জন্মের মাত্র ২১ দিনের মাথায় মা ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। দুই বছর বয়সে এসে উন্মত্ত জনতার পিটুনিতে প্রাণ হারালেন বাবাও। ফরিদপুরের ছোট্ট শিশু মুসলিমা ইসলামের (২) পৃথিবীটা এখন পুরোপুরি জনমানবহীন এক মরুভূমি। বৃদ্ধ দাদা-দাদি ছাড়া তার আর কেউ রইল না। কিন্তু যাদের নিজের জীবনের প্রদীপই নিভু নিভু, সেই দাদা-দাদির চোখে এখন সন্তানের শোকের চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে নাতনি মুসলিমার ভবিষ্যৎ নিয়ে অন্তহীন উদ্বেগ।
গতকাল শুক্রবার রাতে ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার তালমা ইউনিয়নের বিলনালিয়ার নতুন বাজার এলাকার নতুন হাটখোলায় এক ভয়াবহ ‘মব জাস্টিস’-এর শিকার হন ট্রাকচালক হান্নান শেখ (৪৫)। তিনি বোয়ালমারী উপজেলার সাতৈর ইউনিয়নের সাতৈর গ্রামের শহিদ শেখের ছেলে।
শনিবার হান্নান শেখের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় শোকের মাতম। তবে দুই বছরের মুসলিমা এখনও বুঝতে পারছে না, সে সারা জীবনের জন্য কী হারালো। স্বজনদের আহাজারি আর উৎসুক মানুষের ভিড়ের মাঝে কখনও দাদির কোলে, কখনও প্রতিবেশীদের কোলে ঘুরছে সে। ফিডারে দুধ খাচ্ছে, আবার চেনা মুখগুলো ডুকরে কেঁদে উঠলে সেও হঠাৎ হাউমাউ করে কেঁদে উঠছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার (১ মে) রাত ১০টার দিকে বিলনালিয়া নতুন হাটখোলা এলাকায় একটি দ্রুতগতির ট্রাক ২০ জন পথচারীকে ধাক্কা দিয়ে হত্যা করেছে—এমন একটি খবর ফেসবুক লাইভে ছড়ানো হয়। এ খবরে ওই এলাকার সবদিকে ছড়িয়ে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে গুজব ডালপালা মেলে যে, ট্রাকটি ২০ জনকে চাপা দিয়েছে। এই উত্তেজনার জেরে স্থানীয়রা রাস্তায় ইট ও ব্লক ফেলে ট্রাকটি আটকে দেয়। এরপর চালক হান্নান শেখকে টেনেহিঁচড়ে নামিয়ে বেধড়ক মারধর করা হয়। মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
এ ঘটনায় ট্রাকের দুই সহকারী নাঈম (২২) ও আল-আমিন (২৫) আহত হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
নিহতের পরিবার জানায়, মুসলিমার জন্মের মাত্র ২১ দিন পর তার মা আরিফা বেগম হান্নান শেখকে ডিভোর্স দিয়ে অন্য জায়গায় চলে যান। সেই থেকে দাদা শহিদ শেখ ও দাদি নার্গিস বেগমই তাকে আগলে রাখতেন। হান্নান শেখই ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি।
দাদি নার্গিস বেগম কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, ‘মা ২১ দিনেই ফেলে গেছে, এহন বাপডারেও শ্যাষ কইরা দিল। আমার মুসলিমার কেউ রইল না। আমি মইরা গেলে এই মাসুম বাচ্চার কী হইব?’
নিহতের পিতা শহিদ শেখ ক্ষোভ ও আক্ষেপ নিয়ে বলেন, ‘আমার ছেলে যদি অপরাধ করে থাকে, তাকে পুলিশের হাতে দিত। কিন্তু গুজব ছড়াইয়া ওরে পিটাইয়া মাইরা ফেলল। এখন এই এতিম শিশুর ভবিষ্যৎ কী? ওরে দেখবে কে?’
নগরকান্দা সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) মাহমুদুল হাসান জানান, মরদেহ ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জহির হোসেন/এসএইচএ
