসে না, কয়দিন ভর্তি ছিল নামের ওষুধ দিয়েই শেষ, আর কোনো খোঁজ নাই।
শুধু তাই নয়, বাবার বয়স্ক ভাতার কার্ড করাতেও ঘুরতে হচ্ছে এই অফিস থেকে ওই অফিসে । ‘সমাজসেবা অফিসে গেছিলাম, তারা বলল, পৌরসভায় যান। আইডির ফটোকপি জমা দিলাম, বাবাকে নিয়ে ঘুরলাম। দুই বছর হয়ে গেল, কোনো কার্ড পাই নাই,’ বলেন তিনি।
তার কথায় ফুটে ওঠে এক নিঃসঙ্গ বাস্তবতা আমার জীবনটাই কষ্ট দিয়ে শুরু, সুখ বলতে কিছু নাই। কাম করি, খাই এইটাই জীবন। আমরা গরিব মানুষ, আমাদের জন্য কেউ নাই।
বিশ্ব শ্রমিক দিবস সম্পর্কে জানতে চাইলে তার সরল জবাব, শ্রমিক দিবস বুঝি না। বুঝি কাম করলে টাকা পামু, টাকা পাইলে খাওন আর বাপের ওষুধ পামু।
স্থানীয় বাসিন্দা রাজিব বলেন, মনির ভাইকে অনেক বছর ধরে চিনি। খুব আত্মসম্মানী মানুষ। কষ্টে থাকলেও কারও কাছে চাইতে দেখিনি। বয়স বাড়ায় এখন আগের মতো কাজ করতে পারেন না। তবুও নিজের চেষ্টায় সংসার চালান। আমরা যতটুকু পারি পাশে দাঁড়াই।
এ বিষয়ে শেরপুর সদর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা আরিফুর রহমান বলেন, মনিরুজ্জামানের মতো শ্রমিকদের শ্রমের মূল্য অনেক। কিন্তু আমরা তাদের যথাযথ মূল্যায়ন করতে পারি না। শ্রমজীবী মানুষদের কারণেই দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। তাদের পাশে দাঁড়ানো আমাদের সবার দায়িত্ব।
তিনি আরও বলেন, তার বাবার বয়স্ক ভাতার বিষয়ে যে সমস্যার কথা শুনলাম, সেটি দ্রুত সমাধানের চেষ্টা করা হবে।
মে দিবস আসে, আবার চলে যায়। শহরে মিছিল হয়, দেয়ালে পোস্টার লাগে, বক্তৃতা হয়। কিন্তু মনিরদের জীবনে খুব একটা পরিবর্তন আসে না। অনেকেই জানেন না, এই দিনটি তাদের অধিকার আদায়ের দিন হিসেবে পালিত হয়। কারণ তারা অধিকার নয়, ভাবেন পরের দিনের খাবার নিয়ে।
মনিরদের জীবনের গল্প আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় এই সমাজে এখনও অনেক শ্রমিক বেঁচে আছেন প্রতিদিনের লড়াইয়ে।
এই মে দিবসে তাদের জন্য বড় কোনো আয়োজন নয়, প্রয়োজন সম্মানজনক জীবনের স্বীকৃতি। প্রয়োজন নিরাপদ কর্মপরিবেশ, ন্যায্য মজুরি এবং ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা। যে ঘামে এই সমাজ বেঁচে থাকে, সেই ঘামের মূল্য যেন একদিন সত্যিই দেওয়া হয়।
নাইমুর রহমান তালুকদার/এসএইচএ
