বিজ্ঞাপন

বৃষ্টির শঙ্কায় মাঠে পাকা ধান, দুশ্চিন্তায় যশোরের কৃষকরা

বৃষ্টির শঙ্কায় মাঠে পাকা ধান, দুশ্চিন্তায় যশোরের কৃষকরা

দিগন্ত জোড়া ফসলের মাঠ। সোনালি রোদ আর হিমেল হাওয়ায় দোল খাচ্ছে কৃষকের সোনালি স্বপ্ন। সবুজ বর্ণ থেকে সোনালি বর্ণে রূপ নিয়েছে অনেক আগেই। কথা ছিল ধান কেটে ঘরে তোলার। তবে সেই স্বপ্ন এখন অপেক্ষায় রূপ নিয়েছে। এ চিত্র যশোরের প্রতিটি উপজেলায়।

চলতি মৌসুমের শেষ দিকে এসে প্রতিনিয়ত বৃষ্টির আশঙ্কায় পাকা ধান কাটতে দেরি করছেন কৃষকরা। আকাশে মেঘের আনাগোনা আর মাঝে-মধ্যে বৃষ্টির কারণে মাঠের ধান নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে তাদের। আবার ধান কাটার পর কিছু কিছু জায়গায় হঠাৎ বৃষ্টিতে পানি জমে ক্ষতির মুখেও পড়েছেন চাষিরা। এছাড়া আবহাওয়া স্থিতিশীল হলে মাঠের সব ধান একসঙ্গে কাটতে হবে। সে সময় শ্রমিক সংকটের কথা কৃষকদের আরও ভাবিয়ে তুলছে।

কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে যশোর জেলায় প্রায় ১ লাখ ৫৭ হাজার ৯৫০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। এর অধিকাংশ ধান কাটার উপযুক্ত মৌসুম হলেও আকস্মিক বৃষ্টিপাত হলে পাকা ধান ভিজে নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে। ফলে অনেক কৃষকই ঝুঁকি না নিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেখে দ্রুত ধান কাটার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে ধান কাটার পর দ্রুত শুকানোর ব্যবস্থা রাখতে বলা হয়েছে, যাতে বৃষ্টির ক্ষতি কমানো যায়।

যশোরের সদর, অভয়নগর, কেশবপুর ও ঝিকরগাছা উপজেলার মাঠে দেখা গেছে, মাঠের পর মাঠ জমিতে ধান সম্পূর্ণ পেকে গেলেও এখনও কাটেননি কৃষকরা। কেউ কেউ কাটলেও অধিকাংশই অপেক্ষায় রয়েছেন আবহাওয়া স্থিতিশীল হওয়ার। আবার কেউ কেউ ধান কাটলেও বৃষ্টিতে তা পানির নীচে তলিয়ে গেছে। সেগুলো পানি থেকে উপরে তুলতে ব্যস্ত সময় পার করছেন নারী-পুরুষরা।

স্থানীয় কৃষকরা জানান, ধান পুরো পেকে গেছে। কিন্তু এখন কেটে ফেললে যদি বৃষ্টি হয়, তাহলে শুকাতে না পেরে ধান নষ্ট হয়ে যাবে। তাই ঝুঁকি নিতে চাই না। ঝিকরগাছার পদ্মপুকুর মাঠে ১৫ কাঠা ধান চাষ করেছেন কৃষক প্রভাত কুমার। তিনি বলেন, এক সপ্তাহ আগে আমাদের মাঠের ধান পেকে গেছে। তবে বৃষ্টির ভয়ে কাটতে পারছি না। এরমধ্যে রয়েছে তীব্র শ্রমিক সংকট। আবার অনেক জায়গায় মিললেও শ্রমিকের দাম পরিশোধে হিমশিম খাচ্ছেন চাষিরা।

একই গ্রামের নিত্যপাল বাবু বলেন, এবার ধানের দাম কম হওয়ায় লস হবে। বিঘাপ্রতি ধান কাটতে ও বাঁধতে ৩ হাজার টাকা লাগছে। মাঠ থেকে বাড়িতে আনতে ট্রলি ভাড়া ১৫০০ এবং ঝাড়তে মেশিন ভাড়াসহ আরও ১৫০০ টাকা দিতে হচ্ছে।

কলাগাছি গ্রামের কৃষক মিলন হোসেন বলেন, একদিকে শ্রমিক সংকট, অন্যদিকে আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা, দুই দিক থেকেই চাপের মধ্যে আছি। সময়মতো কাটতে না পারলে ফলন ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

শ্রমিক হুমায়ুন কবীর, জাহাঙ্গীর আলম, আব্দুল কাশেম, আবু কালাম জানান, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে অনেক ধান কাটা শেষ হয়ে যেতো। কিন্তু বিরূপ পরিস্থিতির কারণে কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে কৃষক ও শ্রমিক দুপক্ষই ক্ষতির মুখে পড়ছেন।

ঝিকরগাছার ফতেপুর ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. আইয়ুব হোসেন বলেন, আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী এখনও এক সপ্তাহ লাগবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে। এ সময়ের মধ্যে যাদের ধান একেবারেই পেকে গেছে, তাদেরকে দ্রুত হারভেস্টার মেশিন ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছি। আবার যাদের ধান পানিতে পড়ে গেছে তাদেরকে ছত্রাকনাশক স্প্রে করতে বলছি।

যশোর সদর উপজেলার পাঁচবাড়িয়া গ্রামের কৃষক মুকুল হোসেন জানান, এ বছর ধান নিয়ে মারাত্মক অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছি। যখন-তখন আবহাওয়া খারাপ হয়ে যাচ্ছে। আবহাওয়ায় বৃষ্টি ও ঝড়ের খবর পাচ্ছি। ধান কীভাবে বাড়ি নিয়ে আসব তাই ভাবছি।

মধুগ্রামের ধানচাষি লিটন হোসেন জানান, এক বিঘা ধান করেছি। ধানও ভালো হয়েছে। সব ধান পেকে গেছে। এই ধানই আমার বছরের খোরাকি। তবে শেষ সময়ে এসে ঝড়-বৃষ্টির জন্য টেনশনে আছি। আবার শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। আর পেলেও দিনে ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা দাম দিতে হচ্ছে।

এদিকে অভয়নগরে শনিবার দুপুরে হঠাৎ এক ঘণ্টার ভারি বৃষ্টিতে উপজেলার কোটা, বাগদাহ ও চলিশিয়াসহ অধিকাংশ মাঠের কেটে রাখা ধান পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। কয়েকদিনের আগের বৃষ্টিতে ভেজা ধানগুলো রোদে শুকানোর সুযোগ না পাওয়ায় সেগুলো এখন পুরোপুরি নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। মাঠের ধান বাঁচাতে পরিবারের পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও সমানতালে পরিশ্রম করছেন।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা লাভলি খাতুন বলেন, গত কয়েকদিনের বৃষ্টিপাত এবং ভারি বৃষ্টিতে ধান চাষিদের বেশ ক্ষতি হয়েছে। মাঠে কেটে রাখা অনেক ধান নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে।

অপর দিকে ধানের ন্যায্যমূল্য নিয়ে কৃষকদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। একদিকে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, অন্যদিকে বৈরী আবহাওয়ায় ধান নষ্ট হওয়া সব মিলিয়ে বিনিয়োগকৃত টাকা ঘরে তোলা নিয়ে চরম শঙ্কায় রয়েছেন সাধারণ চাষিরা। কেশবপুরে একেকজন শ্রমিকের দৈনিক মজুরি উঠেছে ১৪০০ থেকে ১৬০০ টাকা পর্যন্ত, যা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি।

উপজেলার মূলগ্রামের কৃষক আলাউদ্দীন জানান, এক বিঘা জমির ধান ক্ষেত থেকে বিচালি বেঁধে আনার জন্য ২০ জন শ্রমিক কিনেছেন জনপ্রতি এক হাজার ৪০০ টাকা দরে। কাজ করবে সকাল ৭টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর যশোরের উপ-পরিচালক মোশাররফ হোসেন ঢাকা পোস্টকে বলেন, ইতোমধ্যে জেলার থেকে ৪০ শতাংশ ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছে। কৃষকদের দ্রুত ধান কেটে ঘরে তোলার জন্য নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এক্ষেত্রে হারভেস্টার মেশিনেও দ্রুত ধান ঘরে তুলতে পারেন কৃষকরা।

তিনি আরও বলেন, যেভাবেই হোক ধান বাঁচাতে হবে। দ্রুত ধান কেটে ফেলতে আমরা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের দিয়ে মাঠ পর্যায়ে ম্যাসেজ দিচ্ছি। পাশাপাশি মসজিদের মাইকেও মাইকিং করা হচ্ছে। আজ আবহাওয়া ভালো ছিল। আগামীকালও ভালো থাকতে পারে। এমন থাকলে দু-একদিনের মধ্যে ৭০ শতাংশ ধান কাটা পড়বে।

রেজওয়ান বাপ্পী/এসএইচএ