বিজ্ঞাপন

কৃষি পণ্যে ‘ধলতা’ প্রথা

রাজবাড়ীতে ব্যবসায়ীদের ধর্মঘটের কারণ অনুসন্ধানে আদালতের নির্দেশ

রাজবাড়ীতে ব্যবসায়ীদের ধর্মঘটের কারণ অনুসন্ধানে আদালতের নির্দেশ

কৃষি পণ্যে ‘ধলতা’ প্রথা চালুর দাবিতে সম্প্রতি রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার বহরপুর ও সোনাপুরে পাইকারি বাজারে ব্যবসায়ীদের চলমান ধর্মঘটের প্রকৃত কারণ খতিয়ে দেখতে কৃষি বিপণন কর্মকর্তাকে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

বুধবার (৬ মে) সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ও বালিয়াকান্দি আমলি আদালতের বিচারক মো. মহসিন হাসান এ আদেশ দেন। ঘটনার সত্যতা যাচাই, সংশ্লিষ্ট দায়ী ব্যক্তিদের সুনির্দিষ্টভাবে শনাক্তকরণ এবং প্রযোজ্য আইন লঙ্ঘনের বিষয়সমূহ উল্লেখপূর্বক একটি পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন আগামী (১১ মার্চ) ৫ দিনের মধ্যে এই আদালতে দাখিল করতে বলা হয়েছে।

এদিকে কৃষকদের কাছ থেকে পেঁয়াজ ক্রয় না করে ব্যবসায়ীদের ধর্মঘটের বিষয়টি আদালতের নজরে এলে আদালতের ম্যাজিস্ট্রেটের বিশেষ নির্দেশনায় একটি মিস কেস খোলা হয়েছে।

মঙ্গলবার (৫ মে) সাপ্তাহিক হাটের দিন কোনো ব্যবসায়ী আড়ৎ না খোলায় কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পেঁয়াজ ও পণ্য বিক্রি করতে না পেরে বাধ্য হয়ে বাড়ি ফিরিয়ে নিতে হয়েছে। 

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সোমবার বালিয়াকান্দি উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে টিওন (টাউন/তহসিল অফিসার) ব্যবসায়ীদের সঙ্গে একটি বৈঠক করেন। ওই বৈঠকে পেঁয়াজ বিক্রির সময় ঢলন বা থলতা নামে মণ প্রতি অতিরিক্ত দুই থেকে তিন কেজি পেঁয়াজ কৃষকদের কাছ থেকে বেশি নেওয়ার প্রথা বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এ সিদ্ধান্তে অসন্তোষ প্রকাশ করেন কাঁচামাল ব্যবসায়ীরা। এরই প্রতিবাদে তারা মঙ্গলবার ধর্মঘটের ডাক দেন। এতে সোনাপুর ও বহরপুর হাটে কোনো আড়ৎ খোলেনি। তাদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত এ প্রথা হঠাৎ বন্ধ করে দিলে তারা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন কৃষকরা। ভোর থেকে হাটে আসা কৃষকরা পেঁয়াজসহ অন্য কাঁচামাল বিক্রি করতে না পেরে হতাশায় পড়েন। অনেকেই পরিবহন খরচ বহন করে পণ্য নিয়ে এলেও বিক্রি করতে না পেরে সেগুলো আবার বাড়িতে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হন।

বহরপুর হাটে কৃষক ছেকেন মন্ডল বলেন, ‘আমরা কষ্ট করে ফসল ফলাই, কিন্তু হাটে এনে যদি বিক্রি করতে না পারি তাহলে আমাদের বড় লোকসান হয়।’ এদিকে, স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনো এ বিষয়ে নতুন কোনো সিদ্ধান্ত বা সমাধানের ঘোষণা আসেনি। পরিস্থিতি দ্রæত স্বাভাবিক না হলে কৃষকদের ক্ষতি আরো বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

সার্বিকভাবে, ব্যবসায়ী ও প্রশাসনের এ দ্বন্দ্বের প্রভাব সরাসরি কৃষকদের ওপর পড়েছে, যা দ্রুত সমাধান করা জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

এ বিষয়ে বালিয়াকান্দি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) চৌধুরী মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘সোমবার উপজেলার সব হাটের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, ব্যবসায়ী নেতা ও রাজনৈতিক নেতাদের পরামর্শেই ধলন প্রথা নামে কৃষকদের জিম্মি করে ওজনে বেশি নেওয়া সিষ্টেম বাতিল করা হয়েছে। প্রশাসন তা কার্যকর করবে।

অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন বাজারের বণিক সমিতির সভাপতি ও সেক্রেটারির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাবেই এসব অনিয়ম ও সিন্ডিকেট কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

কৃষকদের প্রশাসনের প্রতি জোর দাবি-কোনো রাজনৈতিক প্রভাব, ক্ষমতা বা চাপ যেন কৃষকদের ন্যায্য অধিকার ক্ষুন্ন করতে না পারে।

 যেহেতু, ওজন ও পরিমাপ মানদণ্ড আইন, ২০১৮ এর ২৯ ধারা অনুযায়ী, কোনো প্রচলিত প্রথা বা পদ্ধতি যাই থাকুক না কেন, ওজনের মানদণ্ড এককের তুলনায় বেশি পরিমাণের পণ্য গ্রহণ বা দাবি করা আইনত নিষিদ্ধ। বিশেষত, প্রচলিত মানদণ্ড (১ মণ = ৪০ কেজি) অমান্য করে অতিরিক্ত পণ্য গ্রহণের দাবি করা ওজন ও পরিমাপ মানদণ্ড আইন, ২০১৮ এর পরিপন্থী এবং উক্ত আইনের ৪৬ ধারায় দণ্ডনীয় অপরাধের সামিল এবং যেহেতু, আড়তদারগণ এই অবৈধ দাবি আদায়ের লক্ষ্যে পেঁয়াজ ক্রয় বন্ধ রাখার মাধ্যমে বাজারে কৃত্রিম প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে, যা কৃষি বিপণন আইন, ২০১৮ এর ১৯ ও ২৪ ধারারও পরিপন্থী।

সেহেতু, কৃষকের ন্যায্য অধিকার সংরক্ষণ এবং বাজার ব্যবস্থার শৃঙ্খলা রক্ষার্থে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৮৯৮-এর ১৯০(১)(প) ধারা মোতাবেক আদালত কর্তৃক স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে বিষয়টি বিচারার্থে গ্রহণের জন্য বিস্তারিত তদন্তের নির্দেশনা প্রদান করা যুক্তিযুক্ত। 

তাই কৃষি বিপণন কর্মকর্তা (বিসিএস কৃষি), কৃষি বিপণন অধিদপ্তর, রাজবাড়ী এই ঘটনার সত্যতা যাচাই, সংশ্লিষ্ট দায়ী ব্যক্তিদের সুনির্দিষ্টভাবে শনাক্তকরণ এবং প্রযোজ্য আইন লঙ্ঘনের বিষয়সমূহ উল্লেখপূর্বক একটি পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন আগামী ৫ দিনের মধ্যে এই আদালতে দাখিল করবেন। তদন্ত কার্যক্রম যথাযথভাবে সম্পন্ন করার জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, বালিয়াকান্দি এবং অফিসার ইনচার্জ, বালিয়াকান্দি থানাকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদান জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

রাজবাড়ী জেলা কৃষি বিপণন কর্মকর্তা নাঈম আহম্মেদ বলেন, আদালত থেকে আমি এ বিষয়ে একটি চিঠি পেয়েছি। বিষয়টি আমি তদন্ত করে পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করব। এ বিষয়ে সবার সহযোগিতা কামনা করছি।

মীর সামসুজ্জামান সৌরভ/আরকে

বিজ্ঞাপন