নেত্রকোণার আটপাড়া উপজেলার সুমাইখালী হাওরের ষাটোর্ধ্ব চাষি লতিফ মিয়া। কোমর পানিতে দাঁড়িয়ে ডুব দিয়ে দিয়ে ধান কাটছিলেন তিনি। কতটুক ধান কাটতে পেরেছেন? জানতে চাইলে আক্ষেপ করে তিনি বলেন, ‘হাওরে ধান লাগাইছিলাম, এটা এহন পানির নিচে। অহন যতটুক সম্ভব ডুব দিয়া দিয়া নিজেরা ধান কাইট্টা যতানি পারি নিতাছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘ঋণ কইরা গিরস্তি করছি, আগে তো খাইয়া বাছন লাগবো, পরে হইল ঋণের হিসাব। আমরার হাজার হাজার মণ ধান পানির নিচে। পানির নিচে ডুবাইয়া যা পারতাছি তুলতাছি। কয়টা খাওন তো লাগবো। অহন কী খাইবাম এটা হলো বড় চিন্তা। ঠান্ডায় কাঁপতাছি, কথা কইতে পারতাছি না, কিন্তু ডুবাইয়া ধান কাডন লাগতাছে, আমরা এইরম সুহে আছি।’
ভারী বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে চোখের সামনে তলিয়ে যাচ্ছে নেত্রকোণার হাওরাঞ্চলের কৃষকদের স্বপ্ন। জেলার বিভিন্ন হাওর-বিল প্লাবিত হয়ে পড়েছে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন বোরো ধান চাষিরা, যাদের জীবিকার একমাত্র ভরসাই এই ফসল। হাওরের শান্ত পরিবেশ এখন কৃষকদের আহাজারিতে ভারি হয়ে উঠেছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত পানির নিচে নিমজ্জিত রয়েছে ৭ হাজার ৫৪৫ হেক্টর জমির ধান। যেগুলো খুবই ঝুঁকির মধ্য রয়েছে। এসব জমির ধান মেশিন দ্বারা কোনো ভাবেই কর্তন করা সম্ভব নয়।
অথচ দুদিন আগেও এসব হাওরে পাকা-আধাপাকা ধান দেখে চোখ জুড়িয়ে যেত। কিন্তু আজ সেখানে শুধু বন্যার পানি। আর তার নিচে ডুবে আছে কৃষকের একমাত্র বেঁচে থাকার সম্বল। কিছু জয়গায় ধানের কিছু শীষ এখনো পানির সঙ্গে লড়াই করে দাঁড়িয়ে আছে।
পানিতে নেমে পরিবার-পরিজনসহ দিন-রাত পরিশ্রম করেও শেষ রক্ষা হচ্ছে না। এ দৃশ্য এখন জেলার বিভিন্ন হাওরে। সবাই নৌকা নিয়ে ব্যস্ত শেষ সম্বলটুকু রক্ষা করতে। তবে শুকনো জায়গায় তুললেও নতুন দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে রোদ। কারণ গত কয়েকদিন রোদের খুব একটা দেখা পাওয়া যাচ্ছে না।
জেলার আটপাড়া উপজেলার সুমাইখালী ও গণেশের হাওর। মদন উপজেলার উচিতপুর-গোবিন্দশ্রী হাওর। মোহনগঞ্জ উপজেলার ডিঙ্গাপোতা, তেঁতুলিয়া, বরান্তর হাওর। খালিয়াজুরী উপজেলার বোয়ালী, কৃষ্ণপুর, জগন্নাতপুর হাওরে উঠতি বোরো ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। কলমাকান্দা ও দুর্গাপুর উপজেলায় বেশ কিছু নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েও ফসলের ক্ষতি করেছে।
বর্তমানে পরিস্থিতি এমন যে, ধান এখনই কাটতে না পারলে অবশিষ্ট অংশটুকুও কৃষক ঘরে তুলতে পারবেন না। কিন্তু বর্তমানে ধান কাটার লোকের খুব চাহিদা থাকায় শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে আধাপাকা ধান কেটে ফেলছেন, যেন অন্তত কিছুটা ফসল রক্ষা করা যায়। তবে বাকি ধান ঘরে তোলা এখন অনেকের কাছেই স্বপ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই হাওরেই ধানের আবাদ করেছিলেন মধ্যবয়সী জমিলা খাতুন। স্বামী নেই জমিলার, সন্তানকে নিয়ে যতটুক সম্ভব ডুব দিয়ে ধান কেটে ঘরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। কষ্ট আর অভিযোগে সুরে তিনি বলেন, ‘অল্প একটু জায়গা লাগাইছিলাম, বন্যায় নিছেগা। ঘরে ভাত নাই, ৫০ টেহা কেজি ধরে ৪ কেজি চাউল কিইন্যা আনছি।’
আফরোজ আক্তার নামে আরেক কৃষাণী বলেন, ‘একটু জমির ওপরে নির্ভর করে চলি। আমরা যে চুলবাম এই রাস্তাও নাই। এহন বাচ্চা-কাচ্চা কীভাবে বাঁচামু এটাই বুঝি না। অসুখ-বিসুখ হইলে কেমনে কী করবাম? আমরা যে চলমু এই ব্যবস্থা নাই। এক রাতের মধ্যে পুরা বন্যা হইয়া গেছে।’
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আমিরুল ইসলাম ঢাকা পোস্টকে বলেন, চলতি বোরো মৌসুমে হাওরাঞ্চলে মোট এক লাখ ৮৫ হাজার ৪৭ হেক্টর জমিতে ধান আবাদ করা হয়েছিল। এর মধ্যে নিমজ্জিত রয়েছে ৭ হাজার ৫৪৫ সেক্টর জমির ধান। যেগুলো খুবই ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে, যা দ্রুত কর্তন করা জরুরি। এসব জমির ধান মেশিন দ্বারা কোনোভাবেই কর্তন করা সম্ভব নয়। ইতিমধ্যে হাওরের ৬৮% ধান কাটা হয়েছে। আর জেলায় মোট আবাদের ২৯ শতাংশ ধান এখন পর্যন্ত কাটা হয়েছে।
চয়ন দেবনাথ মুন্না/আরএআর
