দেশে নিরাপদ ও পুষ্টিসমৃদ্ধ চাল উৎপাদন নিশ্চিত করতে ফর্টিফাইড রাইস কার্নেল (এফআরকে) ফ্যাক্টরিগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে রাজশাহী ও বগুড়ায় দুই দিনব্যাপী নলেজ শেয়ারিং কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সোমবার (৪ মে) মিলার্স ফর নিউট্রিশন কোয়ালিশন-এর উদ্যোগে (টেকনোসার্ভ কর্তৃক বাস্তবায়িত এবং গেটস ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে পরিচালিত) বগুড়ার রুরাল ডেভেলপমেন্ট একাডেমি (আরডিএ) এবং রাজশাহীর আশ্রয় সেন্টারে ‘ফর্টিফাইড রাইস কার্নেল (এফআরকে) ফ্যাক্টরিতে ফুড সেফটি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (এফএসএমএস) শক্তিশালীকরণ: অর্জন, ঘাটতি ও ভবিষ্যৎ করণীয়’ শীর্ষক এ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়।
কর্মশালার মূল লক্ষ্য ছিল এফআরকে ফ্যাক্টরিগুলোতে ফুড সেফটি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (এফএসএমএস) বাস্তবায়ন আরও জোরদার করা, পাশাপাশি অভিজ্ঞতা বিনিময়, অংশীজনদের সক্রিয় সম্পৃক্ততা এবং সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনাকে আরও শক্তিশালী করা। এই কর্মশালার মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীরা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ফর্টিফিকেশন মানদণ্ড পূরণ করে উচ্চমানের ফর্টিফাইড চাল উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জন করে।
দেশের ১৩টি এফআরকে ফ্যাক্টরির প্রতিনিধিরা এতে অংশগ্রহণ করেন। কর্মশালার শেষে অংশগ্রহণকারীরা ফ্যাক্টরিতে এফএসএমএস আরও শক্তিশালী করা এবং দেশের মানুষের জন্য নিরাপদ ও উচ্চমানের ফর্টিফাইড চাল উৎপাদন নিশ্চিত করার প্রতি তাদের দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
রোববার (৩ মে) বগুড়ার রুরাল ডেভেলপমেন্ট একাডেমি (আরডিএ)-তে কর্মশালার উদ্বোধনী অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। ওই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন খাদ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (সরবরাহ, বণ্টন ও বিপণন বিভাগ) মো. জহিরুল ইসলাম খান। তিনি সরকারের চলমান চাল ফর্টিফিকেশন কার্যক্রমে সকল প্রকারের সহযোগিতা প্রদানের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন এবং ফর্টিফাইড রাইস কার্নেল (এফআরকে) উৎপাদনকারী ফ্যাক্টরির কাছ থেকে গুণগতমানসম্পন্ন এফআরকে সরবরাহ প্রত্যাশা করেন।
এ প্রসঙ্গে সরকার ভবিষ্যত ক্রয়ের ক্ষেত্রে ক্রয়াদেশের ফুড সেফটি সিস্টেম সার্টিফিকেশন বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা নিচ্ছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশে এফআরকে উৎপাদনে ফুড সেফটি ম্যানেজমেন্ট নিশ্চিতকরনে কারিগরি সহায়তা অব্যাহত রাখার জন্য টেকনোসার্ভকে অনুরোধ জানান।
টেকনোসার্ভের কান্ট্রি প্রোগ্রাম ম্যানেজার মো. গুলজার আহম্মেদ উদ্বোধনী বক্তব্যে জানান, গত আট মাসে (সেপ্টেম্বর ২০২৫–এপ্রিল ২০২৬) এফআরকে কারখানাগুলোতে টেকনোসার্ভের কারিগরি সহায়তার ফলে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। কর্মশালার কারিগরি সেশনে সিনিয়র ফুড ফর্টিফিকেশন স্পেশালিস্ট মো. নাঈম জোবায়ের এবং এফএসএমএস কনসালট্যান্ট মো. মেহেদী হাসান ফ্যাক্টরিগুলোর পূর্ববর্তী ও বর্তমান অবস্থার তুলনামূলক চিত্র উপস্থাপন করেন। তাদের উপস্থাপনায় ফুড সেফটি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (এফএসএমএস) জোরদার, HACCP ও ISO 22000-এর মতো আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ এবং এফআরকে’র গুণগত মান ও নিরাপত্তা উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির চিত্র উঠে আসে।
কর্মশালার অংশ হিসেবে প্রথম দিনে অংশগ্রহণকারীরা বগুড়ার রূপসী রাইস ফ্লাওয়ার অ্যান্ড পুষ্টি মিল এবং দ্বিতীয় দিনে রাজশাহীর কামাল অটো রাইস মিলের এফআরকে ইউনিট সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনকালে তারা মানসম্মত উৎপাদন প্রক্রিয়া, কার্যকর গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং উন্নত প্রিমিক্স ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি সরাসরি পর্যবেক্ষণের সুযোগ পান।
কর্মশালায় কিছু চ্যালেঞ্জও চিহ্নিত করা হয়, যেমন—ডকুমেন্টেশন ও রেকর্ড সংরক্ষণে ঘাটতি, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, প্রিমিক্স ব্যবস্থাপনায় অসামঞ্জস্য এবং অভ্যন্তরীণ অডিট ব্যবস্থার দুর্বলতা। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ব্যবস্থাপনা পর্যায়ের অঙ্গীকার জোরদার, কারিগরি দক্ষতা বৃদ্ধি এবং ফুড সেফটি বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
কর্মশালার সমাপনী অনুষ্ঠান রাজশাহী’র আশ্রয় সেন্টারে অনুষ্ঠিত হয়। সমাপনী পর্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন খাদ্য অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (সরবরাহ, বণ্টন ও বিপণন বিভাগ) মো. আফিফ-আল-মাহমুদ ভূঁইয়া। তার বক্তব্যে জাতীয় পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এফআরকে উৎপাদনের ফুড সেফটি ম্যানেজমেন্টের গুরুত্ব তুলে ধরেন এবং সরকার ও উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন এবং তিনি টেকনোসার্ভের এ উদ্যোগকে সাধুবাদ জানান।
এছাড়াও সমাপনী পর্বে কামাল অটো রাইস মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. কামাল উদ্দিন তার বক্তব্যে টেকনোসার্ভের এই উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, এ উদ্যোগের ফলে কমপ্লায়েন্স, পণ্যের গুণগত মান এবং ফুড সেফটি ম্যানেজমেন্টে উল্লেখযোগ্য উন্নতি সাধিত হয়েছে। একই সঙ্গে এ অগ্রগতি ধরে রাখতে ধারাবাহিক কারিগরি সহায়তার গুরুত্বও তুলে ধরেন।
আনোয়ার ফর্টিফাইড ইন্ডাস্ট্রির স্বত্বাধিকারী মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘এফএসএমএস সহায়তা আমাদের এফআরকে উৎপাদন প্রক্রিয়া এবং স্টাফদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য উন্নতি সাধন করেছে, যা এফআরকে গুণগত মান বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। তিনি আরও বলেন, ‘আমি সকল এফআরকে মিল মালিকদের পক্ষ থেকে আশা করি, এই সহায়তা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।’
কর্মশালায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ডব্লিউএফপি এর সিনিয়র প্রোগ্রাম পলিসি অফিসার ড. মোহাম্মদ মাহবুবর রহমান এবং নিউট্রিশন ইন্টারন্যাশনাল এর প্রোগ্রাম অফিসার ইঞ্জিনিয়ার মো. আকিব আবরার। বক্তাগণ রাইস ফর্টিফিকেশন প্রোগ্রামে মানসম্পন্ন এফআরকে উৎপাদনে ফুড সেফটি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের গুরুত্বের বিষয়টি তুলে ধরেন।
মিলার্স ফর নিউট্রিশন কর্মসূচিটি পরিচালিত হচ্ছে স্ট্র্যাটেজিক ফর্টিফিকেশন পার্টনার—বিএএসএফ, বায়োঅ্যানালিট, ডিএসএম-ফারমেনিস, মুলেনকেমি ও স্টার্নভিটামিন; আঞ্চলিক সহযোগী—হেক্সাগন নিউট্রিশন, পিরামাল ও সাংকু; এবং ক্রমবর্ধমান স্থানীয় কারিগরি অংশীদারদের সমন্বয়ে। এই উদ্যোগের অংশীদাররা খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ পদ্ধতি উন্নয়ন এবং ফর্টিফিকেশন কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী করার মাধ্যমে সমাজের কল্যাণ এবং ব্যবসার টেকসই উন্নয়নে অবদান রাখতে একটি অভিন্ন লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। মিলার্স ফর নিউট্রিশন কার্যক্রমটি টেকনোসার্ভ-এর মাধ্যমে বাস্তবায়িত হচ্ছে, যা গেটস ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে পরিচালিত।
এসএইচএ
