বিজ্ঞাপন

বর্জ্যহীন পৃথিবী গড়ার স্বপ্ন

পরিত্যক্ত জিনিসে জেমির সৃজনশীলতা

পরিত্যক্ত জিনিসে জেমির সৃজনশীলতা

ব্যবহৃত পুরোনো পাটের বস্তা, পাঞ্জাবি ও লুঙ্গি থেকে তৈরি করা হচ্ছে দৃষ্টিনন্দন নকশি কাঁথা, ব্যাগ ও ফ্লোর ম্যাট। আবর্জনা হিসেবে ফেলে দেওয়া কাপড় ও পাটের বস্তায় রঙিন সুতা ও সুঁইয়ের বুননে তৈরি শিল্প নজর কাড়ছে সবার। চমৎকার এই শিল্প কর্মে নিজের প্রতিভা ও প্রচেষ্টাকে মেলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন সিরাতি আজমিন শাহ জেমি।

রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার বেতগাড়ি ইউনিয়নের শাহপাড়া গ্রামের বাসিন্দা সিরাতি আজমিন শাহ জেমি। ‘জিরো ওয়েস্ট’ বা বর্জ্যহীন পৃথিবী গড়ার ব্রত নিয়ে জেমি আজ এক সফল নারী উদ্যোক্তা। তার হাতে সুঁই-সুতার নিপুণ ছোঁয়ায় ফেলে দেওয়া কাপড় ও পাটের বস্তায় ভেসে উঠছে গ্রাম বাংলার প্রতিচ্ছবি। শুধু তাই নয়, নকশি কাঁথা, সোফার কুশন ও পাপশসহ বিভিন্ন আকৃতির ব্যাগ তৈরিতে পটু এই নারী উদ্যোক্তা।

শৈশবে মায়ের কাছে হাতেখড়ি হলেও জেমির সৃজনশীলতার পালে নতুন হাওয়া লাগে চার মাস আগে। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ইএসডিও) থেকে প্রশিক্ষণ নেয় জেমি। এরপর থেকে জেমির শৌখিনতার হালে লেগেছে পেশাদারিত্বের ছোঁয়া। বর্তমানে বিভিন্ন মেলা এবং নিজ বাড়ি থেকে বিক্রি হচ্ছে তার তৈরি পণ্য। কম খরচে তৈরি হওয়ায় ক্রেতাদের আগ্রহও বাড়ছে ।

সম্প্রতি ঢাকা পোস্টের প্রতিবেদকের সাথে কথা হলে উদ্যোক্তা সিরাতি আজমিন শাহ জেমি বলেন, আমার গ্রামের ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা যখন স্কুলে যেত, তখন আমি দেখতাম তারা বইখাতাগুলো বুকে জড়িয়ে নিয়ে যেত। তা দেখেই চিন্তা করলাম পুরাতন কাপড় দিয়ে ব্যাগ তৈরি করে তাদেরকে অল্প টাকায় দেয়া যায় কিনা? আমি সেই চিন্তা থেকে পুরাতন কাপড় এবং বিভিন্ন পাটের বস্তা ব্যবহার করে ব্যাগ বানানো শুরু করি। ওরা সেটা পছন্দ করায় আমার ভীষণ ভালো লাগে এবং আমি এতে অনুপ্রাণিত হই।

তিনি আরও বলেন, পরে আমি ইএসডিও থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে পুরাতন কাপড় এবং বিভিন্ন চালের বস্তা গ্রাম থেকে সংগ্রহ করে কাজ শুরু করি। অনেকেই সেগুলো আবর্জনা হিসেবে ফেলে দিত। কিন্তু সেগুলো থেকে কিছু একটা তৈরির প্রচেষ্টাকে কাজে লাগাতে মনস্থির করি। ধীরে ধীরে এগুলোতেই নকশা বুনতে শুরু করলাম রঙিন সুতা দিয়ে। এখন আমি নকশি কাঁথা, সোফার কুশন, পাপশসহ বিভিন্ন আকৃতির ব্যাগ তৈরি করছি।

শৈশবে মায়ের হাতের বুনন দেখে যে মুগ্ধতার শুরু হয় জেমির তা বিয়ের পর শাশুড়ির অনুপ্রেরণায় পায় পূর্ণতা। সেই স্মৃতিও তিনি তুলে ধরেন। ঢাকা পোস্টকে তিনি বলেন, ছোটবেলায় মায়ের কাছ থেকে সুঁই-সুতো দিয়ে বিভিন্ন হস্তশিল্প তৈরির কাজ শিখেছি। সেই অভিজ্ঞতা এখনো আমাকে বেশ অনুপ্রাণিত করে। এখন আমার স্বপ্ন
‘জিরো ওয়েস্ট’ পৃথিবী গড়তে অন্যদেরও উৎসাহিত করা।
 
জেমির মা আনিছা খাতুন বলেন, আমার মেয়েকে আমি পড়াশোনা শিখিয়েছি। ওই নিজে থেকেই একটা কিছু করবে, নিজের চাহিদা পূরণ করবে সে ভাবেই বড় করেছি। বাসায় আমি আগে পুরাতন জামা বা পাঞ্জাবিতে সুতার কাজ করে সেগুলো নতুন করতাম। সেই সময় আমার মেয়ে আমার হাতের কাজে সাহায্য করত। আস্তে আস্তে আমার মেয়েও কাজটি শিখে যায়। এখন আমার মেয়ে অনেক ধরনের নকশা বুনতে পারে।

শুধু জেমি নয়, জেমির মতো আরও নারী উদ্যোক্তা তৈরি করার সংকল্প নিয়ে কাজ করছে এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন এবং ইয়ুথ ক্যারিয়ার অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট। তাদের লক্ষ্য প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রান্তিক নারীদের আরও দক্ষ ও আত্মনির্ভরশীল করে গড়ে তোলা। পাশাপাশি নারীদের তৈরি পরিবেশবান্ধব পণ্য দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৌঁছে দিয়ে টেকসই কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা সৃষ্টি করা।

এ ব্যাপারে এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের প্রজেক্ট অ্যাসোসিয়েট নিলুফা ইয়াসমিন বলেন, শাহপাড়া গ্রামকে নিয়ে আমরা এক রকম স্বপ্নই দেখছি। আমরা এই গ্রামটিকে জিরো ওয়েস্ট ভিলেজে পরিণত করব। তাই এই প্রকল্প হাতে নিয়ে এই গ্রামে আমরা কাজ করছি। এক সময়ে আমরা এই গ্রামে দেখতাম প্লাস্টিকের ব্যবহার অত্যাধিক বেশি। পরে প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানোর জন্য প্রজেক্টটা শুরু করি।

তিনি আরও বলেন, এই গ্রামের মহিলাদের কর্মসংস্থানের তেমন সুযোগ নেই। তাদের বেশির ভাগই শুধু সাংসারিক কাজেই ব্যস্ত থাকেন। বাড়তি কোনো আয়ের উৎসও নেই তাদের কাছে। এ কারণে আমরা প্রকল্পের শুরু থেকেই প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানোসহ আবর্জনার সঠিক ব্যবহারে গুরুত্বারোপ করে আসছি। এতে করে এই গ্রামে নারীদের কর্মসংস্থানেরও সৃষ্টি হয়েছে। আমরা এখানকার অর্ধশত নারীকে বিভিন্ন পরিবেশবান্ধব কাজের সাথে যুক্ত করে সহায়তা করছি।
 
ইয়ুথ ক্যারিয়ার অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক মো. হানিফ আলী বলেন, আমরা এই গ্রামটিতে নারী উন্নয়ন নিয়ে কাজ করছি। তারা পরিবেশবান্ধব যে পণ্যগুলো তৈরি করছেন সেগুলো যদি সহজেই গ্রাহকদের পর্যন্ত পৌঁছায় সে বিষয়ে লক্ষ্য রাখছি। পাশাপাশি দেশীয় মার্কেটে নিয়ে আসার চেষ্টাও করছি।

তিনি আরও বলেন, আমাদের প্রকল্পের আওতায় বেতগাড়ী ইউনিয়নের দুটি গ্রাম ইতোমধ্যে জিরো ওয়েস্ট গ্রাম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এখানে কৃষিতে রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমিয়ে জৈব সার ব্যবহারের মাধ্যমে অর্গানিক ফসল উৎপাদন করা হচ্ছে, যা পরিবেশবান্ধব ও টেকসই উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। এই উদ্যোগকে আরও শক্তিশালী করতে গ্রাম দুটিতে ৩০ জন নারীকে সেলাই প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হয়েছে। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নারীরা বিভিন্ন ধরনের পোশাক ও ব্যাগ তৈরি, জিরো ওয়েস্ট ভিত্তিক ইকো-ফ্রেন্ডলি পণ্য উৎপাদন, জিও ব্যাগ তৈরি এবং ট্রাইকো কম্পোস্ট সার উৎপাদনের দক্ষতা অর্জন করছেন।

ফরহাদুজ্জামান ফারুক/আরএআর